নিসর্গ

এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম

এশিয়ার পরিচ্ছন্ন গ্রাম

দু’দিনের ঝটিকা সফরে ভারত গিয়েছি ঘুরতে। অবশ্য ভারত হলেও সিলেটের খুব কাছে তামাবিল বর্ডার দিয়ে এন্ট্রি করে মাত্র ১০ কিলোমিটার ভেতরে গিয়েছি। উদ্দেশ্য উমগট নদী ও স্লোনেংপেডেং গ্রামে একদিন কাটাবো।

অসাধারণ একটি দিন কাটালাম পাহাড়ি নদী উমগটের পাড়ে। সেখান থেকে ২০ কিলোমিটারের পথ, এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম মওলিননং। অনেক শুনেছি এই গ্রামের মানুষের কথা, তাদের পরিচ্ছন্নতার কথা। এত কাছ থেকে গ্রামটি না দেখে ফিরে যেতে মন চাইছিলো না। তাই পরদিন খুব ভোরে উঠে রওনা হয়ে গেলাম এশিয়ার পরিচ্ছন্ন গ্রাম এর উদ্দেশ্যে।

যেতে যেতে ভাবছিলাম, কি এমন আছে সেখানে, যে এটাই পুরো এশিয়া মহাদেশের মধ্যে সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম!
পথ চলতে চলতে মনে পড়ছিলো, ছোট বেলায় দেখা গ্রামের বাড়ির কথা। জেঠী মা ভীষণ পরিচ্ছন্ন ছিলেন, সারাদিন একটু পর পর বাড়ি ঝাঁট দিতেন। বাড়ির চারপাশটা ঝকঝকে থাকতো। ভাবলাম, মওলিননং হয়তো তেমনই হবে, এর বেশি পরিষ্কার হওয়ার আর কি থাকতে পারে?

ভাবতে ভাবতেই এসে পড়েছি মওলিননং এ। ড্রাইভার বললো, “ম্যাম, হাম পৌঁছ গেয়া”। গাড়ি থেকে নেমেই, চারপাশটা একনজর দেখে হকচকিয়ে গেলাম। শুধু গ্রামের রাস্তাঘাটই পরিষ্কার নয়, এখানকার সবকিছুতেই পরিচ্ছন্নতার ছাপ। খাসিয়া সম্প্রদায়ের বসবাস এই গ্রামে। গ্রামটি গাছ-গাছালিতে ভরা, এরপরও কোন পাতা পড়ে নেই রাস্তায়। এমনকি প্রতিটি গাছতলাও পরিচ্ছন্ন।

এশিয়ার পরিচ্ছন্ন গ্রাম

ময়লাহীন রাস্তা

বাড়ির সামনের বাগান, ঘরের দাওয়া সব ঝকঝকে তকতকে। গ্রামের শিশু, বৃদ্ধ, তরুণ-তরুণী সবার পরিপাটি বেশভূষা। এখানকার সবাই চমৎকার ইংরেজিতে কথা বলে তাই পর্যটকদের তাদের সাথে গল্প জমে ওঠে মুহূর্তেই। আমি বেশ কিছুক্ষণ গ্রামের ভেতরে ঘুরলাম উদ্দেশ্য একটাই তাদের জীবন যাপন দেখা। কাঠের তৈরি ঘরগুলোর ভেতর বাইরে কোন মাকড়শার ঝুল পর্যন্ত দেখতে পেলাম না। এ গ্রামের সব শিশুরা স্কুলে যায়, পাহাড়ি হলেও ওরা ছেলে সন্তান বা মেয়ে সন্তানের মধ্যে ভেদাভেদ করে না। গ্রামের শতভাগ মানুষ শিক্ষিত।

এশিয়ার পরিচ্ছন্ন গ্রাম

ঘরে বাইরে সব জায়গায় সমান পরিষ্কার

হাঁটার পথে চোখে পড়লো, কয়েক হাত পর পর ময়লার ঝুড়ি, খাসিয়াদের নিজস্ব ডিজাইনে বানানো  এসব ঝুড়িতেই ওরা চলতে পথে চিপসের প্যাকেট, চকলেটের খোসা এসব ফেলে, শিশুরাও কোন ময়লা রাস্তায় ফেলে না। বাড়িগুলোর সামনে, ঘরের ভেতরও এসব ডাস্টবিন ঝুড়ি রাখা। পালা করে পুরো গ্রাম দিনে কয়েকবার ঝাঁট দেয় ওরা। পথ চলতে সামনে ময়লা, আবর্জনা দেখলেই সাথে সাথেই তা তুলে ঝুড়িতে রাখে। ভাবছেন হয়তো ছোট গ্রাম, না একেবারে ছোট নয় গ্রামটি। স্যানিটেশন ব্যবস্থাও চমৎকার।

এশিয়ার পরিচ্ছন্ন গ্রাম

গ্রামে সবাই নির্ধারিত জায়গায় ময়লা ফেলে

দেখতে দেখতে খিদে পেয়ে গেছে, মাতৃতান্ত্রিক গোষ্ঠী বলে, তাদের সবকিছুই নারী কেন্দ্রিক। খাবারের দোকানগুলোও সামলাচ্ছে মেয়েরা। একটা খাবার ঘরে ঢুকলাম। এত লোককে খাবার পরিবেশন করছে ওরা কিন্তু মেঝে পানির ছিটা পর্যন্ত নেই, টেবিল, পাত্র, মেঝে সব কিছু একটু বেশিই পরিষ্কার। এই গ্রামে প্রতিদিন তিন থেকে চারশো পর্যটক আসে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ ও বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে। এত পর্যটকের ভিড় তারপরও কিভাবে পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব তা নিজ চোখে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করতে চাইবে না।

খাওয়ার পর হাত ধুতে গিয়ে, আমার কাছ থেকে খানিকটা দূরে দেখলাম এক খাসিয়া কিশোর হাত ধুচ্ছে। সে প্রথম সাবান দিয়ে হাত ধুলো তারপর দু’হাতে ভালো করে স্যাভলন লিকুইড মেখে খানিকক্ষণ অপেক্ষা করে তারপর আবার দুই হাত ধুয়ে পরিষ্কার করলো- এই হচ্ছে তাদের রোজকার অভ্যাস।

এখানে কারো উচ্চস্বরে কথা বলা, ঝগড়া বিবাদ করা, আইন ভাঙ্গা গ্রামের কমিউনিটিতে নিষিদ্ধ। সবচেয়ে বড় কথা এই গ্রাম পরিচ্ছন্ন রাখা কিংবা সচেতনতা কর্মসূচী, শিক্ষার হার বাড়ানোতে সরকারের কোন প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেই। গ্রামের মানুষ স্বেচ্ছা শ্রমে নিজেরাই নিজেদের গ্রাম পরিষ্কার করছে। কোন গ্রাম পুলিশ নেই, তবুও কেউ আইনের বাইরে যাচ্ছে না। সব মিলিয়েই এই গ্রামকে তাই এশিয়ার পরিচ্ছন্ন গ্রাম বলা হয়।

Most Popular

To Top