টেক

নভোচারীদের চারটি রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা!

ইন্টারস্টেলার সিনেমা দেখে অথবা জাফর ইকবাল স্যারের উপন্যাসে নভোচারীদের গল্পে রোমাঞ্চিত হয়েছেন অনেকেই। কিন্তু, বাস্তবের নভোচারীদের গল্প কম রোমাঞ্চকর নয়। অর্ধশত বছরের মহাকাশ অভিজানের গল্পে, বিভিন্ন সময়ের তারা মুখোমুখি হয়েছে এমন সব বিপদ যা তাদের জীবন শেষ করে দিতে পারত।

মির(MIR) স্পেস স্টেশনে আগুনঃ
ভাবুন তো আপনি এমন এক জায়গায় আছেন যেখানে আপনি আর গভীর মহাশূন্যের মাঝে শুধুমাত্র একটা পাতলা এলুমিনিয়ামের দেয়াল। আপনি যে জায়গায় আছেন সে জায়গার বাইরে গেলেই নিঃশ্বাস নেয়ার আর কিছু নেই। নভোচারীদের কাছে ব্যাপারটা খুব স্বাভাবিক হলেও ভয়ংকর হয়ে উঠবে যদি হঠাৎ সেখানে আগ্নিকান্ড দেখা দেয়। ঠিক এমনই এক ব্যাপার ঘটেছিল ১৯৯৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মির(MIR) স্পেস স্টেশনে।

মির স্পেস স্টেশন; রাশিয়া দ্বারা পরিচালিত প্রথম মডিউলার এবং আর সে সময়ের সবচেয়ে বড় স্পেস স্টেশন। সাধারণত মিরে ৩ জনের থাকা খাওয়া আর দৈনন্দিন চাহিদা মেটাবার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু যখন অগ্নিকান্ডটি ঘটেছিল তখন মিরে একটি হস্তান্তর প্রক্রিয়া চলছিল। নতুন ক্রু মেম্বার এসে মিরে বুঝে নিচ্ছিল তাদের আগের ক্রুদের থেকে। দীর্ঘ ৫ দিন ধরে চলার কথা ছিল এই হস্তান্তর প্রক্রিয়া। এর মাঝে নতুন সদস্যদের বুঝে নিতে হবে কোথায় কি আছে, আর মানিয়ে নিতে হবে নতুন পরিবেশের সাথে।

বাড়তি সদস্য আসায় দৈনন্দিন চাহিদার চেয়ে বেশি অক্সিজেন দরকার পড়ছিল মিরে। এই ধরনের অক্সিজেন ঘাটতি মেটাবার জন্য স্পেস স্টেশনগুলোতে ব্যবহার হয় অক্সিজেন ক্যানিস্টারের। এই ধরনের একটি ক্যানিস্টার সাধারণত একজন ক্রু মেম্বারের একদিনের অক্সিজেন স্প্লাই দিতে পারে। ফলে সভাবতই সেই ক্যানিস্টারগুলো বদলাতে হয় নিয়ম করে।

নভোচারীদের পাঁচটি রোমাঞ্চকর ঘটনা!

ধ্বংসপ্রাপ্ত অক্সিজেন ক্যানিস্টার

এমনই এক ক্যানিস্টার বদলের সময় হঠাৎ সেখানে আগুন ধরে যায় সেখান থেকে। অক্সিজেন সাপ্লাই থেকে আগুন ধরে যাওয়ায় আর অভিকর্ষ বল না থাকায় সেটার মারাত্মক আকার ধারন করে। পুরো স্টেশন ধোয়ায় ভরে যায়, ক্রমশ অক্সিজেন লেভেল নিচে নামতে থাকে। এক সময় ক্রুরা ভয় পেতে থাকে এটা ভেবে যে আগুন স্টেশনের দেয়ালের এলুমিনিয়াম ফুটো করে দেবে, যার ফলে যে কোন মুহুর্তে শুরু হতে পারে ডিকম্প্রেশন প্রক্রিয়া। ফলে ভেতরের সমস্ত অক্সিজেন বের হয়ে গিয়ে আরো খারাপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে যে কোন মুহুর্তে।

আমেরিকান নভোচারী জেরি লিনেঞ্জার

পুরো ১৪ মিনিট ধরে চলে এই ভয়াবহ আগুন। এক সময় ধোয়ার কারনে একহাত দুরের জিনিসও দেখা যাচ্ছিল না। সেই সময় জেরি লিনেঞ্জার নামের এক আমেরিকান নভোচারী এগিয়ে আসে। মুখে অক্সিজেন মাস্ক পরে একের পর এক বোতল অগ্নি নির্বাপক স্প্রে করতে থাকে। এক সময় আগুন কমে গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে। আগুনের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে প্রায় চারটির মত অগ্নি নির্বাপকের বোতল লাগে পুরো আগুন নেভাতে।

স্পেস স্যুটে ছিদ্রঃ
স্পেস স্টেশনে থাকাকালীন নভোচারীদের বিভিন্ন গবেষনাকর্মে সহযোগীতার পাশাপাশি, স্টেশনের কোন সমস্যা সমাধান আর রক্ষণাবেক্ষণের কাজও করতে হয়। আর এই কাজের জন্য তাদের প্রায়ই স্টেশনের বাইরে মহাশূন্যে স্পেসওয়াকে (spacewalk) যেতে হয়। যারা গ্রাভিটি সিনেমাটি দেখেছেন তারা স্পেসওয়াকের রোমাঞ্চকর অনুভূতি পেয়ে থাকবেন। ২০১৩ সালের জুলাইয়ের ১৬ তারিখে, এমনই এক স্পেসওয়াকের সময় ইতালীয় নভোচারী লুকা পারমিটাঙ্গো এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সম্মুখীন হন।

ইতালীয় নভোচারী লুকা পারমিটাঙ্গো

স্পেসওয়াক শুরুর ত্রিশ মিনিট পর যখন তাকে দেয়া প্রথম দুটি কাজ শেষ করে তৃতীয় কাজটি করতে যাবেন, হঠাৎ করে খেয়াল করেন তার স্পেস স্যুটের কোথাও ছিদ্র হয়ে পানি বের হয়ে তার হেলমেটে ঢুকছে। লুকা এই ভয় পাচ্ছিল যে, এই পানি আবার তার অডিও যোগাযোগ না বন্ধ করে দেয়। সে বুঝতে পারে এন্টেনা বাচাতে হলে তাকে লম্বালম্বি অবস্থা থেকে আড়াআড়ি অবস্থায় যেতে হবে। কিন্তু যখনই সে তার পজিশন পরিবর্তন করল, সাথে সাথে পানি পিছন থেকে সামনে চলে আসে। আর সবচেয়ে আতংকের বিষয় হল, অভিকর্ষ বল না থাকায় সেই পানি তার চোখ, মুখ এমনকি নাকের আশেপাশে  ঘুরপাক খেতে থাকে। পানির কারনে চোখে দেখতে তো পাচ্ছিলই না, বরং একসময় পানি তার শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা করতে শুরু করল।

লুকার সেই পানি ভর্তি হেলমেট

লুকা ঘাবড়ে গেলেও ঠান্ডা মাথায় ব্যাপারটা সমাধান করে। সে পৃথিবীতে থাকা কন্ট্রোলকে অবহিত করে, ফলে সাড়ে ছয় ঘন্টার স্পেসওয়াক এক ঘন্টাতেই শেষ করে তাকে ফেরত আসতে হয়। পরে যখন তিনি ভেতরে আসেন তখন দেখা যায় যে তার হেলমেটে প্রায় দেড় লিটার পানি জমা হয়েছে। মজার ব্যাপার হল, এই ঘটনার ঠিক এক সপ্তাহ আগেও আরেকটি স্পেসওয়াকের পর, লুকা স্পেস স্যুটে পানির কথা রিপোর্ট করেছিলেন। কিন্তু নাসা ভেবেছিল সেটা পান করবার পানি, খাওয়ার সময় কোনভাবে বের হয়েছে।

আটলান্টিস দুর্ঘটনাঃ
১৯৮৮ সালের ডিসেম্বর, স্পেস সাটল অরবিটার থেকে STS-27 নামের নাসার এক গোপন মিশনের জন্য অপেক্ষায় আছে আটলান্টিস আর সাথে ভেতরে থাকা ৫ জন ক্রু। আমেরিকার প্রতিরক্ষা দফতরের তরফ থেকে নিয়ে যাচ্ছে এক গোপনীয় স্যাটেলাইট। মিশন আগেরদিন হওয়ার কথা থাকলেও আবহাওয়ার কারনে ২ ডিসেম্বর পরিচালিত হচ্ছে।

মিশনে ব্যবহৃত স্পেস শাটল

সবই ঠিক চলছিল কিন্তু উৎক্ষেপণের সময় আটলান্টিসের তাপীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা (thermal protection) ভয়াবহ রকমের ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ফলে সাড়ে চারদিনের মিশন শুরুর মাত্র ৮৫ সেকেন্ডের মাথায় ডান দিকের ডানা থেকে তাপসুরক্ষায় ব্যবহৃত নোজ ক্যাপ অরবিটালকে আঘাত করে। ভেতরের ক্রু মেম্বাররা যদিও রোবটিক হাত দিয়ে ক্ষয়-ক্ষতি নির্নয়ের চেষ্টা করছিল। কিন্তু খারাপ ক্যামেরা রেজুলেশন আর রেঞ্জের কারনে পুরো ক্ষয় ক্ষতি নির্নয় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। যদিও মিশনের কমান্ডার রবার্ট গিবসন আঘাতের ভয়াবহতা বুঝতে পারে।

সমস্যা আরো ঘনীভূত হয় কারণ, অত্যন্ত গোপনীয় মিশন হওয়ার কারনে ক্রু মেম্বারদের স্বাভাবিক উপায়ে ভাল কোন ছবি পৃথিবীর কন্ট্রোলে পাঠানো নিষিদ্ধ ছিল। ছবি পাঠানোর ক্ষেত্রে বরং তারা কম রেজুলেশনের ধীর গতির এনক্রিপ্ট ব্যবহার করছিল। ফলে কন্ট্রোল রুম থেকেও ক্ষয় ক্ষতি বোঝা সম্ভব হচ্ছিল না। কিন্তু মিশন কামান্ডার গিবসন ঠিকই বুঝতে পারছিলেন যে ক্ষয় ক্ষতি তাদের ধারনা থেকেও বেশি; আর খুব বেশিক্ষণ আটলান্টিস টিকে থাকবে না।

মিশনে ধ্বংস হওয়া টাইল

কিন্তু তারপরও আটলান্টিস বেঁচে যায় আর কোনভাবে অবতরণ করার পর নাসা বুঝতে পারে তাদের কত বড় ভুল হইয়েছিল। আটলান্টিসের গায়ে থাকা টাইলের মাঝে ৭০০ টাইল ক্ষতিগ্রস্থ হয় আর তাদের মাঝের একটি টাইলের কোন হদিস পাওয়া যায় নি। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হল, ডানদিক ভয়াওবহ ক্ষতিগ্রস্থ হলেও বামদিকের কোন ক্ষতিই হয় নি!

ডকিং এর সময় সেন্সর বিভ্রান্তিঃ
বিপদে জীবন বাঁচাতে কি কি প্রয়োজন? “বুড়ো আঙ্গুল আর একটুখানি উপস্থিত বুদ্ধি”; অন্তত ক্রিস হ্যাডফিল্ড একথা বলতেই পারেন। কানাডিয়ান এই নভোচারীর প্রথম ফ্লাইটেই এরকম পরিস্থিতে পড়তে হবে সেটা নিশ্চই আশা করেন নি। ঘটনাটি ঘটে যখন তিনি এবং তার সঙ্গী নভোচারী ‘মির’ (MIR) মহাকাশ স্টেশনে ডকিং করতে যাচ্ছিলেন।

কানাডিয়ান নভোচারী ক্রিস হ্যাডফিল্ড

স্পেস স্টেশনের যে কোন ডকিংই খুব নির্ভুল এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ হতে হয়। আরসেটা আরো কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে ওঠে, যখন ‘মির’ মহাকাশ স্টেশনের দিকে প্রায় পঁচিশ হাজার পাউন্ডের শাটল, পিরিচের মত কোন কিছু লক্ষ্য করে ডকিং করতে যায়। নির্দিষ্ট মাত্রার চেয়ে সামান্য বেশি জোরে ধাক্কা শুধু যে মিরকে দুভাগ করে ফেলতে পারে তা না বরং ভেতরে থাকা তিনজন নভোচারীদের মৃত্যুর মুখে ফেলে দিতে পারে। আবার নির্দিষ্ট পরিমান ধাক্কা না দিতে পারলে স্প্রিং মেকানিজমের কারনে তাদেরকে ছিটকে ফেলে দেবে।

ঠিক এমনই এক অবস্থায়, শাটলে থাকা দুরত্ব মাপার দুটো সেন্সরের ঝামেলা দেখা দিল। দুই সেন্সর দুই ধরনের রিডিং দেয়া শুরু করল; একটাতে দেখাল তারা ২১ ফুট দূরে, আরেকটাতে ৩২ ফুট। হ্যাডফিল্ড বুঝতে পারল, হয় এই দুই সেন্সরের কোনটাই সঠিক না, অথবা যেকোন একটি সঠিক। আসলে কোনটা সঠিক সেটা বেছে নেবার জন্য সময় আছে মাত্র ত্রিশ সেকেন্ড। এর মাঝেই তাদের বেছে নিতে হবে সঠিকটি, না নিতে পারলে নিশ্চিত মৃত্যু।

এমন সময় মাথা ঠান্ডা রাখা কতটা জরুরি তার পরিচয় দিলেন ক্রিস। চোখের সামনে বুড়ো আঙ্গুল আর হাতে স্টপ ওয়াচ নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন জানালার পাশে। অংক কষে বের করলেন ঠিক কি পরিমান গতিতে তারা যাচ্ছে। লক্ষ্যে পৌছানোর ঠিক তিন সেকেন্ড আগে তারা বুঝতে পারল যে কি পরিমান গতিতে তারা আঘাত করতে যাচ্ছে। তিনি সঠিক ছিলেন কি না সেটা আর বলে দিতে হবে না, ক্রিস হ্যাডফিল্ড নিজেই তার এই অভিজ্ঞতার বর্ননা দিয়েছেন।

Most Popular

To Top