টুকিটাকি

এরপর কে হবেন ‘টার্গেট’?

এরপর কে হবেন ‘টার্গেট’?- নিয়ন আলোয়

ডক্টর জাফর ইকবালের নামের আগে যত বিশেষণই যুক্ত করা হোক না কেনো যেনো তা কম মনে হয়। একজন জাফর ইকবাল যুগে যুগে জন্মান না, তাই সব বিশেষণই এমন ব্যক্তির নামের গাম্ভীর্যের কাছে ফিকে মনে হয়। তথাকথিত রাজনৈতিক বুদ্ধিজীবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেননি তিনি, শিক্ষাবিদ হিসেবে দেশের সবচেয়ে বেশি সম্মান করে তাকে। যারা তাকে সরাসরি শিক্ষক হিসেবে পাননি তারাও জাফর ইকবালকে নিজের শিক্ষক হিসেবেই মানেন।

জাফর ইকবালের উপর হামলার আশংকা অনেক আগ থেকেই ছিলো, বেশ কয়েকবার হত্যার হুমকিও দেয়া হয়েছে তাকে। আইন শৃংখলা বাহিনীর মধ্যেও এ আশংকা ছিলো তাই জাফর ইকবালের নিরাপত্তায় পুলিশ পাহারার ব্যবস্থা করা হয়। ৩ ফেব্রুয়ারি, শনিবার হামলার সময়ও ৮/১০ জন পুলিশ স্যারের পাহারায় ছিলেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা যায়, স্যারের পেছনে পুলিশের কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলো হামলাকারী ফয়জুর রহমান ফয়জুল। অবস্থা দেখে এমনটা প্রশ্ন জাগে মনে, যে পুলিশের উপস্থিতিকেও তোয়াক্কা করছে না এসব ঘটনায় জড়িতরা। তাদের সাহস, সামর্থ্য কি এতই বেশি!!
এমন সাহস করতে পারার পেছনে কি কারণ থাকতে পারে, হামলাকারীদের নেটওয়ার্ক এতটাই কি শক্তিশালী?

গত কয়েকবছরে মুক্তচিন্তার, অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের মানুষদের উপর ঘটেছে একের পর এক হামলা। শিক্ষক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, প্রকাশক কেউই বাদ যাননি হামলার তালিকা থেকে। কিন্তু এসবের বিচার কিংবা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কয়টা হয়েছে? চলুন পাঠক, এর আগের ঘটনাগুলোর ফ্ল্যাশব্যাক জেনে নেই।

শুরুটা হয় অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদকে দিয়ে। ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, একুশের বইমেলা থেকে ফেরার সময় বাংলা একাডেমির সামনে হামলার শিকার হন তিনি। সেসময় প্রাণে বেঁচে গেলেও দেশে কিছুদিন চিকিৎসা পর, উন্নত চিকিৎসার জন্য হুমায়ুন আজাদকে জার্মানিতে নেয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেখানেই একই বছরের ১১ আগস্ট মৃত্যু হয় তাঁর।

এরপর কে হবেন ‘টার্গেট’?

হুমায়ূন আজাদ

এরপর ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ব্লগার রাজীব হায়দারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি ঘটে মিরপুরে।

এরপর হামলার শিকার হন বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায়। ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে বের হওয়ার পর তাকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এসময় অভিজিৎতের স্ত্রী রাফিদা আহমেদ গুরুতর আহত হন। একই বছরে অভিজিৎ রায়ের বই প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনকেও কুপিয়ে হত্যা করা হয় আজিজ সুপার মার্কেটে তাঁর নিজ অফিসের ভেতর। ৩১ অক্টোবর ঐদিনে হামলার শিকার হন প্রকাশনা সংস্থা শুদ্ধস্বরের মালিক আহমেদুর রশিদ টুটুল।

এরপর কে হবেন ‘টার্গেট’?

অভিজিৎ রায়

২০১৫ ও ১৬ সালে জঙ্গি হামলায় আরো নিহত হন অনন্ত বিজয়, ওয়াশিকুর, নামিজুদ্দিন সামাদসহ কয়েকজন ব্লগার, প্রকাশক, লেখক।

এসব ঘটনায় মামলাগুলোর তদন্তে আইন শৃংখলা বাহিনীর তদন্তে বার বার উঠে এসেছে আনসার আল ইসলামের নাম।
এর মধ্যে ব্লগার রাজীব হত্যার বিচার হয়েছে। এছাড়া বেশিরভাগ হামলা মামলার তদন্তই এখনো শেষ হয়নি। নীরবে দেশ ছেড়ে গিয়েছেন নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা অনেক ব্লগার, লেখক।

২০১৬ সালের এপ্রিলে জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলাম একটি তালিকা প্রকাশ করে, শিরোনাম দেয় ‘কে হবে পরবর্তী টার্গেট’। হত্যার হুমকিতে থাকা এই তালিকায় দ্বিতীয় নম্বরে ছিলেন অধ্যাপক জাফর ইকবাল। ঘোষণা দেয়ার প্রায় দুই বছর পর শাবিপ্রবি ক্যাম্পাসে একটি অনুষ্ঠান চলার সময় প্রকাশ্যেই হামলার শিকার হলেন তিনি।

এসব ঘটনায় যেমন পথে ঘাটে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একদল মানুষকে আমরা উল্লাস প্রকাশ করতে দেখি, তেমনি ধর্মীয় উগ্রতার স্বীকার এসব হামলা নিয়ে দায়িত্বশীল অনেক ব্যক্তিকেই বিতর্কিত মন্তব্য করতে দেখা গেছে। নিহতদের পরিবার বার বার বিচার ব্যবস্থার উদাসীনতাকে দায়ী করে আসছেন। এর মাঝে আবার বইমেলায় আইন শৃংখলা বাহিনী ও বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে ধর্মীয় মতবাদ ও মুক্তচিন্তার লেখা নিয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতেও দেখা গেছে। আর এসবের মধ্যে দিয়ে উগ্রবাদীরা তাদের হামলা চালিয়ে যাচ্ছে অনায়াসে। এ যাত্রা অধ্যাপক জাফর ইকবাল প্রাণে বেঁচে গেছেন কিন্তু তিনি কি আদৌ নিরাপদ?

আরো পড়ুনঃ

আসুন, একটু লজ্জিত হই…
যেভাবে হামলা হলো মুহাম্মদ জাফর ইকবালের উপরঃ প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান
এই হামলা কি অবাক হওয়ার মত কিছু?
“আমি নিজেই জাফর ইকবালকে ছুরি মারতাম”

Most Popular

To Top