ক্ষমতা

বন্দুক নৃশংসতা ও আমেরিকা

বন্দুক নৃশংসতা ও আমেরিকা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাম শুনলেই আমাদের মনে এক স্বপ্নময় উন্নত দেশের ছবি ভেসে ওঠে, যেখানে রয়েছে স্বপ্ন পূরণের অবারিত সুযোগ। কিন্তু এই স্বপ্নময় জগতের অন্তরালেই রয়েছে এক ভয়াল মৃত্যুফাঁদ যার নাম বন্দুক। আমেরিকানরা আর সব কিছুর সাথে সাথে তাদের বন্দুক ও অনেক বেশি ভালোবাসে, যার মূল্য তাদের প্রতি বছর হাজারো মানুষের মৃত্যুর বিনিময়ে শোধ করতে হয়।

গত ১৫ ফেব্রুয়ারী আমেরিকার ফ্লোরিডার পার্কল্যান্ডে এক বন্দুকধারী যুবক একটি বিদ্যালয়ে ঢুকে এলোপাথাড়ি গুলি চালানোর ফলে ১৭ জন ব্যক্তি নিহত এবং ১২ জন আহত হয়। এর প্রতিবাদে পুরো আমেরিকা জুড়ে হাজারো শিক্ষার্থী বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। তারা ক্লাস বর্জন করে রাস্তায় নেমে গান ভায়োলেন্স বন্ধে পদক্ষেপ নেবার জন্য প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছে যা আদায়ের লক্ষ্যে তারা অটল।

৫ নভেম্বর ২০১৭ সালে টেক্সাসের সাদারল্যান্ডের একটি চার্চে ঢুকে এক ব্যক্তির এলোপাথাড়ি গুলি চালানোর ফলে ২৮ জন নিহত ও ২১ জন আহত হয়।

টেক্সাসের ঘটনার মাসখানেক আগে একই বছরের অক্টোবরে লাস ভেগাসের একটি কনসার্টে এক ব্যক্তি গুলি চালিয়ে ৫৮ জন মানুষ হত্যা করে এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়।

উপরের এ তিনটি হামলার ঘটনা নিঃসন্দেহে যেকোনো দেশের অন্যতম কালো অধ্যায় হিসেবে স্থান পাবে, কিন্তু দুঃখের হলেও সত্য আমেরিকার জন্য তা তাদের দেশে ঘটা এরকম হাজারো নৃশংসতার ঘটনার মতো আরেকটি ঘটনা মাত্র।

১৯৮২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত আমেরিকায় এরকম ৯০টি ম্যাস শুটিং এর ঘটনা ঘটেছে, যেখানে বন্দুকধারী এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়ে নিরীহ মানুষ হত্যা করেছে। এই বন্দুকধারীদের মধ্যে ১১ বছর বয়সী থেকে ৬৬ বছর বয়সী ব্যক্তিও রয়েছে। অধিকাংশ সময়েই নিরীহ মানুষদের হত্যা করতে গিয়ে এই বন্দুকধারীরাও নিহত হয়।

আমেরিকায় প্রতি বছর সংঘঠিত সকল খুনের ঘটনার ৬৪ শতাংশ বন্দুক দ্বারা ঘটানো হয়। ২০১৬ সালে ১১০০০ মানুষ সেদেশে বন্দুক দ্বারা ঘটিত নৃশংসতায় মৃত্যুবরণ করেছে। তার আগের বছর গুলোতেও এ সংখ্যাটি কাছাকাছি।
২০১৫ সালে ৫৯টি বিদ্যালয়ে শুটিং এর ঘটনা ঘটেছে। প্রতি বছরই এমন বহু বিদ্যালয়ে নিরীহ ছাত্র শিক্ষকদের ওপর বন্দুকধারী খুনি ঝাপিয়ে পড়ে। ঝরে যায় অনেক নিরপরাধ প্রাণ।
বলাই বাহুল্য উন্নত বিশ্বের আর কোনও দেশে এত পরিমাণ গান ভায়োলেন্স কখনো হয়না।
এই তথ্যগুলো জানার পর আমেরিকাকে একটি স্বপ্নময় রাজ্য অপেক্ষা একটি মৃত্যুপুরীই বেশি মনে হয়।

চলুন সংক্ষেপে দেখে নেয়া যাক, কেন বছরের পর বছর আমেরিকার মতো একটি পরাশক্তির দেশ নিজেদের দেশের গান ভায়োলেন্স দমন করতে পারছে না।

সংবিধান ও রাজনীতি

আমেরিকার সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনীতে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের নাগরিক প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের ইচ্ছায় বন্দুক সংগ্রহ ও বহনের অধিকার রাখেন। সংবিধানের এই এমেন্ডমেন্ড এর অজুহাত দিয়ে সংবিধানপন্থি রাজনীতিবিদরা কখনোই বন্দুকের ক্রয় সীমিত করার বিলে সমর্থন দেন না। সবসময় অজুহাত দেখানো হয় যে, বন্দুক বহন করা একটি সাংবিধানিক অধিকার এবং যা খর্ব করা যাবে না। আরও যুক্তি দেখানো হয় যে, সবার কাছে বন্দুক থাকলে বিপদের মুহূর্তে মানুষ নিজেকে রক্ষা করতে পারবে যার ফলে সমাজ আরও নিরাপদ থাকবে। এর ফলে বছরের পর বছর কংগ্রেসে বিল পাস হয় না। ফলে যে কারো কাছে পূর্ণ আইনি সুযোগ থাকে যত ইচ্ছা তত বন্দুক কেনার। মানুষের হাতে বন্দুকের প্রাচুর্য থাকার ফলে নৃশংসতার ঘটনা অনেক বেশি হয়।

সহজলভ্যতা

আগেই বলেছি যে বন্দুক কেনা বেচায় আমেরিকায় কোন আইনি বাধা নেই। যার ফলে আমেরিকায় প্রচুর বন্দুক তৈরী ও বিক্রি করা হয়। সেগুলো কেনার সময় ক্রেতার নামমাত্র ব্যাকগ্রাউন্ডও যাচাই করা হয়। যার ফলে বন্দুক ক্রয় অত্যন্ত সহজ। দাগী আসামী, মানসিক রোগী বাদে ১৮ বছরের উর্ধ্বে যে কেউ অনায়াসে বন্দুক ক্রয় করতে পারবে। দামও তুলনামূলক কম। ভাল মানের হ্যান্ডগানের দাম মাত্র ২০০ ডলার এবং এসল্ট রাইফেল পাওয়া যায় মাত্র ১৫০০ ডলারে যা অনেক ইলেকট্রনিক গ্যাজেটের দামের সমান!

সহজলভ্যতার কারণে আমেরিকায় প্রতি ১০০ মানুষের জন্য ৮৮টি বন্দুক রয়েছে। এই সংখ্যা ব্রিটেন, কানাডা সহ যেকোন উন্নত রাষ্ট্রের বন্দুকের সংখ্যার থেকে বেশি।মোট ২৭০ মিলিয়ন সিভিলিয়ান মালিকানার বৈধ বন্দুক রয়েছে আমেরিকায়।এ কারণ থেকে সহজেই বোধগম্য যে কেন আমেরিকায় গান ভায়োলেন্স এতো বেশি ঘটে।

ফায়ার আর্মস ইন্ডাস্ট্রি এবং লবিস্ট গ্রুপ

বোঝাই যাচ্ছে, যেহেতু দেশে বন্দুকের বৈধতা এবং চাহিদা রয়েছে তার মানে চাহিদার যোগানের জন্য যোগানদাতাও রয়েছে। এবং এই যোগানদাতারা হল বড় বড় বন্দুক নির্মাণকারী এবং বিপনণকারী প্রতিষ্ঠান। যারা বছরে বিলিয়ন ডলারের বন্দুকের ব্যবসা করে। প্রতি বছর প্রায় ১৩.৫ বিলিয়ন ডলারের রেভিনিউ আমেরিকার গান ইন্ডাস্ট্রি থেকে পাওয়া যায়। এসব প্রতিষ্ঠান কখনোই চায় না যাতে সরকার বন্দুক ক্রয়ে কঠোরতা আরোপ করুক। তাই তারা পলিটিশিয়ানদের নির্বাচনী ক্যাম্পে প্রচুর টাকা ডোনেট করে এই শর্তে যে, তারা ক্ষমতায় গেলে গান কন্ট্রোল বিলে ভোট দিবে না বা গান কন্ট্রোল সমর্থন করবে না। সেরকম একটি প্রভাবশালী লবিস্ট গ্রুপ হল ন্যাশনাল রাইফেল এসোসিয়েশন বা এন আর এ। ১৮৭১ সালে প্রতিষ্ঠা পাওয়া এই সংগঠন গত ৭০ এর দশক থেকেই রাজনীতিতে অর্থ এবং ক্ষমতা দ্বারা প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। বর্তমান ক্ষমতাশীল রিপাবলিকান দলের পেছনে এই সংগঠন প্রতি বছর মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করে। কিছু সংখ্যক ডেমোক্রেটদেরও তারা প্রভাবিত করে প্রতি বছর। এ কারণে যেকোনো ম্যাস শুটিং এর পরেই দেখা যায় পলিটিশিয়ানরা বন্দুক ক্রয়ে কঠোরতা আরোপনের বদলে শুটারের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর দোষ চাপিয়ে আলোচনা শেষ করতে চাইছে। অনেকে আবার বন্দুক ক্রয়ে শিথিলতা আরোপ করতে চান এই বলে যে, সমাজে সবার কাছে বন্দুক থাকলে নিরাপত্তা বাড়বে। সবার কাছে বন্দুক থাকলে বিপদের মুখে তা সবাই ব্যবহার করে বিপদমুক্ত হবে এই মর্মে মিডিয়ায় পলিটিশিয়ানদের যুক্তি দিতে দেখা যায়।

 

আমেরিকা

পার্কল্যান্ডের ম্যাস শুটিং এর পর পরই ডোনাল্ড ট্রাম্প আহবান জানিয়েছেন, স্কুলের শিক্ষকদের হাতে বন্দুক তুলে দেওয়ার জন্য এবং বলেছেন যারা বন্দুক বহন করবে তাদের বেতন বাড়িয়ে দেয়া হবে। সাউথ ডাকোটায় এ সংক্রান্ত একটি বিলও পাস হয়েছে বলাই বাহুল্য ন্যাশনাল রাইফে এসোসিয়েশন ও একই ধরণের বিবৃতি দিয়েছে।
কিন্তু আদতে তাদের যুক্তির বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় না। অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নেই এমন ব্যক্তির হাতে অস্ত্র থাকলেও বিপদের মুখে তিনি তা ব্যবহার করতে পারেন না। উল্টো তা ডেকে আনে আরও বিপদ।
একের পর এক ম্যাস শুটিং, গান ভায়োলেন্স এ আমেরিকা জর্জরিত হতেই থাকে।

রাজনীতির মঞ্চ থেকে মিডিয়ায় এসব লবিস্ট গ্রুপ এবং ইন্ডাস্ট্রীয়ালিস্টদের প্রভাবে বন্দুক ক্রয়ে কঠোরতা আরোপের যুক্তি শক্তভাবে দাঁড়াতে পারে না। কোন অঘটন, হতাহতের ঘটনার পর পরই আলোচনার মোড় ঘোরানো হয় বন্দুক বাদে অন্য যেকোনো বিষয়ের উপর দোষ চাপিয়ে।

বন্দুকের প্রতি আকর্ষণ

এতটুকু পড়ার পরে পাঠকের মনে প্রশ্ন আসার কথা যে কেন আমেরিকার মতো রাজনীতি এবং সমাজ সচেতন রাষ্ট্রের নাগরিকেরা তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে না এসব লবিস্ট গ্রুপের বিরুদ্ধে। কেন ঐসব রাজনীতিবিদেরা এখনো ভোটের রাজনীতিতে টিকে আছে এমন গণবিরোধী নীতি অবলম্বন করার পরেও।

এই প্রশ্নের উত্তর বেশ জটিল। নাগরিক হিসেবে আমেরিকানরা পশ্চিমের বাকি দেশগুলোর নাগরিকদের থেকে অনেক আলাদা দর্শন, রুচি ও চিন্তার দিক থেকে। ঐতিহাসিকভাবে আমেরিকানরা রাষ্ট্র সম্পর্কে খানিক ভিন্ন ধরণের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে।আমেরিকার জন্মের সময়ই এর ফাউন্ডিং ফাদার রা এমন একটি সংবিধান এর জন্ম দেন যার উদ্দেশ্য পুঁজিবাদ এবং ব্যক্তির স্বাধীনতাকে সবচেয়ে কার্যকরী ভাবে সংরক্ষণ করা। তারা মনে করতেন রাষ্ট্রের সরকারই মানুষের স্বাধীনতায় সবচেয়ে বেশি হস্তক্ষেপ করে। তাই বাকস্বাধীনতাকে সবচেয়ে বেশি মর্যাদা দেয়া হয়েছে যাতে নাগরিকেরা সব অনাচারের প্রতিবাদ করতে পারে, এমনকি তা সরকারের বিরুদ্ধে গেলেও। বন্দুক বহন করার আইন সেই চিন্তা থেকেই এসেছে। সরকার কাউকে আক্রমণ করলে ব্যক্তি যাতে নিজেকে রক্ষা করতে পারে তাই বন্দুক বহন করা কে ফাউন্ডিং জেনারেশন গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছে। এর কারণ স্বাধীনতার পূর্বেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী সরকারের বিরুদ্ধে আমেরিকানদের বন্দুক দিয়ে লড়তে হয়েছে।

প্রজন্মের পর প্রজন্মে এই চিন্তাধারা প্রবাহিত হয়েছে। এখনো প্রায় অর্ধেকের মতো আমেরিকান নাগরিক বিশ্বাস করে যে বন্দুক বহন করা তাদের সাংবিধানিক অধিকার এবং সরকারের কোন অবস্থাতেই তাতে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। তারা এও বিশ্বাস করে যে বন্দুকই পারে নিরাপত্তা কার্যকরভাবে নিশ্চিত করতে। অনেকেই আবার বনে বাদারে শিকার করার নেশায় বন্দুকের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়ে। কিছু কিছু স্টেট যেমন টেক্সাস ইত্যাদিতে বন্দুক বহন করা কালচারের সাথে মিশে গিয়েছে। সেসব অঞ্চলের মানুষ বেশ তীব্রভাবে বন্দুক অনুরাগী।

হলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা ব্র্যাড পিটও একবার বলেছিলেন ঘরে বন্দুক থাকাকেই তিনি সবচেয়ে নিরাপদ মনে করেন।
বন্দুক নিয়ে এমন বিভাজিত মতামতের কারণেই বছরের পর বছর আইনের কোন পরিবর্তন হয় না। বন্দুকের পক্ষে সাফাই গেয়ে দিব্যি পলিটিশিয়ানরা ভোট পেয়ে নির্বাচন জিতে আসেন।

ভবিষ্যত কোন পথে

সারা পৃথিবীর সবকিছুই বর্তমানে অনেক দ্রু্ত পরিবর্তনশীল হলেও আমেরিকার গান ভায়োলেন্স এর চিত্র তার বিপরীত। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ হতাহত হচ্ছে সমাজে বন্দুকের সংখ্যাধিক্য থাকার কারণে। কিন্তু পরিবর্তনের কোন হদিস সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই ভবিষ্যত উন্নতির দিকে যাবে কিনা তা সঠিকভাবে বলা না গেলেও এটি নির্ভূলভাবে বলা যায় যে, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি এবং ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিবর্গের সদিচ্ছা ছাড়া এ মহামারী থেকে আমেরিকা মুক্ত হতে পারবে না।

লিখেছেনঃ কিফায়েত আলফেসান

Most Popular

To Top