নাগরিক কথা

এরপরেও কি মুহম্মদ জাফর ইকবালকে গালি দিবেন?

জাফর ইকবাল নিয়ন আলোয় neon aloy

বাংলাদেশ থেকে ফেসবুকে গত দুইদিনে যতগুলো স্ট্যাটাস কিংবা কমেন্ট পোস্ট হয়েছে, তার অধিকাংশেরই বক্তব্য কমবেশি এরকম- “নাস্তিক ষাঁড় জাফ্রিকবাল মরে না কেন?” অথবা “ভূতের বাচ্চা সোলায়মান নামে বই লিখা জাফ্রিকবালরে কোপানোই ঠিক কাজ”। এই “জাফ্রিকবাল” কিংবা “ষাঁড়” টার্ম দুইটা কার মাথা থেকে এসেছে জানি না, তবে যেহেতু এই “ষাঁড় জাফ্রিকবাল” কে আহত করা হয়েছে “নবীর নাম অবমাননা” করার অজুহাতে, তাই এটা নিয়েই আলোচনা করবো। একজন মানুষ নাস্তিক/কটূক্তিকারী হলেই তাকে মারতে হবে- এই মানসিকতা আমি সমর্থন করি না। উপরে আল্লাহ আছে মানেন কি? জানের মালিক আল্লাহ- এইটা বিশ্বাস করেন কি? যদি বিশ্বাস করেন, তাইলে আপনি আরেকজনকে খুন করার অধিকার পান কিভাবে যদি নিজে আক্রান্ত না হন? এই আলোচনা অনেক লম্বা, আমরা বরং মূল আলোচনায় থাকি।

র‍্যাবের ভাষ্যমতে মুহম্মদ জাফর ইকবালকে ছুরিকাহত করা ফয়জুর রহমান বলেছে “ভূতের বাচ্চা সোলায়মান” নামে বই লিখে মুহম্মদ জাফর ইকবাল নবীকে অপমান করেছে। তাই ক্ষুব্ধ হয়ে সে এই হামলা চালিয়েছে। এই বক্তব্য প্রকাশ পাওয়ার সাথে সাথে দুনিয়া ভেঙ্গে লোকজন এই বক্তব্যকে সমর্থন করা শুরু করলেন। এমনকি যারা আগেরদিন বলেছিলেন “ইসলামকে কটাক্ষ করা জাফর ইকবালের উচিৎ হয়নি, তবে ওনাকে কোপানো-ও উচিৎ হয়নি”, কিংবা যারা দাবী করেন “ইসলাম শান্তির ধর্ম, ইসলাম কোন সন্ত্রাসীর ধর্ম না” তাদের অনেকেও এই হামলাকারী সন্ত্রাসীর কথায় নাচতে শুরু করলেন। কিন্তু আসলেই কি একটি বইয়ের নামে নবীকে অপমান করা হয়? আসুন, কিছু প্রশ্ন-উত্তরের মাধ্যমে বুঝার চেষ্টা করি।

  • “ভূতের বাচ্চা সোলায়মান” বইয়ের নামে যদি হযরত সোলায়মান (আ:) এর অবমাননা হয়; তাহলে আপনার পাশের বাসার সোলায়মান সাহেব যখন ঘুষ খান, তখন কি নবীর অবমাননা হয় না?
  • “ভূতের বাচ্চা সোলায়মান” বইয়ের নামে যদি হযরত সোলায়মান (আ:) এর অবমাননা হয়; তাহলে পাড়ার মুদী দোকানদার সোলায়মান যখন ওজনে কম দেয়, তখন কি নবীর অবমাননা হয় না?
  • “ভূতের বাচ্চা সোলায়মান” বইয়ের নামে যদি হযরত সোলায়মান (আ:) এর অবমাননা হয়; তাহলে পাড়ার বখাটে ছেলে সোলায়মান যখন ইভটিজিং করে, তখন কি নবীর অবমাননা হয় না?
  • “ভূতের বাচ্চা সোলায়মান” বইয়ের নামে যদি হযরত সোলায়মান (আ:) এর অবমাননা হয়; তাহলে আপনার বন্ধু সোলায়মান যখন আপনার টাকা ধার নিয়ে আর ফেরত দেয় না, এবং টাকা ফেরত না পেয়ে আপনি যখন আপনার বন্ধুকে গালিগালাজ করেন- উভয় ক্ষেত্রেই কি নবীর অবমাননা হয় না?
  • আপনি আপনার প্রিয় বন্ধু সোলায়মানের সাথে দেখা হলেই যখন বন্ধুসুলভ “কিরে ***র পোলা!” বলে বুকে টেনে নেন, তখন কি আপনি নবীর অবমাননা করেন?
  • আপনি যখন ট্রাফিক কনস্টেবল সোলায়মানকে “হারামী ঘুষখোরের বাচ্চা” বলে গালি দিয়ে তার পিতা-মাতাকে কি করা উচিৎ গজরাতে থাকেন, তখন কি আপনি নবীর নামেই গালিগালাজ করেন?
  • নিরীহ রিকশাওয়ালা সোলায়মান যখন কড়া রোদে রিকশা চালিয়ে শেষে ৫ টাকা বেশি দাবী করে এবং আপনি তাকে ভাড়া বেশি চাওয়ার অপরাধে কষে চড় মারেন, তখন কি…
  • গ্রামের মহাজন সোলায়মান মুন্সী যখন গরীব চাষীদের চড়া সুদে ঋণ দেন, তখন কি সেই সুদের গুনাহ নবী সোলায়মান (আ:) এর আমলনামায় জমা হয়?
  • টোকাই ছেলে সোলায়মান যখন আপনার কাছে দুইটা টাকা চায়, এবং আপনি বিরক্ত হয়ে তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেন, তখন কি আপনি নবীকে অপমান করেন?
  • অথবা মাসখানেক আগে যখন সবাই দল বেঁধে সোলায়মান সুখনকে গালি দিচ্ছিলেন, এবং মোটিভেশনাল স্পিচ সুখনের কোন অঙ্গে কিভাবে প্রবিষ্ট করানো যায় তা নিয়ে “বৈজ্ঞানিক আলোচনা” করছিলেন, তখন কি সবাই নবী সোলায়মান (আ:) এর অবমাননা করছিলেন?

যদি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর “না” হয়, তাহলে মুহম্মদ জাফর ইকবালের ভূতের বাচ্চা সোলায়মান নামের বইটিকে ইসলাম এবং নবীর অবমাননা বলছেন কেন? যারা বইটি পড়েছেন, তারা বলছেন এই বইটিতে ইসলাম এবং নবীকে অবমাননা করা হয়নি। বরং ইসলামের অপব্যাখ্যা এবং অপব্যবহার করে যারা নিজের স্বার্থসিদ্ধি করতে চায়- তাদের সমালোচনা করেছেন লেখক। এত কিছু বলা লাগে না যদি আপনি সহজ একটি বিষয়ে চিন্তা করেন। মহানবীর নাম উচ্চারণ করলে আমরা তার পরেই সম্মানসূচক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উচ্চারণ করি। কিন্তু আমাদের নামের শুরুতে মুহাম্মদ থাকলে কি আমরা নামের মাঝে (সা:) বসাই? বসাই না। কারণ নাম ধারণ করলেই তো আমরা নবী-রাসূল হয়ে যাচ্ছি না, তাহলে একটা কাল্পনিক ভূতের নাম সোলায়মান হলে সেটা কেন নবীর সাথে মিলাতে হবে? এসব অবান্তর যুক্তি কারা আপনাদের মাথায় ঢুকাচ্ছে, আর কেন ঢুকাচ্ছে? আর যে যার ইচ্ছা তা-ই বলতে পারে, তাই বলে আপনি নিজের মাথা খাটিয়ে একটা বিষয় যাচাই করবেন না?

আর উপরের সবগুলো প্রশ্নের উত্তর যদি “হ্যাঁ” হয়, তাহলে সম্ভবত বাংলাদেশে নবজাতক শিশু বাদে এমন একজন মানুষও খুঁজে পাওয়া যাবে না যিনি উপরের কোন একটি ক্রাইটেরিয়ায় ধরা পড়েন না। সে হিসাবে প্রত্যেকটি মানুষই “নাস্তিক” এবং “নবীর অবমাননাকারী”। এতগুলো মানুষকে নাস্তিকতার “অপরাধে” কুপিয়ে হত্যা করা কষ্টকর। সেক্ষেত্রে আমাদের উচিৎ নিজ উদ্যোগে দলে দলে নিকটবর্তী স’মিলে গিয়ে ইলেকট্রিক করাতের নিচে মাথা দিয়ে মরে যাওয়া। তাই নয় কি?

শুধু সোলায়মান (আ:) নয়, বাংলাদেশে অন্যান্য নবী-রাসূলের নামেও অসংখ্য মানুষের নাম রয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে নামের শুরুতে মুহাম্মদ আছে এমন মানুষ অজস্র। তারচাইতেও বড় ব্যাপার, মহান আল্লাহতায়ালা’র গুণবাচক নামগুলোর সাথে মিলিয়ে সন্তানের নামকরণ করেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। তবে তার মানে এই না যে নামকরণের ফলেই একজন ব্যক্তি নবী-রাসূল কিংবা আল্লাহতায়ালা’র প্রতিনিধিত্ব শুরু করবেন। যদি তা-ই হতো, তাহলে এত সুন্দর সুন্দর নামের মানুষগুলো খুন-ধর্ষণ-চাঁদাবাজী-দুর্নীতি-চুরি-ডাকাতি করতো না!

আর তারপরেও যদি আপনার মনে হয় ড: মুহম্মদ জাফর ইকবাল তার শিশুতোষ গল্পের বইয়ের নাম “ভূতের বাচ্চা সোলায়মান” রেখে নবীর অপমান করেছেন, এবং এই কারণে তাকে মেরে ফেলা উচিৎ এবং ফয়জুর রহমান তাকে ছুরিকাঘাত করে ঠিক কাজ করেছে- তাহলে আপনার উচিৎ হবে এই লেখাটি পড়া শেষ করেই ছুরি-চাপাতি হাতে রাস্তায় নেমে গিয়ে নবী-রাসূল-আল্লাহর গূণবাচক নামধারী সব ঘুষখোর, সুদখোর, গরীব পিটানো, ইভটিজার, ফেসবুকে গালিগালাজ করা, ঋণখেলাপী, বন্ধুকে গালি দেওয়া লোকজনকে কোপানো শুরু করা। ঈমানদার হলে ফুল ঈমানদারই হবেন, আধা ঈমানদার-আধা ভেজাল হবেন কেন?

তো কিভাবে নাস্তিক খুন করে পরিশুদ্ধ ঈমানদার হবেন তার স্টেপ-বাই-স্টেপ ইনস্ট্রাকশন শুনে যান। রান্নাঘরে গিয়ে নতুন সন্ধান পাওয়া ঈমানী জোশে বটিটা হাতে নিন। এবার চোখ পড়বে আপনার মায়ের উপর। উনি-ই সেই মা, যিনি আপনাকে জন্ম দিয়েছেন নয়মাস পেটে ধরে, যার রক্ত আপনার শরীরে, যিনি একবার আপনার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেই এক নিমিষে পৃথিবীর সব দু:খ-দু:শ্চিন্তা আপনি ভুলে যান, যিনি আদর করে ছোটবেলায় আপনার নাম রেখেছিলো মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, কিংবা আজিজুর রহমান, অথবা আদিল আহমেদ। এগুলোর প্রত্যেকটাই ইসলামিক নাম। আবার আপনার মা-ই সেই মানুষ, যিনি আপনার দুষ্টামি সামলাতে না পেরে আপনাকে বকা দিয়েছেন, হয়তো বিরক্তির চুড়ান্ত সীমায় পৌঁছে “কুত্তার বাচ্চা পেটে ধরসি আমি” বলে আপনাকে তিরস্কার করে আড়ালে গিয়ে চোখের পানি ফেলেছেন! ইসলামিক নামের অধিকারী আপনাকে গালি দেওয়া মানে উনি অবশ্যই ইসলাম, আল্লাহ, নবী-রাসূলের অবমাননা করেছেন। যত আগের ঘটনাই হোক না কেন, কোন দয়ামায়া দেখানো যাবে না। সর্বশক্তি দিয়ে মাথার মাঝ বরাবর একটা কোপ দিন, কিছু বুঝে উঠার আগেই আপনার “নাস্তিক”, ইসলাম অবমাননাকারী মা মারা যাবেন। কাটা কলাগাছের মত দেহটা মাটিতে পড়ে গেলেও হাত-পা অনিয়ন্ত্রিতভাবে কাঁপবে, মুখ দিয়ে গ্যাঁ-গোঁ শব্দও করতে পারে আপনার মা পরিচয় দেওয়া “নাস্তিকটা”। ভয় পাবেন না, উনি ব্যাথা পাচ্ছেন না। মগজই মাথা থেকে বের হয়ে গিয়েছে, ব্যাথা পাবে কিভাবে? মা নামের “নাস্তিক” টার মৃত্যু নিশ্চিত করে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে দুই পা আগালেই ডাইনিং টেবিলে দেখবেন আপনার বাবাকে…

এই লেখার নিচে কমেন্টে অনেকেই আমার মুন্ডুপাত করার সাথে সাথে মুখস্থ কমেন্ট করবেন- “ষ্যাঁড় জাফ্রিকবাল মরে না কেন?”। মনে রাখবেন, এই লোকের নামের শুরুতে “মুহাম্মদ” আছে। তাই ওনার নাম বিকৃত করে গালাগাল করা মানে আপনার যুক্তি মোতাবেক মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) কে গালি দেওয়া।

দেখুন, আমি আপনাকে ঈমানের সবক দেওয়ার কেউ না। মুহম্মদ জাফর ইকবালকে গালি দিলে আপনার ঈমান চলে যাবে, নাকি উল্টা সওয়াব হবে সেটা আমার জানা নাই। তবে অন্যের লজিকে খোদাকে খুঁজতে গেলে কিভাবে জঙ্গী হবার লজিক এবং শিক্ষা দুইটাই পাওয়া যায় সেটাই আমি আপনাকে দেখালাম। তাই প্রশ্ন করুন নিজেকে। অনলাইনে গালাগালি করে নিজের ঈমান জাহির হয়? নাকি এটা এক ধরণের গীবত (কারো অজ্ঞাতসারে তার পরনিন্দা করা)? জানেনই তো, কারো গীবত করা নিজের মৃত ভাইয়ের মাংস কাঁচা খেয়ে ফেলার মতই নোংরা কাজ!

আর তারপরেও যদি গালি দিতেই হয়, তাহলে গালি দিন সোলায়মান (কিংবা অন্যান্য নামের) আপনার আশেপাশের সব দুর্নীতিবাজ, ইভটিজার, গালিবাজ, গরীবের সাথে চোটপাট দেখানো এবং আপনার মাথা বেচে ব্যবসা করে যাওয়া লোকগুলোকে। যদি আপনি মনে করেন একজন মুহম্মদ জাফর ইকবাল এতটাই শক্তিশালী যে একটা বই লিখে সে নবী-রাসূলদের ইজ্জত কমাচ্ছেন, কিংবা আল্লাহর আরশ কাঁপিয়ে দিচ্ছেন- তাহলে ধরে নিতে হবে আপনার ঈমানে ঘাটতি আছে। তাই জাফর ইকবালের পিছনে অযথা সময় ব্যয় না করে সময় এবং শ্রম দিন যারা আসলেই আপনার ক্ষতির কারণ হচ্ছে তাদের সমালোচনা করে।

পুনশ্চ: সৃষ্টিকর্তা আপনাকে একটি মাথা দিয়েছেন। অন্যের কাছে বর্গা না দিয়ে এই মাথাটা কাজে লাগান!

[এই লেখার উপরের ফিচারড ইমেজে ব্যবহৃত মুহম্মদ জাফর ইকবালের ক্যারিকেচার অংশটি কার্টুনিস্ট তন্ময়ের আঁকা]

Most Popular

To Top