ফ্লাডলাইট

ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেডের মালিক যখন গাদ্দাফি!

গাদ্দাফির ম্যানইউ

২০০৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসের কোন এক সন্ধ্যা। ব্রিটিশ ডিল ব্রোকার মেহমেত ডালম্যান বাসায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। হঠাৎ টেলিফোন বেজে উঠলো, খুবই দরকারি নাকি। ডালম্যান খুবই বিরক্ত হলেন। ব্যবসার ব্যাপারটা বাসার ভিতরে আনা তাঁর পছন্দ নয়। খুবই বিরক্তির সাথে টেলিফোন রিসিভ করলেন। খুব বেশিক্ষণ কথা হল না। যখন কথা শেষে টেলিফোন রাখলেন তখন আর চেহারায় বিরক্ত ভাব নেই, চোয়াল ঝুলে পড়েছে বিস্ময়ে। স্ত্রীকে ডেকে বললেন- “আমাকে এখনই লিবিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিতে হবে, কর্নেল গাদ্দাফি আমার জন্য তাঁর নিজস্ব জেট পাঠিয়েছেন। তিনি কিছুক্ষণের মধ্যে ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেড ফুটবল টিমের মালিক হতে যাচ্ছেন”।

বলছিলাম স্যার ববি চার্ল্টন, ডেভিড বেকহাম, ওয়েন রুনি, রায়ান গিগসের মতো কিংবদন্তীর নাম যে ফুটবল টিমের সাথে জড়িয়ে আছে, সেই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কথা।

শুরুটা হয়েছিলো ১৮৭৮ সালে নিউটন হেল্‌থ ফুটবল ক্লাব নামে। ১৯০২ সালে নাম পরিবর্তন করে ‘ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড’ রাখা হয় এবং ১৯১০ সালে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডকে নিজস্ব ভেন্যু বানানো হয়। ‘দ্যা রেড ডেভিল’ খ্যাত এ টিমের ঝুলিতে আছে ২০টি লীগ টাইটেল, ১২টি এফএ কাপ, ৫টি লীগ কাপ, ২১টি কমিউনিটি শিল্ড এবং ৩টি উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লীগ জেতার রেকর্ড। শুধু শিরোপা জেতায় নয়, বাণিজ্যেও তাদের জয়জয়কার। ২০১৬-১৭ মৌসুমে যে কোন ক্যাটাগরিতে স্পোর্টস টিম হিসেবে সর্বোচ্চ আয় করা দল হচ্ছে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। গেল বছরও তাদের বাৎসরিক আয় ছিল ৫৭৬.৩ মিলিয়ন ইউরো, এবং দল হিসাবে তাদের মূল্য ছিল ২.৮৬ বিলিয়ন পাউন্ডের সমতুল্য।

এমন একটা টিমের মালিক কে না হতে চায়? লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট কর্নেল গাদ্দাফিও চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর চাওয়ার পিছনেও কারণ ছিল অনেক গভীর। কর্নেল গাদ্দাফি শুধু রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন পাক্কা রাজনীতিবিদ এবং দার্শনিক। রাজনীতি নিয়ে তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত দর্শন ছিল এবং তিনি সে দর্শন সর্বত্র প্রচার করতে চাচ্ছিলেন। একই সাথে তাঁর বিরোধীদেরও চিহ্নিত করতে চাচ্ছিলেন। এর জন্য দরকার ছিল উপযুক্ত স্থান, শ্রোতা, প্লাটফর্ম সবই। কিন্তু মনের মতো কিছু খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। যুক্তরাজ্য সফরে এসেই জানতে পারলেন ম্যানইউ’এর কথা।

তৎকালীন ইউনাইটেড কোচ স্যার আলেক্স ফার্গুসনের সাথে আইরিশ ধনকুবের জন মেগনিয়ার এবং জেপি ম্যাকমানুসের বনাবনি না হওয়ার গুজব চলছে তখন। বনাবনি না হওয়ার কারণটাও স্বাভাবিক। রক অব জিব্রাল্টার ছিল সে সময়ের ঘোড়দৌড় চ্যাম্পিয়ন। আর রক অব জিব্রাল্টারের যৌথ মালিক ছিলেন স্যার আলেক্স ফার্গুসন এবং জন মেগনিয়ারের স্ত্রী, সুসান মেগনিয়ার।

ম্যানইউ

রক অব জিব্রাল্টারের সাথে স্যার আলেক্স ফার্গুসন

সমস্যার শুরু হয় রক অব জিব্রাল্টারের অবসরের সময়। আসল মালিক কে এই নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। বিষয়টি একসময় আদালতের কাঠগড়ায় যায়। মামলা চলতে থাকে। এ কলহের রেষ লাগে দলের ভিতরও। স্যার ফার্গুসন ঘোষণা করেন, হয় তিনি থাকবেন নয়তো মেগনিয়ার থাকবে। কিন্তু দুইজন কখনই একসাথে না।

টিম কমিটি আলোচনায় বসলো। সিদ্ধান্ত হল জন মেগনিয়ারের শেয়ার বিক্রি করা হবে। রক অব জিব্রাল্টারের মালিকানায় জয়ী হলেও ইউনাইটেডের মালিকানা ছাড়তে হল মেগনিয়ার পরিবারকে।

মেগনিয়ারদের ২৯.৯% শেয়ার ক্রয় করা নিয়েই গাদ্দাফির উপদেষ্টাদের সাথে কথা বলতে লিবিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন মেহমেত ডালম্যান।

ম্যানইউ

মেহমেত ডালম্যান- কার্ডিফ সিটির চেয়ারম্যান

মেহমেত ডালম্যান সাইপ্রাসে জন্ম নেয়া তুর্কি-ব্রিটিশ উদ্যোক্তা। বড় বড় ব্যবসায়িক চুক্তির মধ্যস্থতা করাও তাঁর কাজ। ফুটবলের সাথে জড়িত সেই ১৮ বছর বয়স থেকেই। ইংলিশ ফুটবল টিম কার্ডিফ সিটির চেয়ারম্যান তিনি। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক নেই কিন্তু স্যার ফার্গুসনের স্নেহভাজন ছিলেন। কর্নেল গাদ্দাফির সাথে মধ্যস্থতা তাঁর উপরেই ভরসা করলেন তিনি। মেহমেত ডালম্যান মতে- সেদিন মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধান ছিল কর্নেল গাদ্দাফির ইউনাইটেডের মালিক হতে। গাদ্দাফি প্রস্তুত ছিলেন। এ সময় ডালম্যান স্যার ফার্গুসনের সাথেও কথা বলে যাচ্ছিলেন। তাঁকে বার বার বলছিলেন- “ভেবে দেখুন, ইউনাইটেড শুধু একটা ফুটবল টিম নয়, ভক্তরা একে ধর্মের দৃষ্টিতে দেখে। এ টিমের মালিক হওয়াটা অনেকটা চার্চ অব ইংল্যান্ডের মালিক হওয়ার মতো। সেই ক্ষমতা আপনি গাদ্দাফির হাতে তুলে দিচ্ছেন। ফুটবল বিশ্ব হয়তো খুব ভাল চোখে দেখবে না বিষয়টা”। তখন স্যার ফার্গুসনও দোটানায় ভিতর ছিলেন।

শেষমেশ ইউনাইটেডের দাবীতে গাদ্দাফি রাজি না হওয়াতে আর লেনদেন সম্পন্ন হয়নি। ডালম্যান ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন ত্রিপলি থেকে। পরে আমেরিকান ধনকুবের ম্যালকম গ্লেজার কিনে নেন জন মেগনিয়ারের ২৯.৯% শেয়ার।

ম্যানইউ

স্যার ববি চার্ল্টনের সাথে মেলকম গ্লেজার পুত্রগণ

ধীরে ধীরে, ম্যালকম গ্লেজার তাঁর শেয়ারের পরিমাণ বাড়াতে থাকেন। তাঁর মৃত্যুর পর ইউনাইটেডের মালিক হন তাঁর সন্তান আভ্রাম গ্লেজার এবং জোয়েল গ্লেজার। বর্তমানে গ্লেজার পরিবার ইউনাইটেডের ৯০% শেয়ারের মালিক।

ম্যানইউ

স্যার আলেক্স ফার্গুসনের সাথে গ্লেজার পরিবার

অন্যদিকে, গাদ্দাফি কিনে নেন ইতালিয়ান ক্লাব পেরুগিয়া।

এ সব তথ্যই উঠে এসেছে পত্রিকা ‘সানডে টাইমস’এ দেয়া মেহমেত ডালম্যানের সাক্ষাৎকারে। বলেছেন, সেদিন হয়তো ফুটবলের নতুন ইতিহাসের জন্ম নিতে পারতো, কর্নেল গাদ্দাফি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে কিনতে এতোটাই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। ২০০৫ সালে কর্নেল গাদ্দাফি পুত্র, সাদি গাদ্দাফিও এ বিষয়ে বিবৃতি দিয়েছেন ‘ফিনান্সিয়াল টাইম্‌স’ পত্রিকাতে। “খুবই অবাক হয়েছিলাম যখন অফারটার কথা শুনি। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড! বাবাকে অনেক জোর দিচ্ছিলাম গ্রহণ করার জন্য। বাবা রাজিও হয়েছিলেন, কিন্তু আমাদের গোপন রাখতে বলা হয়েছিলো কারণ ব্যাপারটা ঘটতে যাচ্ছিলো। বিশ্বাস হচ্ছিলো না, স্বপ্ন দেখছি মনে হচ্ছিলো। ভয়ও লাগছিল, মনে হচ্ছিলো ইউনাইটেড ভক্তরা মেনে নেবে না ব্যাপারটা। হিতে বিপরীতও কিছু হতে পারে। তারপরও মনে প্রানে চেয়েছিলাম যাতে উভয় পক্ষই রাজি হয়। কিন্তু শেষমেশ কেন জানি আর হল না”- এ সবই বলেছেন গাদ্দাফিপুত্র।

সেদিন হয়তো ডালম্যানের মধ্যস্থতায়  চুক্তি হয়েও যেতে পারতো। কর্নেল গাদ্দাফি হতেন বিশ্বের সব থেকে বড় ফ্যানবেজের মালিক। সৃষ্টি হত ফুটবলের নতুন উপাখ্যান।

আরো পড়ুনঃ একজন সালাহ’র গল্প

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top