ইতিহাস

টাইটানিকের অজানা রহস্য

টাইটানিক

ছোট বেলা থেকেই মানতে পারতেন না, শুধু একটা আইবার্গের ধাক্কায় এক এবং অদ্বিতীয় বলে ঘোষণা দেয়া অতিকায় টাইটানিকের পতন ঘটেছে। ‘এ নাইট টু রিমেম্বার’ পড়ার পর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন গবেষণা চালিয়ে যাবেন টাইটানিকের উপরেই। ১৯৮৫ সালে টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়ার পর মনোনিবেশ করলেন সে কাজেই। কিন্তু ৩০ বছরের গবেষণার পর সেনান মোলোনি টাইটানিক ডুবে যাওয়ার ১০৫ বছর পূর্তিতে যে লুকায়িত সত্য তুলে ধরলেন সবার সামনে, রীতিমতো চমকে উঠতে হল।

 

টাইটানিক

সেনান মোলোনি, টাইটানিক নিয়ে গবেষণা করছেন ৩০ বছর

১৯১২ সালের ১০এপ্রিল সাউথহ্যাম্পটন থেকে নিউ ইয়র্কের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে ৮৮২ ফিট লম্বা, ৯২ ফিট চওড়া এবং ৪৬,৩২৮ টন পরিধির ব্রিটিশ যাত্রীবাহী জাহাজ আরএমএস টাইটানিক। এর বিশালতা দেখে কখনই মনে হয়নি যে, এই জাহাজ ডুবে যাওয়া সম্ভব। আরএমএস টাইটানিক এতোই বিশাল ছিল যে, জাহাজের অফিসার, নাবিক এবং অন্যান্য কর্মচারীদের পুরো ২ সপ্তাহ লেগেছিল শুধু জাহাজের কোথায় কি, সেটা আত্মস্থ করতেই। জাহাজের ডেকে ৮১.৫ ফিট লম্বা ৩০ ডিগ্রী কোণে বাঁকানো ৪টি চিমনি ছিল, যা থেকে প্রতিদিন ১০০ টনের মতো ভারি বাতাস বের হতো কিন্তু যাত্রীদের কোন ক্ষতি হতো না। আরএমএস টাইটানিক নির্মাণে খরচ হয়েছিলো তৎকালীন সময়ের ৭.৫ মিলিয়ন ডলারের মতো, এ সময়ে যার মূল্য প্রায় ১৮০ মিলিয়ন ডলারের সমান। যদিও, মজার ব্যাপার হচ্ছে, ১৯৯৭ সালে মুক্তি পাওয়া, জেমস ক্যামেরুন পরিচালিত ‘টাইটানিক’ মুভি নির্মাণে খরচ হয়েছিলো ২০০ মিলিয়ন ডলারের উপরে।

আরএমএস টাইটানিক নির্মাণের দায়িত্ব নিয়েছিল বেলফাস্টের হারল্যান্ড অ্যান্ড উল্ফ কোম্পানি। ৩০০০ শ্রমিকের ২৬ মাসের পরিশ্রমের ফসল এই জাহাজ। সকাল ৬টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কাজ চলত একটানা, সপ্তাহে ৬ দিন। কঠিন এবং বিপদজনক কাজগুলোর একটা ছিল এটা। কল্পনা করুন তো, ২০ তলা সমতুল্য উঁচু জায়গায় কাজ করা হচ্ছে কোনরকম সেইফটি রোপ ছাড়াই! অথচ এ হাড়ভাঙ্গা খাটুনির মজুরী ছিল সপ্তাহে ২ পাউন্ড মাত্র। কিন্তু এটাই সে সময়ের হিসাবে ছিল অনেক। দুর্ভাগ্যক্রমে, নির্মাণকালে ৮ জন শ্রমিক মারা যান, ২৪৬ জন শ্রমিক গুরুতর আহত হন। বোঝাই যাচ্ছে কি নিদারুণ পরিশ্রম এবং কষ্টের ফসল এই আরএমএস টাইটানিক। আর এই অদ্বিতীয়াই সাগরে বিলীন হয়ে গেল এক আইসবার্গের ধাক্কায়!

টাইটানিক

১৯৮৫ সালে খুঁজে পাওয়া টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ

সাংবাদিক সেনান মোলোনি ৩০ বছর গবেষণার পর প্রমাণ করলেন, আইসবার্গ নয়, মূলত আগুনই টাইটানিকে ফাটল ধরার মূল কারণ! তিনিই প্রথম আবিষ্কার করেন, জাহাজের মাথার দিকে ৩০ ফিট পরিধি ধরে কাল দাগ। এবং এই দাগ আবিষ্কৃত হয়েছে টাইটানিক সাউথহ্যাম্পটন বন্দর ছাড়ার পরের ছবিগুলো থেকে। তার কাছে থাকা টাইটানিকের অপ্রকাশিত এক অ্যালবাম ছবি থেকেই ব্যাপারটা প্রমাণিত হয়।

তিনি বিভিন্ন সময়ের টাইটানিকের ছবি তুলে ধরেন। আগুনের সূত্রপাতটা হয়েছিলো ভিতরের বয়লার রুম থেকে। কয়লার স্তূপ থাকায় আগুন ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। যখন ব্যাপারটা সবাই টের পায়, তখন আগুন নেভানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ততোক্ষণে আগুন নাগালের বাইরে চলে গেছে। সে সময় ওই স্থানের তাপমাত্রা ছিল ১০০০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের মতো। প্রায় ৩ সপ্তাহ এই আগুন জ্বলেছিল এবং ধাতুবিজ্ঞানীদের মতে, এই আগুনই নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত ধাতুর ৭৫ শতাংশের বেশি দুর্বল করে দিয়েছে। এর ফলে জাহাজে ফাটল ধরাতে আইসবার্গের তেমন কোন কষ্ট করতে হয়নি।

টাইটানিক

টাইটানিকের গায়ে আগুনে পোড়ার দাগ

 

প্রোজেক্টের ম্যানেজার জানতেন এই ভয়াবহ আগুনের কথা। তিনি এটাও জানতেন যে এ অবস্থায় টাইটানিক জলযাত্রার জন্য নিরাপদ নয়। কিন্তু এ সময় যাত্রা বাতিল করা সম্ভব ছিল না কেননা তাহলে জাহাজের মালিকরা দেউলিয়া হয়ে যেতেন। জাহাজের যে অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো, তা মেরামত করার মতো পর্যাপ্ত কয়লাও ছিল না তখন, কারণ কয়লা খনির শ্রমিকরা তখন আন্দোলনরত ছিল। এবং অন্য যাত্রীবাহী জাহাজগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিলো। কারণ সকল যাত্রীই টাইটানিকের প্রথম রোমাঞ্চকর  যাত্রায় অংশ নিয়ে ইতিহাসের সাক্ষী হতে চেয়েছিলেন। এই কারণে অন্য সকল জাহাজের কয়লা কিনে নিয়ে আসা হয়েছিলো টাইটানিকের জন্য। ফলে, টাইটানিকের যাত্রা বাতিল করা ছিল চিন্তার বাইরে। যাত্রার দিন ডেক থেকে টাইটানিক এমনভাবে বাঁক নেয় যাতে অগ্নিদগ্ধ অংশটুকু কারো চোখে না পরে। এ বিষয়েও স্থানীয়দের সাক্ষ্য পাওয়া যায়। অনেকেই বলছেন, বন্দর ছাড়ার সময় টাইটানিকের গতিপথ অন্য সব জাহাজের মতো ছিল না। কিন্তু সে সময়ে ধরে নেওয়া হয়েছিলো যে, অন্যান্য জাহাজের থেকে টাইটানিকের আকৃতি, গঠন ভিন্ন হওয়াতে কোন সুবিধা পেতেই হয়তো জাহাজের ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ড স্মিথ এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ফলে, বিষয়টি জনমনে আর কোন প্রশ্ন তোলেনি।

টাইটানিক

ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ড স্মিথ

টাইটানিকের নকশা করা হয়েছিলো মূলত লন্ডনের ফাইভ স্টার রিজ হোটেলের আদলে। এটি সাজানো ছিল শিল্পকর্ম, তৈলচিত্র, কিন্নর পাথরের দেবশিশু ইত্যাদি দিয়ে। প্রথম শ্রেণীর যাত্রীদের জন্য সুইমিং পুল, টার্কিশ বাথ, বিউটি পার্লার, স্কোয়াশ কোর্ট, গলফ কোর্ট এবং জিমনেশিয়ামের ব্যবস্থাও ছিল। এমনকি ‘আটলান্টিক ডেইলি বুলেটিন’ নামে তাদের নিজস্ব পত্রিকাও ছিল। উল্লেখ্য, প্রথম শ্রেণীর যাত্রীদের পোষা প্রাণীদের দেখভাল করার জন্যও সুব্যবস্থা ছিল। প্রতিদিন ডিনারে মিনিমাম ১৩ ধরনের আইটেমের নিয়ম ছিল। অবাক করার মতো বিষয় হচ্ছে, ১৫০০ বোতল ওয়াইন, ২০০০০ বোতল বিয়ার আর ৮০০০ সিগার থাকলেও ছিল না কাজে লাগানোর মতো কোন বাইনোকুলার!

সে সময় সোনার সিস্টেমের চালু হয়নি, সামনের পথ দেখতে নাবিকদের বাইনোকুলারের সাহায্য নেয়া লাগতো। কিন্তু টাইটানিকের বাইনোকুলার ছিল একটি সুরক্ষিত আলমারিতে তালাবদ্ধ। যার চাবি ছিল জাহাজের সেকেন্ড ইন কমান্ড অফিসার ডেভিড ব্লেয়ারের কাছে, যিনি শেষ মুহূর্তে বদলী হন। কিন্তু বিদায় নেয়ার আগে তিনি চাবি দিতে ভুলে যান। বাইনোকুলার যে আলমারির ভিতরে আবদ্ধ, এ তথ্য আবিষ্কার হয় বন্দর ছেঁড়ে আসার ৩ দিন পর। বাইনোকুলার থাকলে হয়তো আইসবার্গ সম্পর্কে আগেই সতর্ক হওয়া যেতো। হয়তো দুর্ঘটনা ঘটতো না যদি গতিসীমা পার না হতো। শিডিউল থেকে পিছিয়ে যাচ্ছিল টাইটানিক, ফলে ক্যাপ্টেন অতি দ্রুত জাহাজ চালাতে বলেন যা বিপদসীমা পেরিয়ে গিয়েছিলো।

উপরন্তু, সে সময়ে ‘লাইফবোট ড্রিল’ ছিল সকল জাহাজের জন্য বাধ্যতামূলক। বিশেষ করে, যে অঞ্চল পার হচ্ছিলো টাইটানিক। যেদিন রাতে দুর্ঘটনা ঘটে, সে দিন সকালেই এ অনুশীলন হওয়ার কথা ছিল। কি ভেবে ক্যাপ্টেন স্মিথ ‘লাইফবোট ড্রিল’ অনুশীলন বাতিল করে দেন। এ কারণেই, যাত্রীদের উদ্ধারে নাবিকের লাইফবোট প্রস্তুত করতে সময় লেগেছিল প্রায় দেড় ঘণ্টার মতো, যেখানে আদর্শ সময় ১০ মিনিট!
যেখানে টাইটানিকের জন্য দরকার ছিল ৬০টির মতো লাইফবোট সেখানে প্রধান নকশাকারী অ্যালেক্সান্ডার দিলেন মাত্র ৪৮টি বোট।  প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, দুর্ঘটনার সময়  ক্যাপ্টেন স্মিথ বোটগুলো পূর্ণ না করেই ছাড়ার নির্দেশ দেন। যেমন প্রথম লাইফবোটটি ৬৫ জন আরোহী নিতে সক্ষম হলেও মাত্র ২৫ জন হওয়ার পর ছেড়ে দেয়া হয়েছিলো। কেন এতো গাফেলতি ছিল টাইটানিককে ঘিরে?

টাইটানিক

শিল্পীর দৃষ্টিতে সেদিন রাত

২০১২ সালে প্রকাশিত হয়, ক্যাপ্টেন স্মিথ তার প্রথম ন্যাভিগেশন পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। দ্বিতীয় দফায় কৃতকার্য হলেও আসল পরীক্ষায় এসে আবার অকৃতকার্য হন। সে রাতে মৃত্যুবরণ করে ১৫০০র মতো যাত্রী, যা ছিল মোট যাত্রীর তিন ভাগের দুই ভাগ।
সেনান মোলোনির ভাষায়, দুর্ভাগ্য, অপরিণামদর্শিতা আর মিথ্যার বেড়াজালে আটকা পরেই ডুবতে হয় টাইটানিককে। গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি, হয়তো সামনে হাজির হবেন বিস্ময়ে ভরা আরো নতুন কোন তথ্য নিয়ে।

আরো পড়ুনঃ অধিকাংশ বিমান কেন সাদা হয়?

Most Popular

To Top