ইতিহাস

বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার রূপকার আসলে কে?

বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার রূপকার আসলে কে?- Neon Aloy

২ মার্চ, তারিখটি আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। ১৯৭১ সালের এই দিনেই উত্তোলন করা হয় আমাদের প্রথম পতাকা। ২ মার্চ ঐতিহাসিক পতাকা উত্তোলন দিবস। ২ মার্চ সকালে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রামী ছাত্র সমাজের উদ্যোগে কলাভবনের সামনে ছাত্র-জনতার বিশাল সমাবেশে তৎকালীন ডাকসু ভিপি আ স ম আব্দুর রবসহ কয়েকজন ডাকসু নেতা উত্তোলন করেন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা।

সবুজ জমিন, লাল বৃত্ত এর মাঝে মানচিত্র- বাংলার প্রথম পতাকার ডিজাইন এটি। কিভাবে হলো এই ডিজাইন, কে করলেন, আমাদের প্রথম পতাকার জন্মের পেছনের ইতিহাসটাই বা কি? অনেকেই হয়তো জানেন, আবার কেউ কেউ ভুল জানেন প্রথম পতাকার জন্ম ইতিহাস।

ভুলটাই প্রথমে বলি, অনেকে জানেন এই পতাকার রূপকার শিব নারায়ণ দাস। এই তথ্যটি ভুল। শিব নারায়ণ দাস পতাকার নির্মাণের একটি অংশের সাথে যুক্ত ছিলেন, কিন্তু তিনিই এই পতাকার রূপকার নন। এই ভুল তথ্যটি প্রথম আসে ২০১৩ সালে ৯ম- ১০ম শ্রেণীর মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য এনসিটিবি প্রকাশিত পাঠ্যবই বাংলাদেশ ও বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসে। এ বইয়ের ১৭৪-১৭৫ পৃষ্ঠায় লেখা হয়, মানচিত্র খচিত বাংলার প্রথম পতাকার রূপকার শিবনারায়ণ দাস। সেখান থেকেই শুরু শিব নারায়ণ দাসকে নিয়ে প্রথম পতাকার রূপকার বিতর্ক।

এরপর থেকে অনেক সংবাদ মাধ্যমও লিখতে শুরু করে এ ভুল তথ্যটি। প্রথম পতাকার রূপকার হিসেবে উইকিপিডিয়ায় যুক্ত করা হয় শিব নারায়ণ দাসের নাম। আফসোস হলো এই যে, এই পতাকার উত্তোলনকারী আ স ম আব্দুর রব এখনো জীবিত আছেন, এমনকি বেঁচে আছেন শিব নারায়ণ দাসও। কিন্তু কেউ কেনো, বিশেষ করে কোন সংবাদ মাধ্যম কেনো তাদের কোন মন্তব্য নিয়ে বিতর্কটা পরিষ্কার করেননি! ইতিহাসের সত্য উদঘাটন এবং উপস্থাপনের দায়িত্ব কি কারো নেই? আর পাঠ্য বইয়ে ইতিহাস বিকৃত করা তো আমাদের দেশে নতুন নয়…। এটাই আমাদের বড় লজ্জা।

এবার আসি, প্রথম পতাকা বা এই লাল সবুজ পতাকা আমরা কিভাবে পেলাম সেই কথায়।

১৯৭১ সালের ২ মার্চ পতাকা উত্তোলনের বেশ কিছুদিন আগেই মানচিত্র খচিত লাল সবুজ পতাকা তৈরি হয়েছিলো। ১৯৭০ সালের ৭ জুন সিদ্ধান্ত হয়, শ্রমিক জোটের পক্ষ থেকে পল্টন ময়দানে বঙ্গবন্ধুকে অভিবাদন জানানো হবে। এ আয়োজনে বঙ্গবন্ধুকে গার্ড অব অনার প্রদান করার সিদ্ধান্ত নেয় জয় বাংলা বাহিনী। তারা বঙ্গবন্ধুর হাতে পূর্ব পাকিস্তানের একটি আলাদা পতাকা তুলে দেয়ার পরিকল্পনা করে। এই পরিকল্পনা অনুসারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের ১১৬নং কক্ষে আ স ম আবদুর রব, সিরাজুল আলম খান, মনিরুল ইসলাম, শাজাহান সিরাজ ও প্রয়াত রাজনীতিক কাজী আরেফ আহমেদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, চিরসবুজের প্রতীক সবুজ রঙ হবে পতাকার জমিন, এর মাঝে স্বাধীনতার চেতনা প্রকাশে লাল সূর্য এবং এর মাঝে বাংলার সোনালী পাটের প্রতীক হিসেবে সেখানে মানচিত্র আঁকা থাকবে। এই সিদ্ধান্তের পর এক দর্জিকে দিয়ে সবুজ কাপড়ের মাঝখানে গোল করে লাগানো হয় লাল কাপড়। কিন্তু দর্জি পূর্ব পাকিস্তানের পতাকার মতো করে কাপড় কেটে লাগাতে পারছিলো না। তখন শিব নারায়ণের ডাক পড়ে। তিনি ছিলেন কুমিল্লা ছাত্রলীগের সভাপতি। ভালো আঁকতে পারতেন। তাকে বলা হয় তৈরিকৃত লাল সবুজ পতাকার মাঝখানে সোনালী রঙ দিয়ে মানচিত্রটি এঁকে দিত। এরপর হাসানুল হক ইনু ও ইউসুফ সালাহউদ্দিন আহমেদ বুয়েট থেকে একটি ট্রেসিং পেপারে মানচিত্র ট্রেস করে আনেন। শিবনারায়ণ দাস এই ট্রেসিং পেপার থেকে কাপড়ে মানচিত্র এঁকে দিয়েছিলেন। এই হলো প্রথম পতাকা তৈরির পেছনের গল্প।

পাঠক, আপনারা জানতে চাইতে পারেন, আমার এ লেখার সত্যতা কি? প্রথম পতাকার রূপকার নিয়ে বিতর্ক বা ভুল তথ্য পরিষ্কার করতে আমরা কয়েকটি বইয়ের উদ্ধৃতি দিচ্ছি, যে বই গুলো পতাকা তৈরি ও ২ মার্চ স্বাধীন দেশের প্রথম পতাকা উত্তোলনের সাথে জড়িত ঐতিহাসিক ব্যক্তিরাই লিখেছেন।

মনিরুল ইসলাম রচিত বই ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও সমাজতন্ত্র’, মহিউদ্দিন আহামদের ‘জাসদের উত্থান পতনঃ অস্থির সময়ের রাজনীতি’ এবং কাজী আরেফ আহমেদের রচনায় ‘বাঙালির জাতীয় রাষ্ট্র’ বইটিতে প্রথম পতাকার তৈরির ঘটনা স্পষ্টভাবে লিখা আছে। যা আমরা আমাদের এই লিখায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

১৯৭০ সালের ৭ জুন বঙ্গবন্ধুর হাতে পতাকা তুলে দেন আ স ম আব্দুর রব এবং ১৯৭১ সালে ২ মার্চ প্রথম পতাকা উত্তোলনের সাথেও ছিলেন তিনি। পুরো বিষয়টি আরো সুনিশ্চিত হতে “নিয়ন আলোয়” -এর পক্ষ থেকে তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনিও পুরো ঘটনাটি তুলে ধরে বলেন, ‘শিব নারায়ণ শুধু মানচিত্রটি তুলি দিয়ে রঙ করে দিয়েছিলো সেদিন। আর এর পরিকল্পনায় আমিসহ সিরাজুল আলম খান, মনিরুল ইসলাম, শাজাহান সিরাজ ও প্রয়াত রাজনীতিক কাজী আরেফ আহমেদ যুক্ত ছিলেন’।
আ স ম আব্দুর রব আরো বলেন, ‘এককভাবে যদি কাউকে রূপকার বলতে হয় তাহলে অবশ্যই সেই কৃতিত্ব সিরাজুল ইসলাম খানকে দিতে হবে’।

‘প্রথম পতাকায় শিব নারায়ণের একটা অবদান অবশ্যই ছিলো কিন্তু সে পতাকার রূপকার কোনভাবেই ছিল না। এ কথা যদি কেউ বলে থাকে তা হবে ইতিহাস বিকৃতি’, বলেন আ স ম আব্দুর রব। তিনি আরো বলেন, ‘শিব নারায়ণ এখনো বেঁচে আছে, এবং আমার দল (জাসদ রব) করে, সে তো কখনো এই দাবি করেনি যে প্রথম পতাকার রূপকার সে। তাহলে এই কথা কিভাবে কেউ বলতে পারে’। এ বিষয়ে শিবনারায়ণ দাসের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি বর্তমানে শারীরিক ভাবে অসুস্থ বলে জানানো হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সাথে জড়িত অনেক ইতিহাস নিয়ে নানা সময়ে পাঠ্যবইয়ে একেক রকম তথ্য সংযুক্ত করা হয়েছে। আমাদের ভূখন্ডের স্বাধীনতার প্রতিটি ঘটনা নিয়ে কোন দলাদলি না করে তা সত্যনিষ্ঠ ভাবে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা উচিত। কেননা দল, রাজনীতি ছাপিয়ে স্বাধীনতা আমাদের সবার। বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ, পতাকা লাখো শহীদের প্রাণের বিনিময়ে পেয়েছি আমরা। তাই গর্বের এ বিষয়গুলো নিয়ে ইতিহাস চর্চাও সঠিকভাবে।

Most Popular

To Top