ইতিহাস

নিদাহাস ট্রফি কি এবং নিদাহাস ট্রফির ইতিহাস!

নিদাহাস ট্রফি কি এবং নিদাহাস ট্রফির ইতিহাস!- Neon Aloy

নিদাহাস একটি সংস্কৃত শব্দ, যার অর্থ হচ্ছে “স্বাধীনতা”। নিদাহাস ট্রফির সরাসরি অনুবাদ করলে যা দাড়ায় তার মানে “স্বাধীনতা কাপ”। নিদাহাস ট্রফি প্রথম হয়েছিলো ১৯৯৮ সালে, শ্রীলংকার স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে। আর দ্বিতীয় আসর শুরু হচ্ছে ৬ মার্চ ২০১৮, স্বাধীনতার ৭০ বছর পূর্তিতে।

নিদাহাস ট্রফি ১৯৯৮ সালের আসরের দিকে ফিরে তাকাই। কি হয়েছিলো সেখানে!

প্রথম আসরের সেই ট্রাই নেশন সিরিজে অংশ নিয়েছিলো শ্রীলংকা, ভারত এবং নিউজিল্যান্ড।

ভারতের একটা জিনিস কেউ অস্বীকার করতে পারবেনা, ভারত ঐতিহাসিক টুর্নামেন্ট পারতপক্ষে মিস করেনা! হোক সেটা নতুন কোন দেশের অভিষেক টেস্ট অথবা কারো স্বাধীনতা দিবস। এই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ২৫ বছর উপলক্ষ্যে “ইন্ডিপেনডেন্স কাপ” হয়েছিলো সেখানেও ভারত ছিলো (মজার এবং হাস্যকর বিষয় আমাদের স্বাধীনতা কাপে তৃতীয় দল ছিলো পাকিস্তান!)। একসময় কানাডার টরেন্টো, সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ড, আয়ারল্যান্ডের মাটিতে সিরিজ খেলে বেড়াতো ভারত। কেনিয়ার উত্থানের সেই মুহুর্তে তাদের সাথেও ট্রাই নেশন খেলেছে (অন্যদল ছিলো বাংলাদেশ)।

তো যাইহোক প্রথম নিদাহাস ট্রফি ছিলো অবশ্যই ওয়ানডে ফরম্যাটে। গ্রুপ পর্বে প্রতিটা দল একে অপরের সাথে ৩ বার খেলবে এবং শীর্ষ দুই দল পয়েন্টের ভিত্তিতে ফাইনাল। মোট ১০ টি ম্যাচ।

টুর্নামেন্ট প্রচন্ড বাধাগ্রস্ত হয় বৃষ্টির কারনে। গ্রুপ পর্বের ৯ টি ম্যাচের ৫ টি ম্যাচই পরিত্যক্ত হয়ে যায়। নিউজিল্যান্ড সবচেয়ে সাফার করেছিলো, তাদের ৬ ম্যাচের ৪ ম্যাচই পরিত্যক্ত হয়েছিলো। অন্য ২ ম্যাচে পরাজিত হয় তারা। ভারতের ৪ টি ম্যাচ পরিত্যক্ত হলেও ১ টি মাত্র ম্যাচ জিতে ফাইনালে চলে যায় তারা এবং ট্রফিও জিতে নেয়!

নিদাহাস ট্রফি কি এবং নিদাহাস ট্রফির ইতিহাস!- Neon Aloy

প্রথম নিদাহাস ট্রফির পয়েন্ট টেবিল

প্রথম ম্যাচে অরবিন্দ ডি সিলভার ৯৭ রানে ভর করে শ্রীলংকা ২৪৩ রান করে। জবাবে সৌরভ গাঙ্গুলীর ৮০ রানের উপর চড়ে ৮ উইকেটে জয় পায় ভারত।

দ্বিতীয় ম্যাচে, নিউজিল্যান্ড পঞ্চশ ওভারে ২০০/৯ রান করে। শ্রীলংকার স্পিনারদের সামলাতে ঘাম ছুটে যায় তাদের। জবাবে মারভান আতাপাত্তুর ৮৩* রানে দশ ওভার হাতে রেখে ৭ উইকেটের জয় পায় শ্রীলংকা।

তৃতীয় ম্যাচটা নিউজিল্যান্ডের জন্য এক ট্র্যাজেডি বটে! রেকর্ড বুকে থাকবে ম্যাচটি পরিত্যক্ত। তবে এখনকার মতো DLS নিয়ম থাকলে নিশ্চিত ফলাফল হতো। নাথান অ্যাসলের ৮১ রানের সুবাদে পঞ্চাশ ওভারে ২১৯/৮ রান তুলেছিলো নিউজিল্যান্ড। বৃষ্টির কারনে খেলা সংক্ষিপ্ত হলে ২৫ ওভারে ভারতের টার্গেট ছিলো ১৪৭। কিন্তু ২৪.২ ওভারের সময় আবার ঝুম বৃষ্টি নামে। তখন ভারতের প্রয়োজন ছিলো ৪ বলে ১৬ রান (১৩১/২ ছিলো ভারত)। বৃষ্টি না থামায় ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়। এখন যেমন ২০ ওভার হলেই ম্যাচের রেজাল্ট দেয়া হয় তখন সেটা ছিলো না। মাত্র ৪ বলের জন্য জয় বঞ্চিত হয় নিউজিল্যান্ড।

প্রথম তিন ম্যাচ কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে হবার পর টুর্নামেন্টের পরের তিন ম্যাচ ছিলো গল আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে। গলে টানা তিনটি ম্যাচই ভারি এবং টানা বৃষ্টিতে বাতিল হয়।

পরের তিনটা ম্যাচ ছিলো কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব মাঠে।

সপ্তম ম্যাচ বৃষ্টির কারনে ৩৬ ওভারের নির্ধারিত হয়। শ্রীলংকা ৩৬ ওভারে রান করেছিলো ১৭১/৮। অরবিন্দ ডি সিলভা করেন ৬২ (৮২) রান। জবাবে ভারত ৩ বল বাকি থাকতে অল আউট হয় ১৬৩ রানে। সন্যাৎ জয়াসুরিয়া ৫.৪ ওভারে ১৮ রানে ৪ উইকেট নিয়ে ধ্বসিয়ে দেয় ভারতকে। রবিন সিং করেন ৫০ (৭৪) রান।

অষ্টম ম্যাচে নিউজিল্যান্ড শুরুতে ব্যাট করতে নামে। ৩১.১ ওভারে ১২৮/৫ রানের পর বৃষ্টিতে ম্যাচ পন্ড হয়ে যায়।

নবম ম্যাচটা ছিলো টুর্নামেন্টে নিউজিল্যান্ডের টিকে থাকার ম্যাচ। সেই ম্যাচে প্রথমে ব্যাট করে অর্জুনা রানাতুঙ্গার ৯৮ বলে ১০২ রানের চমৎকার ইনিংসে ২৯৩/৪ রান সংগ্রহ করে শ্রীলংকা। স্পিনের সামনে অসহায় নিউজিল্যান্ডের জন্য এই রান ছিলো পাহাড়সম নাথান অ্যাসলের ৭৬ বলে ৭৪ রানের একাই লড়ে যাওয়া ইনিংসের পরেও নিউজিল্যান্ড অল আউট হয় ২০৬ রানে (৩৯.১ ওভার)। জয়াসুরিয়া ৮ ওভারে ২৮ রানে ৩ উইকেট নেন।

নিউজিল্যান্ড ছিটকে যায় টুর্নামেন্ট থেকে। আর উদ্ভোধনী ম্যাচে পাওয়া একমাত্র জয়ে ফাইনালে ভারত।

৭ জুলাই ১৯৯৮, কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে হয়েছিলো প্রথম নিদাহাস ট্রফির ফাইনাল। টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্বে বারবার বৃষ্টি হানা দিলেও ফাইনাল ছিলো হাই স্কোরিং ম্যাচ।

পুরা টুর্নামেন্টে ব্যাট হাতে উল্লেখযোগ্য কিছু না করা টেন্ডুলকার জ্বলে উঠলেন ফাইনাল ম্যাচে এসে। ১৩১ বলে ১২৮ রানের রক্ষনাত্বক এবং আক্রমনাত্বক মানসিকতার দূর্দান্ত মিশেলের একটা ক্ল্যাসিক ইনিংস খেলেন তিনি। সৌরভ গাঙ্গুলী খেলেন ১৩৬ বলে ১০৯ রানের ইনিংস। প্রথম উইকেট জুটিতে তৎকালীন সর্বোচ্চ ২৫২ রানের বিশ্বরেকর্ড করেন (যেটা আবার এই দুইজনই ২০০৩ বিশ্বকাপে ভাঙেন)। কষ্টসাধ্য ইনিংসে টেন্ডুলকার মাত্র ৪৪ রান এবং গাঙ্গুলী মাত্র ৩৬ রান বাউন্ডারি থেকে সংগ্রহ করেন। পঞ্চাশ ওভারে ভারতের সংগ্রহ ৩০৭/৬।

নিদাহাস ট্রফি কি এবং নিদাহাস ট্রফির ইতিহাস!- Neon Aloy

ঘরের মাঠে খেলা, শ্রীলংকা কি ছেড়ে দিবে সহজে! তার উপর তারা তখন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। জয়াসুরিয়ার ঝড়ো ব্যাটিং-এ ভালো শুরু শ্রীলংকার। জয়াসুরিয়া-কালুভিতারানার বহুল প্রশংসিত সেই জুটিতে ৮.১ ওভারেই শ্রীলংকা ৫৯ রান তুলে ফেলেছিলো। ২৫ বলে ৩২ রান করে আউট হলেন জয়াসুরিয়া। কিন্তু অরবিন্দ ডি সিলভার মাস্টারক্লাস ইনিংস বাকি তখনো! ৯৪ বলে ১০৫ রানের মহাকাব্যিক এক ইনিংস খেলেন ডি সিলভা। ভালো সঙ্গ দিচ্ছিলেন আতাপাত্তু। ৩৯ রান করে আতাপাত্তু আউট হয়ে যান। অধিনায়ক অর্জুনা রানাতুঙ্গাকে ২৩ (২২) রানে আউট করে ম্যাচে ভারতকে ফেরালেন আগারকার। কিন্তু তখনো উইকেটে অরবিন্দ ডি সিলভা আর রোশান মহানামা (বর্তমানি ম্যাচ রেফারি)। আবার অজিত আগারকারের আঘাত, হরভজন সিং-এর ক্যাচে আউট অরবিন্দ ডি সিলভা। শ্রীলংকার হাতে তখনো ম্যাচ, রোশান মহানামা আর উপল চন্দনা উইকেটে। ৪৫.২ ওভারে শ্রীলংকা ২৮০/৫। ২৮ বলে দরকার ২৮ রান! ঠিক তখনই অনিল কুম্বলের গুগলিতে বোল্ড চন্দনা। আর দলীয় ২৯৫ রানে ভয়াবহ ভুল বুঝাবুঝিতে রান আউট রোশান মহানামা! ৪৪ রান করেন ৪৯ বলে। ২৯৫/৭ থেকে ৩০১ রানে অল আউট শ্রীলংকা। শেষ তিন ব্যাটসম্যান মহানামা, ভিকরামাসিংহে আর বান্দারাতিল্লেকে তিনজনই রান আউট! ৩ বল হাতে রেখে চ্যাম্পিয়ন ভারত! ৬ রানের অবিশ্বাস্য জয় পায় আজহারউদ্দিনের দল।

নিদাহাস ট্রফি কি এবং নিদাহাস ট্রফির ইতিহাস!- Neon Aloy

জয়াসুরিয়া, কালুভিতারানা, ডি সিলভা আর অধিনায়ক রানাতুঙ্গার চারটি উইকেটই তুলে নিয়েছিলেন অজিত আগারকার (১০-০-৫৩-৪)। তবে ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট শেষ তিনটা রান আউট। বিশেষকরে রোশান মহানামার উইকেট।

দ্বিতীয় নিদাহাস ট্রফি (২০১৮)

শ্রীলংকা ক্রিকেট বোর্ডের ইচ্ছা ছিলো চার জাতি টুর্নামেন্টের। আমন্ত্রন জানানো হয় ভারত, সাউথ আফ্রিকা এবং পাকিস্তানকে। সাউথ আফ্রিকা অস্ট্রেলিয়া সিরিজের জন্য দল পাঠাতে পারবেনা জানিয়ে দেয়। পাকিস্তান ব্যস্ত PSL নিয়ে। ভারত-শ্রীলংকার ভেতর তখন দূর্দান্ত সম্পর্ক। নতুন আর্থিক মডেলের ভোটাভুটিতে একমাত্র শ্রীলংকার ভোট পায় ভারত আইসিসির সভায়। (৭-২ ভোট, জিম্বাবুয়ে ভোট দেয় নি)। শ্রীলংকার প্রস্তাবে রাজি হয় ভারত। গতবছর এই দুই দেশ দুটি পূর্নাঙ্গ সিরিজও খেলেছিলো কয়েক মাসের ব্যবধানে। এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের এক সভায় যোগ দিতে বিসিবি প্রধান তখন কলম্বোতে ছিলেন। বাংলাদেশ তখন FTP-এর বাইরে শ্রীলংকার আমন্ত্রনে পূর্নাঙ্গ সিরিজ খেলতে শ্রীলংকা সফরে। তখনই শ্রীলংকা নিদাহাস ট্রফির তৃতীয় দেশ হতে বিসিবিকে আমন্ত্রন জানায়। বিসিবির না করার কোন কারন ছিলোনা! তিন বোর্ডের প্রধান মিলে কলম্বোতে প্রেস কনফারেন্স করে ঘোষনা দেয় নিদাহাস ট্রফি ২০১৮ সালের।

এবার ৭ টি ম্যাচই হবে প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে। আমার ধারনা এবারো ভারত চ্যাম্পিয়ন হবে তবে চমকে দিতে পারে চান্দিকা হাথুরুসিংহের আক্রমনাত্বক মানসিকতার শ্রীলংকাও!!

সবকিছু ঠিক থাকলে নিদাহাস ট্রফির পরের আসর হবে শ্রীলংকার ৭৫ তম স্বাধীনতা দিবসের বছর। অর্থাৎ ২০২৩ সালের বিশ্বকাপের আগে অথবা পরে।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top