টুকিটাকি

আসুন আজকে নাকের উপর নাক গলাই!

আসুন আজকে নাকের উপর নাক গলাই!- Neon Aloy

নাক মানে নাসিকা অঞ্চল ভেদে বিবিধ হয়ে থাকে। অধুনা আমার উত্তর পূর্বের সফরের সময়ে মঙ্গোলীয় নাসিকা অথবা আমাদের সমতলের বিভিন্ন জায়গার নাক এর নানান ফারাকের কারণ জানতে নাকাল হয়ে গুগল বাবার স্মরনাপন্ন হয়ে যা পেলাম তার ফসল হলো এই লেখা। পাঠক এবং পাঠিকাগণ (যদি দু একজন থেকেই থাকেন) এই অতীব অখাদ্য লেখার জন্য আগাম ক্ষমা চাইছি, পেটের দায়ে ঘুরে বেড়াতে হয় তাই এই লেখা পড়ে ‘নাক’ শিটকাবেন না অনুরোধ করে রাখলাম আগেই!

অনেকেই উন্নত নাসিকা অথবা গাত্রবর্ণের কারণে যে উঁচু নিচুর কথা ভাবেন তাদের একটু বাস্তবের জমিতে নিয়ে আসার জন্য এই লেখা। আমার এই গাত্রবর্ণের কারণে এবং এই প্রায় সমতল নাসিকা অনেক মানুষের হাসাহাসির কারন হয়েছে, আজ পেয়েছি কিছু বৈজ্ঞানিক যুক্তি। যাকে বলে “পাইসি এইবার!” গোছের তথ্যসূত্র। এইবার দেখি কোন ইয়ে আমার এই দেবতার মতো চেহারা নিয়ে হাসাহাসি করে! যাইহোক, লাইনে আসি, আজকের বিষয় হলো আমাদের নাক এই নানা ধরণের আকারের হয় কেন তার উপর বিজ্ঞান কি ব্যাখ্যা এনেছে তার বিবরণ।

বাজারের প্রচলিত ধারণা হলো উন্নত মানুষ মানে ওই আর্য বা আরব অথবা পাকিস্তানের দিকের মানুষ ইত্যাদির নাক রং ইত্যাদি দেখে একটা অনুভূতি কাজ করে, অনেক জায়গায় ওই কথা বলেছি। এইখানেও বললাম, একটা ফার্সি বয়ান আছে “পিদারাম সুলতান বুদ্ ” মানে আমার পিতাঠাকুর সুলতান আছিলেন! এই ধারণার বশবর্তী হয়ে আমাদের কেউ কেউ হয়ে যান আর্য বংশদ্ভুত কেউ বা আরব অথবা তুর্কি থেকে আসা মানুষের উত্তরপুরুষ। কারোর আবার নাক মুখ মঙ্গোলীয় ধাঁচের হলে ওটা হয়ে যায় মোঘল রক্তের গপ্প। আমরা ভুলে যাই, একটু জিন ইত্যাদি টানাটানি করলেই আমাদের বস্ত্র উন্মোচন হয়ে যাবে। যাইহোক, চিন্তা করবেন না, লেখালিখি করে ওটা হয় না। আজ তাই খালি নাক এর বিবর্তন বা কেন নানা ধাঁচের নাক হয়েছে ওটাতেই সীমাবদ্ধ রাখবো। আশা করি আমার মতো নাসিকা বা গাত্রবর্ণের সকল পাঠক এতে কিঞ্চিৎ আশার আলো দেখতে পাবেন।

আমাদের নাক কি করে?
আমাদের নাক আমাদের মুখ আর আমাদের বাহ্যিক রূপের একটা বড় অংশ ওটা কিন্তু বাস্তব। নাক একটি বিশেষ কাজ করে, আমরা যে বাতাস ভিতরে নিয়ে থাকি অর্থাত প্রশ্বাস নিই তাকে শরীরের প্রয়োজনে নির্দিস্ট তাপমাত্রায় আর আদ্রতা দান করে ফুসফুসে পৌছে দেয়। আরো আকর্ষনীয় হলো শরীরের প্রয়োজনীয় তাপমাত্রার জন্য যে বাতাস আমাদের দরকার হয় ওটা নাকের মাধ্যমে ৯০% আমরা করে ফেলি প্রশ্বাস নেওয়ার জন্য শরীরের বাতাস নালিকাতে ওটা প্রবেশ করার আগেই। এই গবেষণা আরো বলছে আমাদের এই নাক শীততাপনিয়ন্ত্রনের কাজ করে মূলত বায়ু প্রবাহ কে নিয়ন্ত্রন করে ভিতরে পাঠানোর মাধ্যমে। এই পাঠানোর কাজের জন্য তার ব্যবহার হয় নাকের জ্যামিতিক নকশার দ্বারা। কি বুঝলেন ? হ্যাঁ, এই নাকের আকার বা প্রকার মোটেই কোনো কংস রাজার বংশধরের কারণে হয় নি। হয়েছে প্রকৃতির বিভিন্ন রূপের সাথে আমাদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার সুবিধা এনে দেওয়ার আবহমান বিবর্তনের মাধ্যমে।

আমাদের পূর্বপুরুষ উষ্ণ অঞ্চলের, আদ্র অঞ্চলের বাসিন্দা হলে আমাদের নাক প্রসস্থ মানে প্রচিলত ধারনায় চেপ্টা হবে আবার যাদের পূর্বপুরুষ ঠান্ডা আর শুকনো অঞ্চলের হবে তাদের নাক উন্নত এবং কম প্রসস্থ মানে সোজা কথায় টিকলো নাকের মানুষ হবে। এই কথাগুলো তাত্ত্বিক ভাবে আগেই অনেকে বলেছেন তবে তার প্রামান্য কাজ এই প্রথম হয়েছে। অর্থাৎ জীবিত মানুষের উপর আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে এই তথ্যকে বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রমান করার কাজ করেছেন পেনসিলভানিয়ার দুই গবেষক আরসালান জাইদি এবং মার্ক শ্রিভার। তাদের বৈজ্ঞানিক নিবন্ধন এর প্রকাশ হয়েছে ২০১৭ তে এবং তা সার্বিক স্বীকৃতি ও পেয়েছে বিজ্ঞানের কাছে। তারা গবেষনা করেছেন পশ্চিম আফ্রিকা, দক্ষিন এশিয়া, পূর্ব এশিয়া এবং উত্তর ইউরোপের প্রাচীন মানুষের দেহাবশেষ এবং বর্তমান অবস্থান নিয়ে। এর থেকে তারা সিদ্ধান্তে এসেছেন যে আকস্মিক ভাবে এই নাকের নানান ধাঁচ পৃথিবীতে আসে নি। তারা বলছেন এই নাক নানান আকৃতির হওয়ার প্রধান কারন প্রাকৃতিক বৈচিত্র। আরো সোজাসুজি বললে এর মুখ্য কারন প্রাকৃতিক অবস্থা বা আবহওয়া। এ ছাড়া মানুষের নিজের বৈবাহিক সম্পর্ক বেছে নেওয়ার রীতির কারণে নাক একটি বিশেষ আকৃতিতে থেকে যাওয়ার কারন হয়েছে। গবেষণায় আরো জানা যাছে যে আমাদের রোগ প্রতিরোধ বা আরো সোজা কথায় কিছু বিশেষ রক্তাল্পতা, দুধ অথবা দুধ থেকে তৈরী খাবার এর উপর হওয়া এলার্জির ক্ষেত্রে অথবা ধরুন চামড়ার ক্যান্সারের মতো সমস্যার আঞ্চলিক কিছু মিল পাওয়া যায়। গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, আমাদের এই নাকের উপর আরো গবেষণা দরকার যাতে আমরা জানতে পারি পূর্বপুরুষের বসবাসের অঞ্চল থেকে অন্য পরিবেশে গিয়ে থাকলে আমাদের প্রশ্বাসজনিত কোনো রোগ হওয়ার সম্ভাবনা কতটা থাকবে।
উপরে উল্লিখিত দুই গবেষকের এই কাজ আরো বলছে আমাদের এই নাকের নানান ধাঁচে যাওয়ার জন্য পরিবেশ জনিত যে বৈচিত্রের সাথে মানুষ নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়েছে ওটা হাজার হাজার বছরের বিবর্তনে জিনগত একটি বৈশিষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূলত তারা ব্যবহার করেছেন জিন এবং আঞ্চলিক তাপমাত্রার বিশ্লেষণ কে।
এর উপর আরো জানতে এই সুত্রে খোঁচা দিন।

এই কাজের জন্য তারা জিন ম্যাপিং বা বিশাল অঞ্চল জুড়ে হাজার হাজার মানুষের উপর নির্দিষ্ট তথ্যভান্ডার নিয়ে কাজ করেছেন যা আপনি ঐ উপরের বা নিচের সূত্রে পেয়ে যাবেন। এছাড়া তারা নির্ভর করেছেন ত্রিমাত্রিক ক্যামেরার উপর। এর মাধ্যমেই তারা দেখতে পেয়েছেন মানুষের এই লক্ষ লক্ষ বছরের নাকের নানান আকৃতির ভেদাভেদ হয়েছে মূলত নাকের বাইরের স্ফীতির উপর এ ছাড়া হয়েছে ওই প্রশ্বাস নেওয়ার পথের উপর। অর্থাৎ, উঁচু নিচু বা থ্যাবরা অথবা টিকলো নাক এর সৃষ্টি হয়েছে সেই উপরের কারণেই আর ওটা বজায় থেকেছে মানে এর ধাঁচ থেকে গিয়েছে প্রায় একই যেহেতু মানুষ তার বৈবাহিক সম্পর্ক অর্থাৎ প্রজন্মের থেকে প্রজন্মের বহমানতা বজায় রেখেছে নিজের গোষ্ঠির মানুষের সাথে সম্পর্ক রেখে। এর সাথে আরো একটু বেশি কিছু বলতে গেলে বলতে হয়, মানে এই গবেষনার সূত্র ধরেই বলতে হয় সাদা চামড়ার কোনো মানুষের ত্বকের ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। ধরুন, এই গরম বা অতিবেগুনি রশ্মির প্রকোপ তাদের উপর অনেক বেশি হয় যা এই দক্ষিন এশিয়া বা আফ্রিকার প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অভিযোজিত হয়ে যাওয়া মানুষের হয় না ।

ওহ! বলতে ভুলে গিয়েছি, এই দুই গবেষক তাদের কাজের ক্ষেত্রে নারী পুরুষের নাকের আকৃতি নিয়েও কাজ করেছেন। পুরুষের নাকের আকৃতি মানে তার দৈর্ঘ্য বা প্রস্থ মেয়েদের থেকে একটু বেশি তার কারণ আবার কোনো কাদা মাটি আর পাজরের কাহিনী ভাববেন না যেন। এর কারণ আমাদের উচ্চতা এবং শারীরিক আকৃতির ফারাকের কারণে। এক্ষেত্রে এই কারণে আনুপাতিক ভাবে নাকের আকৃতি হয়েছে আর কিছুই না।

ফুটনোটঃ যদিও আরব অঞ্চল উষ্ণ বলেই আমরা জানি তবে মনে রাখবেন, ঐ অঞ্চল এক চরম আবহওয়ার অবস্থান আছে মানে মরু অঞ্চল হলেই রাতে অত্যন্ত ঠান্ডা আর দিনে প্রচুর গরম হয়। তবে হ্যাঁ, এই তবেটি হলো অন্য এক গপ্পো। ঐ আরব ভূমি ছিল একটি আদ্র এবং বনাঞ্চলে ভরা জমি, আজ থেকে হাজার বিশেক বছর আগে অন্তত তাই ছিল। এর উপর অন্য কোনদিন বলবো। মনে রাখবেন আজকের মানুষ যে আকৃতি বা প্রকৃতি ধারণ করেছে তার ফলাফল এসেছে বহু হাজার (বলতে পারেন লক্ষ বছরের ক্রমান্বয়ে হয়ে যাওয়া বিবর্তন এর কারণে,ওই হাজার বিশেক বছর তার কাছে নস্যি!)

পুনশ্চঃ
বিজ্ঞানের ভাষার বাইরে বললে মানে গাত্রবর্ণ নিয়ে মানুষের হ্যাংলামি দেখলে বলতে হয় :

কালো যদি মন্দ তবে কেশ পাকিলে কান্দো ক্যানে?

তথ্যসূত্রঃ

Most Popular

To Top