নাগরিক কথা

আসুন, একটু লজ্জিত হই…

মুহম্মদ জাফর ইকবাল নিয়ন আলোয় neon aloy

“তোমরা এত হৈচৈ করো না, যতদূর আমি নিজে কন্ট্রোল করতে পারি আমি করছি। তোমরা আমাকে ধর, আমার রক্তের গ্রুপ এ পজিটিভ।”

কথাগুলো বলছিলেন ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে দুষ্কৃতিকারীর ছুরির আঘাতে আহত হওয়ার পর। মাথার পিছনে ও পিঠে আঘাত করা হয়েছে, রক্তে পুরো শরীর ভেসে যাচ্ছে। ক্ষতস্থান হাত দিয়ে চেপে ধরে কথাগুলো বলছিলেন তিনি, মানুষটা সংকটের মূহূর্তে মাথা ঠিক রাখতে জানেন। তবে, “উলুবনে মুক্তো ছড়ানো” বলতে একটা কথা আছে, সেটা সম্ভবত ভালোভাবে জানেন না, জানলেও মানেন না।

ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের সাথে গতকাল কী হয়েছে সেটা সবাই ইতোমধ্যে জেনে গিয়েছি, সুতরাং বিশদভাবে বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। তবু দুই-একটা কথা বলি। আমি হোটেলে বসে চা খাচ্ছি। খালার ফোন এল। “তুমি কই, তোমাদের জাফর ইকবালকে নাকি ছুরি মেরেছে? তাড়াতাড়ি বাসায় যাও, পুলিশ নাকি যাকে পাচ্ছে ধরে নিয়ে যাচ্ছে।”

দু-এক জায়গায় ফোন দিয়ে খোঁজ নিলাম। বাসায় যাওয়ার বদলে আমি দৌঁড়ালাম হাসপাতালে। মা-খালাদের সব কথা ধরতে নেই। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। কীভাবে হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছালাম মনে নেই। গিয়ে দেখি ফ্লোরভর্তি মানুষ। অধিকাংশই শাবিপ্রবি’র ছাত্র। কেউ হাউমাউ করে কাঁদছে, কেউ মানুষের ভীড় নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। সেখানেই বিস্তারিত শুনলাম। ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদান শেষ হওয়ার পর এক যুবক পেছনে থেকে ছুরি দিয়ে কয়েকবার আঘাত করে। ছাত্ররা হামলাকারীকে তখনই আটক করে এবং উত্তম-মধ্যম দিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে। হামলাকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নয়। মোটামুটি এই হল ঘটনা।

জাফর ইকবাল সবচেয়ে বেশি পরিচিত সাহিত্যিক হিসেবে। আমাদের দেশে সায়েন্স ফিকশন ধারাটিকে জনপ্রিয় করে তোলার একক কৃতিত্ব তার, একটা সময় ছিল যখন সায়েন্স ফিকশন বলতেই পাঠকরা বুঝত মুহম্মদ জাফর ইকবালের লেখা। লিখেছেন দীপু নাম্বার টু, হাতকাটা রবিন, মেকু কাহিনী’র মত অবিস্মরণীয় কিশোর উপন্যাস। সে যাক, তার সাহিত্যিক জীবন নিয়ে বেশি আলোচনা করার ইচ্ছে নাই আজকে।

“উলুবনে মুক্তো ছড়ানো” বলতে একটা কথা আছে, সেটা সম্ভবত ভালোভাবে জানেন না, জানলেও মানেন না।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিগত অবকাঠামো নির্মাণে কারও একক ভূমিকা যদি উল্লেখ করতে হয়, তবে যার নাম সবার প্রথমে আসবে তিনি ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। বিশ্বখ্যাত বেল ল্যাবরেটরিতে রিসার্চ করার মত উচ্চ বেতন এবং তার চেয়েও উচ্চ সম্ভাবনাময় একটা লোভনীয় কাজ ছেড়ে একজন লোক দেশে ফিরে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন- অর্থনৈতিক দিক থেকে দেখলে খুবই অবান্তর একটা কাজ। তবে দেশপ্রেম বলতে বিলুপ্তপ্রায় একটা ব্যাপার আছে, জাফর ইকবালের মত লোকদের জন্যই সেটাকে এখনও জাদুঘরে পাঠিয়ে দেয়া যাচ্ছে না। এই দেশপ্রেম নামক দুষ্টবুদ্ধির কারণেই তিনি ফিরে এলেন দেশে, যোগ দিলেন মাত্র চালু হওয়া অখ্যাত এক বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারপরের কাহিনীটুকু অনেকটা গল্পের মত। কখনও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে (তিনি বিভিন্ন সময়ে শাবিপ্রবি’র অন্তত চারটি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ছিলেন), কখনও সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে, কখনও বা শিক্ষক হিসেবে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কাজ করে গেছেন। সোচ্চার ছিলেন নকল ও প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে। ভর্তি পরীক্ষার বর্তমান প্রথার বিপক্ষে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার দাবী জানিয়ে অনেকের রোষানলে পড়েন তিনি। মনে রাখবেন, ভর্তি পরীক্ষার সাথে বিপুল পরিমাণ আর্থিক লাভের বিষয়টি জড়িত।

২০০৮ সালের ঘটনা। ক্যাম্পাস থেকে একজন ছাত্রীকে জোরপূর্বক উঠিয়ে নিয়ে গেল তার এক আত্মীয়। “ঘর কা মামলা”- ভেবে প্রশাসন চুপ করে রইল। এগিয়ে এলেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল এবং তার স্ত্রী ড. ইয়াসমীন হক। আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে চাপ প্রয়োগ করলেন প্রশাসনের উপর। উদ্ধার করা গেল মেয়েটিকে। এরকম আরও অজস্র ঘটনায় শাবিপ্রবি’র ছাত্ররা পাশে পেয়েছে মুহম্মদ জাফর ইকবালকে।

শাবিপ্রবি ক্যাম্পাস থেকে অপহৃত ছাত্রীকে উদ্ধারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে আন্দোলনে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল এবং ড. ইয়াসমিন হক (২৭ এপ্রিল, ২০০৮)

শাবিপ্রবি ক্যাম্পাস থেকে অপহৃত ছাত্রীকে উদ্ধারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে আন্দোলনে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল এবং ড. ইয়াসমীন হক (২৭ এপ্রিল, ২০০৮)

ক্যাম্পাস ছেড়ে এবার দেশের প্রেক্ষাপটে আসি। দেশের সমকালীন সমস্যা নিয়ে যারা নিয়মিত লেখালেখি করেন, তাদের মধ্যে জাফর ইকবাল অন্যতম। সবচেয়ে বেশি লেখালেখি করেন রাজনৈতিক সমস্যা, দুর্বল শিক্ষানীতি এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে। শেষোক্ত বিষয়টি নিয়ে লেখালেখির কারণে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়ে গেলেন, দেশের একশ্রেণীর ধর্মান্ধ মানুষ তার বিরুদ্ধে উঠে-পড়ে লাগল। তাকে ঘোষণা দেয়া হল নাস্তিক-মুর্তাদ হিসেবে এবং তাকে কতল করা ফরজ বলে ফতোয়া দেয়া হল। নাস্তিক-মুর্তাদ কতল করে জান্নাত হাসিল করার (!) শর্টকাট রাস্তার ব্যাপার এদেশের ধর্মান্ধ মানুষেরা বরাবরই উৎসাহী, তারপরও যে তিনি এতদিন ধরে বহাল তবিয়তে বেঁচে আছেন সেটাই আশ্চর্য।
অবশ্য এতটা বহাল তবিয়তেও নয়। ২০১৬ সালের অক্টোবরে মুহম্মদ জাফর ইকবাল এবং ইয়াসমীন হককে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নামের একটি জঙ্গি সংগঠন প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে মোবাইল বার্তা পাঠায়। এই ঘটনার পর তার নিরাপত্তার জন্য সার্বক্ষণিক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এরও আগে, তার বাসাতেই চলে উগ্রবাদীদের ককটেল হামলা।

তিনি আস্তিক না নাস্তিক সেই বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই, এটা যার যার ধর্মীয় স্বাধীনতার ব্যাপার। তারপরও, জাফর ইকবালকে কেন নাস্তিক বা মুর্তাদ মনে করেন- এই প্রশ্নের উত্তরে প্রায় শতভাগ উগ্রপন্থীরা বলবেন, অমুক হুজুর বলেছেন, কিংবা, অমুক ওয়াজ মাহফিলে শুনেছি। “হুজুগে বাঙ্গালী” কথাটা এমনি এমনি আসেনি।

বোবার শত্রু নেই- জাফর ইকবাল বোবা নন, উপরন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেন, সুতরাং তার শত্রুর অভাব নেই। আরেক শ্রেণীর শত্রু হল রাজনৈতিক শত্রু। ক্ষমতাসীন দলের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বললে তারা নাখোশ হয়ে ওঠে, অপরদিকে বিরোধীদল “আপনা আদমী” ভেবে বেজায় খুশি হয়। এবং ভাইস-ভার্সা। ফলে সরকারি দল-বিরোধীদল দুই পক্ষে তাকে অপছন্দ করে এমন লোক প্রচুর। তার উপর, যুদ্ধপরাধীদের বিচারের পক্ষে সোচ্চার হয়ে চক্ষুশূল হলেন আরেক ক্ষমতাশালী ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের।

হুজুগে বাঙ্গালীয়ানার প্রকৃষ্ট উদাহরণ দেখতে পাবেন গতকালের ঘটনা নিয়ে নিউজ করা কোন অনলাইন পোর্টালের কমেন্ট সেকশনে গেলে। তার প্রাণে বেঁচে যাওয়ায় আফসোস করা এবং তার মৃত্যু কামনা করা মানুষের সংখ্যা শুধু বেশি তাই নয়, ভয়াবহভাবে বেশি। আরও যা যা বলা হচ্ছে তা লিখতে আমি অস্বস্তি অনুভব করছি। ধর্মান্ধতা আমাদের সমাজকে কীভাবে গ্রাস করছে এগুলো তারই প্রমাণ। উলুবনে মুক্তো ছড়ানো কথাটা এইজন্যই বলা।

মুহম্মদ জাফর ইকবাল নিয়ন আলোয় neon aloy

মুহম্মদ জাফর ইকবাল নিয়ন আলোয় neon aloy

ড মুহম্মদ জাফর ইকবালের উপর হামলার খবর প্রকাশ পেতেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উল্লাস প্রকাশ শুরু করে কিছু মানুষ

একটু শাবিপ্রবি ক্যাম্পাসের কথায় ফিরে আসি। ক্যাম্পাস অনেকদিন ধরেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। অহরহ ছিনতাই, ছাত্রী-হলের জানালার গ্রিল কেটে রুম থেকে চুরি, ছিনতাইকারীর হাতে ভর্তি-পরীক্ষার্থী ছুরিকাহত, বহিরাগতদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল হাঁকানো- ইত্যাদি ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা আতঙ্কিত। মুহম্মদ জাফর ইকবাল নিজেও ছিলেন নিরাপত্তা জোরদার করার ব্যাপারে উচ্চকন্ঠ। তারপরও সান্ধ্য আইন জারী করে ছাত্রীদের রাত আটটার মধ্যে হলে ফেরাতে কিংবা আটকে রাখতে প্রশাসন যতটুকু তৎপর, ততটুকু তৎপরতা ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা জোরদার করার ব্যাপারে দেখা যায় না। এই অসাবধানতার সর্বশেষ শিকার মুহম্মদ জাফর ইকবাল।

হাসপাতালে নেওয়ার সময় তার বলা একটা কথা মাথায় ঘুরছে।

“যে ছেলেটা আমার উপর হামলা চালিয়েছে, তাকে কিছু করো না। আগে খোঁজ নাও ও আমার ছাত্র কিনা।”

আমরা জানি না আমরা তার ভালোবাসার কতটুকু মূল্য দিতে পারব। সৃষ্টিকর্তা আমাদের এই ভালোবাসার উপযুক্ত হওয়ার ক্ষমতা দান করুক।

মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলতে চোখে ভাসে সাদা চুল-গোঁফের স্বপ্নবাজ একজন মানুষ, যিনি স্বপ্ন দেখতে এবং দেখাতে জানেন। যিনি বিশ্বাস করেন, এই দীর্ঘশ্বাস এবং হাহাকারের দেশ, এই ঘূঁণে ধরা পঁচে যাওয়া সমাজ আমরা পালটে দিতে পারি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রথম শিশুটিকে উপহার দিতে পারি বিশুদ্ধ পৃথিবী।

ড. জাফর ইকবালের আশু সুস্থতা কামনা করছি। আমাদের একজন জাফর ইকবালের খুব প্রয়োজন। পৃথিবীতে স্বপ্ন দেখতে জানা মানুষের বড় অভাব।

আরো পড়ুনঃ

এরপর কে হবেন ‘টার্গেট’?
যেভাবে হামলা হলো মুহাম্মদ জাফর ইকবালের উপরঃ প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান
এই হামলা কি অবাক হওয়ার মত কিছু?
“আমি নিজেই জাফর ইকবালকে ছুরি মারতাম”

Most Popular

To Top