টুকিটাকি

কি চমৎকার দেখা গেল…

কি চমৎকার দেখা গেল...

“তোমার বাড়ির রঙয়ের মেলায় দেখেছিলাম বায়োস্কপ…… বায়োস্কপের নেশা আমায় ছাড়ে না…”

রাজধানীর কাঠখোট্টা রাজপথ দিয়ে চলছেন, হঠাৎ শুনতে পেলেন খঞ্জনীর শব্দ আর সুর করে কেউ বলছে, “তার পরেতে দেখা গেলো…………।” তখন কিছু না ভেবে নিশ্চিত বুঝে নিন চলছে জলিল মিয়ার বায়োস্কপ।

রাজশাহীতে জন্ম জলিল মিয়ার পূর্ব পুরুষদের পেশা ছিলো গ্রামের পথে পথে বায়োস্কপ খেলা দেখানো। ছোটবেলায় দেখেছেন বাবা বকশি মন্ডলকে বায়োস্কপ দেখিয়ে টাকা উপার্জন করতে। বাবার সাথে সাথে নিজেও ঘুরেছেন গ্রামের পথে, দেখিয়েছেন খেলা। তখনই এই বায়োস্কপের প্রতি একটা অন্যরকম টান জন্মেছে জলিল মিয়ার ভেতর। এই পেশায় উপার্জন কমে যাওয়ায় বড় হয়ে জলিলকে ধরতে হয় কৃষিকাজ। কিন্তু, বাপ-দাদার এই পেশা জলিল মিয়াকে টানে নেশার মতোই। জলিল মিয়ার মূল পেশা কৃষিকাজ। তবে, ১২ বছর ধরে শৌখিন কাজ হিসেবে তিনি বায়োস্কপ খেলা দেখান। শুধুমাত্র রাজধানী ও তার আশপাশের এলাকায় কোন লোকজ মেলার আয়োজনে ও পহেলা বৈশাখে রমনার বটতলায় তিনি হাজির হন তার বায়োস্কপের বাক্স ও খঞ্জনী নিয়ে।

বায়োস্কপ

বাচ্চা বা বৃদ্ধ সবার কাছেই বায়োস্কপের আবেদন সমান

একসময় গ্রামবাংলার সিনেমা হল বলা হতো বায়োস্কপকে। নানা রংয়ের কাপড় পড়ে, খঞ্জনী বাজিয়ে, বিভিন্ন রকম ধারা বর্ণনা দিয়ে গ্রামের পথে পথে ঘুরে বেড়াতেন বায়োস্কপওয়ালারা। তাদের ছন্দময় ধারা বর্ণনার সাথে সুন্দর সব ছবি দেখার আকর্ষণে ছুটে আসতো শিশুসহ নারী-পুরুষ। ছোট বাক্সে গোল গোল করে কেটে একটা ফাঁক তৈরি করা, তার মধ্যে চোখ লাগিয়ে দেখতে হয় বায়োস্কপ। একসাথে তিন কি চারজনের বেশি দেখা সম্ভব নয় বলে অপেক্ষা করতে হতো। সিনেমা হলের মতো এক শো, এরপর ফের তিন কি চারজন নিয়ে আবার শুরু আরেক শো।

প্রায় হারিয়ে যাওয়া এক ঐতিহ্যের নাম বায়োস্কপ। প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগে প্রথম আসলো চলচ্চিত্র, তৈরি হলো সিনেমা হল। এরপর সাদাকালো টিভি, ভিসিআর। ধীরে ধীরে রঙ্গিন টিভি, ডিবিডি আর এখন হালের স্মার্ট ফোন ও ইউটিউব। এসবের ভীড়ে কবেই হারিয়ে গেছে বায়োস্কপ। চাহিদা না থাকায় লোপ পেয়েছে পেশাও।

বায়োস্কপ নামের লোকজ এই ঐতিহ্যের সাথে পরিচিত নয় বর্তমান প্রজন্ম। অনেকে হয়তো বইয়ে পড়েছেন, কিন্তু বাস্তবে দেখেননি। বাংলার সংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে থাকা এই বায়োস্কপের ঠাই মেলেনি জাতীয় জাদুঘরে কিংবা সোনারগাঁয়ের লোকজ জাদুঘরে। তাই এর সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগও পাচ্ছে না বর্তমান প্রজন্ম।

জলিল মিয়ার শখের পেশার মাধ্যমে ঢাকায় অনেক তরুণ, শিশুরা দেখার সুযোগ পাচ্ছেন বায়োস্কপ। আর যারা বৃদ্ধ হয়ে গেছেন তারাও বায়োস্কপ দেখতে পেয়ে কিছুটা ঝালিয়ে নেন শৈশবের স্মৃতি। পাশাপাশি জলিল মিয়ার হয়ে যায় কিছু বাড়তি উপার্জন।
ঢাকার কোন মেলায় যদি শুনতে পান, ‘কি চমৎকার দেখা গেলো’…… বলে সুরে সুরে কেউ কোন বর্ণণা দিচ্ছেন তাহলে সুযোগ হাতছাড়া না করে দেখে নিন বায়োস্কপ।

Most Popular

To Top