টুকিটাকি

ফেসবুকের ‘ফুডব্যাংক’ কি আসল ‘ফুডব্যাংক’?

ফেসবুকের 'ফুডব্যাংক' কি আসল 'ফুডব্যাংক'?

আমাদের মৌলিক চাহিদার মধ্যে সবার প্রথম চাহিদা হল খাদ্য।দেহের গঠন এবং শক্তি অর্জনের জন্য খাবার অত্যাবশক। কিন্তু প্রতিদিন কি সবাই খাবার খাওয়ার সু্যোগ পায়?

আমাদের বর্তমান পৃথিবীর জনসংখ্যা ৭.৬ বিলিয়ন। এর মধ্যে ৭৯৫ মিলিয়ন মানুষের কাছে খাওয়ার জন্য খাবার নেই যা মূল জনসংখ্যার প্রায় ১/৯ শতাংশ। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার ফলে আমরা এখন প্রায় সবাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রয়েছি। প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং আমাদের ব্যস্ত জীবনের ফলে আমাদের হ্যাং আউটের আয়োজন করা হয় যেখানে বন্ধুরা একসাথে হয়ে কোথাও খেতে যায় ও গল্প করে। এসকল হ্যাং আউটের জন্য রেস্টুরেন্ট খোজার উদ্দেশ্যে অনেকেই ফেসবুক গ্রুপ ফুডব্যাংকে ঢুঁ মেরে থাকি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যারা নিয়মিত তাদের অনেকেই ফুডব্যাংক নামটির সাথে পরিচিত। ফুডব্যাংক বলতে মূলত খাবারের ব্যাংক বোঝায় কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের গ্রুপটি কিন্তু মোটেও তা নয়। বরং এখানে বিভিন্ন খাবারের রিভিউ দেওয়া হয়। ভোজনরসিকরা নিয়মিত এখানে ঢাকার বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট ও তাদের খাবারের ব্যাপারে নিজেদের মতামত প্রকাশ করে এবং অন্যকেও উৎসাহিত করে। এই ফুডব্যাংক নিয়ে কত কিছু হল আরো কত কাহিনী হল!

কিন্তু আমারদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই ফুডব্যাংক ছাড়াও কিন্তু সত্যিকারের এক ফুডব্যাংক রয়েছে। আক্ষরিক অর্থেই তা খাবারের ব্যাংক। কিন্তু এই ফুডব্যাংকের জন্ম আজকাল নয়। বরং ১৯৬৭ সালে আমেরিকায় প্রথম এর জন্ম। ফুডব্যাংক একটি নন প্রফিটেবল চ্যারিটি অর্গানাইজেশন যারা ক্ষুধার্তদের মাঝে খাদ্য বিতরন করে থাকে। সারা পৃথিবীতেই এর শাখা রয়েছে। পুরো পৃথিবীতে ২৫ টি দেশে এই ফুডব্যাংক চালু রয়েছে। এছাড়াও অন্যান্য আরো দেশেও ফুডব্যাংক থাকলেও নানা কারণে তা অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি।

২০০৭ সালের অর্থনৈ্তিক অবনতির ফলেই এর কার্যক্রম আরো বেশি প্রসার লাভ করেছে। ফুডব্যাংকের জনক ‘জন ভেন হেনগেল’ এর উদ্যোগেই প্রথম ফুডব্যাংক চালু হয়। তার মাথায় প্রথম এই চিন্তা আসে যখন চিনি লক্ষ্য করেন যে গ্রোসারি শপের অনেক খাবার প্রায়ই ফেলে দিতে হয় খারাপ প্যাকিং এর কারণে কিংবা এক্সপায়ারিং ডেট কাছে চলে আসার কারণে। তিনি সেগুলো কালেক্ট করা শুরু করেন এবং ক্ষুধার্তদের মাঝে বিতরন করা শুরু করেন। আস্তে আস্তে তা বিশাল আকার ধারন করে। এর দেখাদেখি আরো অনেক জায়গায় এই ফুডব্যাংকের প্রচলন শুরু হয় এবং একবিংশ শতাব্দির শুরুর দিকে প্রায় দুইশতাধিক ফুডব্যাংক প্রায় ৯০ হাজারেরও বেশি মানুষকে খাবার দান করার নজির রয়েছে।

ফুডব্যাংকে মূলত দুই ভাবে খাবার দেওয়া হয়।সরাসরি ক্ষুধার্তদের মাঝে খাবার দান করা নতুবা চার্চ অথবা বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দান করা। বড় বড় ফুডব্যাংক গুলো দাতব্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই খাবার দান করে থাকে অন্য দিকে ছোট ছোট প্রতিষ্ঠান গুলো নিজেরাই খাবার দান করে। ফুডব্যাংকে বড় বড় খাবারের প্রতিষ্ঠান গুলো খাবার দান করে থাকে। এছাড়াও চাষীরা তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার গুলোও দান করে দেয়। এসকল ছাড়াও নানারকম দাতব্য প্রতিষ্ঠান ও তাদের চ্যারিটি সমূহ ফুডব্যাংকে দান করে দেয়।

দাতব্য প্রতিষ্ঠান ছাড়াও অনেক সময় সরকার ও ফুডব্যাংক পরিচালনা করত।আমেরিকার পাশাপাশি ইংল্যান্ডেও এর প্রচলন ছিল। তবে ২০০৭ এর অর্থনৈতিক অবনতির পরে এর প্রচলন বেড়ে যায়। ২০০৭ সালে অবস্থার অবনতির ফলে খাবারের দাম বেড়ে যায় এবং অনেক ফুডব্যাংক গড়ে ওঠে।হিসাব করে দেখা গেছে যে ২০০৭ সালের পর থেকে স্পেনে প্রায় ১.৭ মিলিয়ন মানুষ ফুডব্যাংকের উপর নির্ভরশীল ছিল। ইংল্যান্ডের পাশাপাশি ইউরোপেরও প্রায় বিশাল পরিমান একটি জনসংখ্যা ফুডব্যাংকের উপর নির্ভরশীল। ইংল্যান্ডেও এই ফুডব্যাংকের শাখা রয়েছে। প্রায় ১০০০ কিংবা তার চেয়েও বেশি ফুডব্যাংক রয়েছে খোদ রানি এলিজাবেথের দেশ ইংল্যান্ডে। ফ্রান্সে রয়েছে তার চেয়ে দ্বিগুন পরিমান ফুডব্যাংক।

এটা তো গেল পাশ্চাত্যদেশের কথা। এশিয়াতেও বেশ কিছু ফুডব্যাংক রয়েছে। যদিও এশিয়াতেও ফুডব্যাংক এত প্রচলিত নয় তাও ইন্ডিয়া, সিংগাপুর, হংকং, জাপান, তাইওয়ান ও সাউথ কোরিয়াতে ফুডব্যাংক প্রচলিত রয়েছে। পৃথিবীর অনেক জায়গায় ফুডব্যাংক আছে এবং নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু তাও সমস্যা থেকে যাচ্ছে। ফুডব্যাংকের খাবারের চাহিদা মেটালেও পুষ্টির চাহিদা যথাযথ ভাবে মেটাতে পারছে না। পুরো জনসংখ্যার ১২.৯% পুষ্টিহীনতায় ভুগে। ফুডব্যাংকের মাধ্যমে ক্ষুধার্তের পেটের খিদা মেটাতে পারলেও প্রয়োজনীয় পুষ্টির চাহিদা মেটাতে সক্ষম হচ্ছে না। ফলে একটি বিশাল পরিমান জনসংখ্যা পুষ্টিহীনতায় ভুগছে যা কিনা পরবর্তীতে আমাদের জন্য ভীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি করবে।

পুরো দুনিয়া ছেড়ে এখন আমরা বাংলাদেশের দিকে আসি। বাংলাদেশে ফুডব্যাংকের কোন শাখা কিংবা কার্যক্রম নেই। কিন্তু তাই বলে কি বাংলাদেশের মানুষ না খেয়ে আছে? মোটেও নয়। ফুডব্যাংক নয় কিন্তু ফুডব্যাংকের মত এরকম অনেক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে আছে যারা নিয়মিত ক্ষুধার্ত ব্যক্তিদের জন্য খাবার দান করে যাচ্ছে। এক টাকার আহার একটি সেরকমই প্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন ১ টাকার বিনিময়ে অনেক মানুষ তাদের খাবার খেতে পারছে। এছাড়াও ঢাকা শহরে এরকম হাজারো প্রতিষ্ঠান আছে যারা প্রতিদিন খাবারের সময় নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা করছে যাতে মানুষকে ক্ষুধার কষ্ট না পেতে হয়। এখনকার সময়ে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমাদের জন্য বাইরে রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়া কোন ব্যাপার নয়।সুলভমূল্যে মজাদার খাবার খেতে পাওয়ার লোভ আমরা অনেকেই সামলাতে পারি না। কিন্তু সেই সাথে আমাদের খাবার নষ্ট করার প্রবণতাও বেড়ে গেছে। একটু সাবধানতা অবলম্বন করলেই কিন্তু আমরা এটা কমিয়ে ফেলতে পারি। যোগাযোগ মাধ্যমের ফুডব্যাংক গ্রুপকে শুধু খাবার রিভিউ দেওয়ার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে না ব্যবহার করে যদি আমরা একে সত্যিকার অর্থের ফুডব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করি তবেই আমাদের স্বার্থকতা আসবে।

Most Popular

To Top