নাগরিক কথা

যেভাবে হামলা হলো মুহাম্মদ জাফর ইকবালের উপরঃ প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান

যেভাবে হামলা হলো মুহাম্মদ জাফর ইকবালের উপরঃ প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান

দুপুর আড়াইটার দিকে সেন্ট্রাল অডিটরিয়ামের সিঁড়িতে বসে সকল কন্টেস্টেন্ট ও ইইই ফেস্টিভালের আয়োজকেরা জাফর স্যারের সাথে বসে একসাথে লাঞ্চ করছিলাম। স্যার ছিল আমার ঠিক দু’ সিঁড়ি নীচে। তখনই আমি আমার পাশে বসা জুনায়েদকে বলছিলাম, স্যার সবার সাথে এভাবে কোনো রকম নিরাপত্তা ছাড়াই বসে লাঞ্চ করছে… এই অবস্থায় যে কেউই তো চাইলে স্যারের উপর হামলা চালাতে পারে। ক্যাম্পাসে আসার পর থেকে যখনই আমি জাফর স্যারকে সামনাসামনি অনেকটা খোলামেলা পরিবেশে দেখি, এই কথাটাই কেন জানি আমার মাথায় প্রথম আসে।

এবং কী অদ্ভুত! ৩ ঘণ্টা পর সেইটাই হলো। আমি ছিলাম স্যার থেকে ৫-৬ ফুট দূরে। অনলাইনে হামলাকারীসহ যে ছবিটা দেখা যাচ্ছে ওই ছবিতে স্যারের ঠিক নিচে একটু সামনে বসা অবস্থায় ছিলাম আমি।

যেভাবে হামলা হলো মুহাম্মদ জাফর ইকবালের উপরঃ প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান

ওই ছবিটা তোলার প্রায় ৩০ মিনিট পরের ঘটনা। আমি ছিলাম মুক্তমঞ্চের ডান পাশটায়, নীচে। ওখানে বসে আমাদের বটে চার্জ দিচ্ছিলাম। তখন রোবো ফাইটের ফার্স্ট রাউন্ড মাত্র শেষ হয়েছে। ফার্স্ট রাউন্ডের দুটা গেম খেলে সেকন্ড রাউন্ডে উঠেছি আমরা। ফার্স্ট রাউন্ড শেষ করে আয়োজকেরা সেকন্ড রাউন্ডের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা মাত্র মাইকে ঘোষণা দিয়েছে। জাফর স্যারসহ অন্যরা তখন মুক্তমঞ্চের উপর। ৫ঃ২৫ এর মতো বাজে তখন।

হঠাত চিৎকার ও চেঁচামেচি শুনতে পেলাম। সাথে সাথেই পিছন ঘুরে তাকিয়ে দেখি জাফর স্যারের ঘাড় বেয়ে রক্ত পড়ছে। বাকী স্যার ও পুলিশরা তাঁকে ঘিরে রেখেছেন, স্যারকে সেখান থেকে সরিয়ে গাড়িতে তোলার প্রিপারেশন নিচ্ছেন। আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই সবার দৌড়াদৌড়ি, চিল্লাচিল্লি শুরু। কয়েকজন আবার আক্রমণকারীকে আচ্ছামতো ধোলাই দিচ্ছে। আমি ভেবেছি কেউ হয়তো গুলি চালিয়েছে, আরও উলটাপালটা গুলি চালাতে পারে। এমনটা ভেবে ওখান থেকে দৌড়ে গোলচত্ত্বরের দিকে দৌড়ে আসলাম। ওদিকে স্যারকে সাথে সাথেই একটি মাইক্রোতে করে হাসপাতালে নেওয়া হলো।

তারপর… জীবনের অন্যতম শঙ্কা নিয়ে কাটালাম পরবর্তী আধা ঘণ্টা। স্যার কি বাঁচবেন নাকি…? যাকে সামনে পাচ্ছি, ঘটনার সময় স্যারের একদম কাছাকাছি যারা ছিল তাকেই জিজ্ঞেস করে জানার চেষ্টা করতেসি কতটা গুরুতর স্যারের আঘাত। আশাব্যাঞ্জক কিছু শুনছিলাম না। আমার চোখ তখন প্রায় ভেজা ভেজা অবস্থা। আশেপাশে অনেকেই হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিছে।

কিচ্ছু বলবো না। স্যারের আজকেরই একটা কথা বলে লেখাটা শেষ করি। হামলার পর স্যারকে যখন হাসপাতালের ওটিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন তিনি বারবার বলছিলেন, “হামলাকারীরা কেমন আছে? তাকে আবার কেউ যেনো মারধর না করে।”

জানি, স্যার সুস্থ্ হয়ে আবারও হয়তো ক্যাম্পাসে ফিরে আসবেন। এখন সাথে পুলিশ থাকে ৪ জন, সামনে হয়তো আরও ৪ জন বাড়বে, একদিন আবারও সবার কাছাকাছি আসবেন, সবার সাথে ভিড়ে মিশবেন এবং আবারও … (ডট ডট না দিয়ে তখন হয়তোবা ফুলস্টপ দিতে হবে)।

এটাও জানি, এসব সমস্যা বা অপরাধের সমাধান বা বিচার নেই। থাকলেও অন্তত আমাদের দেশে সম্ভব না। কারও প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। আমার অভিযোগটা একজন সাধারণ, বোকাসোকা মানুষের প্রতি। আর সেই সহজ-সরল বোকাসোকা মানুষটা হচ্ছেন জাফর স্যারই নিজেই। কী দরকার এতো সাধারণ থাকার?

লিখেছেনঃ পরিতোষ পাল

আরো পড়ুনঃ

আসুন, একটু লজ্জিত হই…
এরপর কে হবেন ‘টার্গেট’?
এই হামলা কি অবাক হওয়ার মত কিছু?
“আমি নিজেই জাফর ইকবালকে ছুরি মারতাম”

Most Popular

To Top