ইতিহাস

ভিক্টর ট্রাম্পারঃ ক্রিকেটের স্বর্ণযুগের সবচেয়ে স্টাইলিশ ব্যাটসম্যান

ভিক্টর ট্রাম্পারঃ ক্রিকেটের স্বর্ণযুগের সবচেয়ে স্টাইলিশ ব্যাটসম্যান

ক্রিকেটের স্বর্ণযুগের সবচেয়ে স্টাইলিশ এবং বহুমাত্রিক ব্যাটসম্যান ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টর ট্রাম্পার। বেশি দিন বাঁচেন নি তিনি। মাত্র আটত্রিশ বছর বয়সে মারা গিয়েছিলেন এই ক্রিকেটারটি।

অসাধারণ প্রতিভাবান এই ব্যাটসম্যানকে অনেকেই স্যার ডন ব্রাডম্যানের চেয়েও মেধাবী ক্রিকেটার হিসাবে গণ্য করে থাকেন। প্রচলিত সব শটের পাশাপাশি বিচিত্র সব অপ্রচলিত শট ছিল তাঁর হাতে। এগুলো তিনি ছাড়া আর কেউ খেলতে পারতেন না। এর বাইরে বাজে কন্ডিশন বা বাজে পিচে, যেখানে অন্যেরা খেলতে হিমশিম খেতো, সেখানে আশ্চর্যজনকভাবে ভালো খেলার সক্ষমতা ছিল তাঁর।

১৮৭৭ সালে সিডনিতে জন্ম তাঁর। টেস্ট ক্রিকেটে ডেব্যু হয় ১৮৯৯ সালে। এই বছরের অস্ট্রেলিয়ান টিমকে এখন পর্যন্ত সর্বকালের অন্যতম সেরা টিমের মর্যাদা দেওয়া হয়। সামারে এই দলের ইংল্যান্ডে যাবার কথা। প্রচণ্ড শক্তিশালী একটা অস্ট্রেলিয়ান টিম আসছে ইংল্যান্ডের মাটিতে, এই খবর পৌঁছে যায় সেখানে। ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথমবারের মত পাঁচ টেস্টের টেস্ট সিরিজ হবে। শক্তিশালী একটা টিম গঠন করার জন্য ইংল্যান্ডে তিন সদস্যের এক সিলেকশন কমিটি গঠন করা হয়। টিম গঠন করার জন্য সিলেকশন কমিটি তৈ্রির ঘটনা ক্রিকেট ইতিহাসে এটাই প্রথম।

ভিক্টর ট্রাম্পারঃ ক্রিকেটের স্বর্ণযুগের সবচেয়ে স্টাইলিশ ব্যাটসম্যান

সিলেকশন কমিটির তিন সদস্য হচ্ছেন লর্ড হক, ডাব্লিউ জি গ্রেস এবং এইচ ডাব্লিউ ব্রেইনব্রিজ। মজা হচ্ছে যে, এরা কেউ-ই সাবেক খেলোয়াড় নয়, যেটা এখনকার রেওয়াজ। সিলেকশন কমিটি মানেই সব সাবেক খেলোয়াড়রা সেখানে সদস্য হিসাবে থাকেন। এরা তিনজনই ইংল্যান্ডের সেই টিমের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ছিলেন। এর মধ্যে ডাব্লিউ জি গ্রেস হচ্ছেন বয়োজেষ্ঠ্য। তাঁর বয়স তখন একান্ন বছর। ওই বয়সেও খুব ভালো ব্যাট করেন তিনি। সমস্যা হতো শুধু ফিল্ডিং এর সময়। বড়সড় একটা ভুড়ি থাকায় কোমর বাঁকা করে ঝুঁকে বল তুলতে পারতেন না তিনি। বল প্রায়শই তাঁকে ফাঁকি দিয়ে চলে যেতো বাউন্ডারি সীমানা পেরিয়ে। দর্শকরা দুয়ো দিতো, হাসাহাসি করতো তাঁর এই হাস্যকর অঙ্গভঙ্গি দেখে।

ইংল্যান্ডের সেই গ্রীষ্মকাল ছিল বৃষ্টিময়। ভেজা কন্ডিশনে খেলতে গিয়ে দুই দলেরই প্রায় সবাই-ই স্ট্রাগল করেছে সেই টেস্টে। একমাত্র ব্যতিক্রম হচ্ছেন ভিক্টর ট্রাম্পার। অবশ্য প্রথম টেস্টে তিনি সফল ছিলেন না। প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে শূন্য করেন তিনি। দ্বিতীয় ইনিংসে করেন এগারো রান। দ্বিতীয় টেস্ট থেকে দুরন্তভাবে ঘুরে দাঁড়ান এই তরুণ। লর্ডসে ১৩৫ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি।

এর দিন কয়েক পরেই অস্ট্রেলিয়ান ড্রেসিং রুমে এসে হাজির ডাব্লিউ জি গ্রেস। বিশাল দাঁড়ির ফাঁক দিয়ে হুংকার ছেড়ে বললেন যে, ভিক্টর ট্রাম্পার যে ব্যাট দিয়ে সেঞ্চুরি করেছে, সেটা তাঁকে দিতে হবে। শুধু যে দিতে হবে তাই নয়, অটোগ্রাফ সহকারে দিতে হবে।

গ্রেস ছিলেন মহা উদ্ধত এবং আত্মকেন্দ্রিক একজন ক্রিকেটার। নিজের ছাড়া অন্যের খেলার প্রশংসা করার ধাত তাঁর ছিল না। তাঁর মতো বর্ণাঢ্য চরিত্র ক্রিকেটে নেই। তাঁর কারণে ক্রিকেটের আইন সবচেয়ে বেশিবার পরিবর্তিত হয়েছে। আম্পায়াররা আউট দিলেও মাঝে মাঝে তিনি আউট হতে অস্বীকার করতেন। আঙুল তুলে আম্পায়ারদেরই আউট ঘোষণা করে দিতেন তিনি। সেই সময়কার ক্রিকেট আইনের অস্পষ্টতার সুযোগ তিনি নিতেন পূর্ণ মাত্রায়।

একবার ব্যাটিং করতে নেমে প্রথম বলেই আউট হয়ে গেছেন তিনি। কিন্তু ক্রিজ ছেড়ে যাচ্ছেন না। আম্পায়ার শেষে কাছে এসে বলছে যে, ‘আপনি আউট হয়ে গেছেন মিস্টার গ্রেস। দয়া করে ক্রিজ ছেড়ে চলে যান।’

এ কথা শুনেই খেপে গেছেন তিনি। বলেন যে, ‘প্রথম বলে আউট আবার আউট কীসের? এটা ট্রায়াল বল। দর্শকরা আমার খেলা দেখতে এসেছে এখানে, আপনার আঙুল উঁচানির খেলা দেখতে না। আউট না হয়ে, ক্রিজে থেকে নির্বিকারভাবে খেলা চালিয়ে গেলেন তিনি। এরকম ঘটনা একবার নয়, বেশ কয়েকবারই করেছেন তিনি। তাঁর এই কাণ্ডের কারণে ক্রিকেটে ট্রায়াল বল নামে একটা আইন চালু হয়েছিল। ব্যাটসম্যানের প্রথম বলকে কাউন্ট করা হতো না। অর্থাৎ প্রথম বলে আউট হলেও ব্যাটসম্যান খেলে যেতে পারবেন।

আরেকবার ঘটেছিল অন্য কাণ্ড। ঢিলে ঢালা পোশাক পরে ব্যাটিং করতে নামতেন তিনি। একবার সারের হয়ে খেলতে নেমেছেন তিনি। প্রতিপক্ষ গ্লস্টারশায়ার। ব্যাটের কাণায় লেগে বল চলে গেছে তাঁর জামার ভিতরে। ওই অবস্থায় দৌড়ে রান নেওয়া শুরু করেছেন তিনি। গ্লস্টারশায়ারের ফিল্ডারদের বল কোথায় বুঝতে বুঝতেই তিনি সাত রান নিয়ে ফেলেছেন দৌড় দিয়ে। শেষে বিপক্ষ দলের ফিল্ডাররা তাঁকে ধরে তাঁর জামার ভিতর থেকে জোর করে বল উদ্ধার করার পরই রান নেওয়া থামে তাঁর। এই ঘটনার পরে ডেড বল আইন আসে ক্রিকেটে। ব্যাটসম্যানের ব্যাটে লেগে তাঁর পোশাকের মধ্যে বল ঢুকে গেলে বল ডেড হয়ে যাবে, কোনো রান নেওয়া যাবে না তখন।

এখানেই শেষ নয়।অন্য কীর্তিও করেছেন তিনি। এর জন্যও ক্রিকেটের আইন পরিবর্তন করতে হয়েছিল। ফিল্ডিং করছিল তাঁর দল। দিনের শেষ বল এসে লাগে ব্যাটসম্যানের পায়ে। কিন্তু তিনি বা তাঁর দলের কেউ-ই লেগ বিফোরের আবেদন জানান না। ফলে, আম্পায়ারও ব্যাটসম্যানকে আউট দেন না। খেলা চলে যায় পরের দিন সকালে।

সকালে খেলা মাত্র শুর হতে যাচ্ছে। বোলার রান আপে দাঁড়িয়ে দৌড় শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমন সময় গ্রেস সাহেব দুই হাত উঁচু করে চেচিয়ে উঠলেন, ‘হাউ’জ দ্যাট?’

আম্পায়ার হেসে বললেন যে, ‘আপনার বোলার বলই করলো না, আর আপনি আগেই আবেদন করে বসে আছেন। বিষয়টা কী মিস্টার গ্রেস? রাতে পানশালায় গিয়ে বেশি পান-টান করেন নাই তো?’

মধুর হাসি দিয়ে গ্রেস সাহেব বলেন যে, ‘আজকের জন্য আবেদন করি নাই তো। কাল শেষ বলে ব্যাটসম্যান আউট ছিল, সেটার জন্য এখন আবেদন করছি।’

বেচারা আম্পায়ার আর কী করবেন? আউট দিতে বাধ্য হলেন ব্যাটসম্যানকে। কারণ, সত্যি সত্যিই ব্যাটসম্যান আউট ছিল ওই বলে।

তবে, এটাই শেষ। আবেদন বাসি হলে আম্পায়ার আউট দেবেন না এই আইন চালু হয়ে গেলো ক্রিকেটে এর পর থেকেই।

তো, এই গ্রেট গ্রেস সাহেবে নিজে যেচে এসে ভিক্টর ট্রাম্পারের কাছ থেকে তাঁর ব্যাট চেয়ে নিচ্ছেন, সেখানে অটোগ্রাফ নিচ্ছেন। সহজ বিষয় নয়। এখানেই শেষ নয়। ভিক্টরের কাছ থেকে ব্যাট পাবার পরই নিজের একটা ব্যাটও ভিক্টরকে দিলেন তিনি প্রীতি উপহার হিসাবে। সেখানে লিখে দিলেন, ‘ফ্রম টুডে’জ চ্যাম্পিয়ন টু দ্যা টুমরো’জ চ্যাম্পিয়ন।’

সেই যুগে ক্রিকেট খেলে কামাই রোজগার তেমন করা যেতো না। ক্রিকেটের পাশাপাশি অন্য কাজও করতে হতো প্রায় সব ক্রিকেটারকেই। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ডাব্লিউ জি গ্রেস পেশায় চিকিৎসক ছিলেন। ভবিষ্যত চ্যাম্পিয়ন ভিক্টর ট্রাম্পারও আয় রোজগারের জন্য খেলাধূলার সরঞ্জাম বিক্রির একটা দোকান খুলে বসেন সিডনিতে। ব্যবসাতেই মন বেশি তাঁর তখন, খেলার দিকে কম।

এরকম একদিন দোকান খুলে বসে আছেন তিনি। হুট করেই মনে পড়লো যে, আজ না টেস্ট খেলা আছে। দোকান থেকে একটা ব্যাট হাতে নিয়ে ট্যাক্সি ভাড়া করে চলে গেলেন সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে। অপরাজিত একশো পচাশি রান করে ফিরে এলেন তিনি।

টেস্ট ম্যাচ শেষ হবার পর একদিন দোকানে বসে আছেন তিনি। এমন সময় তাঁর এক ভক্ত এসে হাজির দোকানে। তাঁর ব্যবহৃত একটা ব্যাট কেনার ইচ্ছা তার, এটাই জানালো সে।

‘যে ব্যাট দিয়ে সিডনি টেস্টে একশো পচাশি রান করলাম, সেটা নেবেন? ভিক্টর ট্রাম্পার জিজ্ঞেস করলেন।

চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল ভক্তের। লোভ জাগছে, কিন্তু এর যে দাম হবে, তা নিজের সামর্থে কুলাবে না বলে হতাশার এক বিশাল ছায়াও পড়লো তার চোখে।

‘কতো দাম পড়বে ওর?’ আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলো ভক্ত।

‘সেটার আসল দাম তো দুই পাউন্ড পাঁচ শিলিং।’ ভিক্টর ট্রাম্পার বললেন।

‘হ্যাঁ, এখন কতো নেবেন?’ শুষ্ক গলায় ভক্ত বলে।

‘এর যেহেতু একবার ব্যবহার করা হয়ে গেছে। এবং আমি অনেকক্ষণই ব্যাট করেছি এটা দিয়ে। সেকেন্ড হ্যাণ্ড জিনিস। কতো আর দেবেন বলেন? দিন, এক পাউন্ডই দিন এর জন্য।’ লাজুক গলায় ভিক্টর বলেন।

Most Popular

To Top