ফ্লাডলাইট

ফ্লোরেন্টিনো পেরেজঃ বদ্ধ পাগল নাকি জিনিয়াস!

ফ্লোরেন্তিনো পেরেজঃ বদ্ধ পাগল নাকি জিনিয়াস

“স্পেনিশ ছাড়া যেমন ফ্লোরেন্টিনো পেরেজকে বোঝা যায় না, তেমনি এমন মানুষগুলো ছাড়া স্পেন সম্পর্কে জানা যায় না” -জনৈক স্প্যানিশ লেখক।

ফ্লোরেন্টিনো পেরেজ। বর্তমানে রিয়াল মাদ্রিদের প্রেসিডেন্ট হিসেবেই যাকে বিশ্ব চেনে। ভদ্রলোকের বয়স ৭০। জন্ম ৮ মার্চ ১৯৪৭ সালে, মাদ্রিদের হর্তালেজা, স্পেনে। শান্ত, সৌম্য চেহারা। দেখলে হাসি খুশি সহজ সরল মানুষ বলেই মনে হয়।

অথচ তাঁর মত প্রেসিডেন্ট ফুটবল বিশ্ব পেয়েছে হাতে গোনা কয়েকজন। ফুটবলের দুনিয়ায় তাঁর জেদ ও পয়সা দুটোই জগদ্বিখ্যাত! পেশায় তিনি বর্তমানে ব্যবসায়ী, বিলিয়নিয়ার পেরেজের ফুটবল জগতে আগমন ২০০০ সালে।

ফ্লোরেন্টিনো পেরেজঃ বদ্ধ পাগল নাকি জিনিয়াস!

কে ছিলেন এই পেরেজ! তিনি একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। মাদ্রিদের পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটির সিভিল থেকে বের হয়ে সরকারি চাকরিতে ঢুকেছিলেন তিনি। জীবনের প্রথম দিকে ব্যবসাতে মনোনিবেশের আগে, রাজনীতির পোকা মাথায় ঢুকেছিল তার। মাদ্রিদ সিটি কাউন্সিলে যাওয়া আসা ছিল তার। ফলে স্পেনের পাবলিক রেডের কিছু দায়িত্ব তার ওপর পড়ে। তার কাজে খুশি হয়ে স্পেনের গণযোগাযোগ এবং পরিকল্পনা মন্ত্রনালয়ে তাকে চাকরির সুযোগ করে দেওয়া হয়। তার এই প্রোমশনেও তিনি খুশি ছিলেন না, উপরে ওঠার প্রচন্ড ইচ্ছা তাকে নিজ জায়গায় আত্মদগ্ধতায় পোড়াচ্ছিল।

তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের পালে হাওয়া লাগে যখন ডেমোক্রাট রিফর্মিস্ট পার্টির সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। কিন্তু তার এই কপাল বেশিদিন স্থায়ী হয়নি । ১৯৮৬ সালে ভোটে তার দল নূন্যতম ভোট অর্জনে ব্যর্থ হয়। ফলে পার্লামেন্টে তাদের রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচয় দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে রাজনৈতিক জীবনে ইতি টেনে মনস্থির করেন বিশ্ব বাণিজ্যে প্রবেশ করবেন। তার কিছু বন্ধুকে নিয়ে দেউলিয়া এক কোম্পানি “পেদ্রোজ” কিনে নেন। তার মাল্টিন্যাশনাল কর্পোরেশনে ঢোকার প্রথম পদক্ষেপ যে তিনি নিয়েই ফেলেছেন, তা কেই বা জানত! তিনি তার বাণিজ্য সম্রাজ্য যেন বিদ্যুৎ গতিতে বাড়াতে থাকেন। সালটি ছিল ১৯৯৩ যখন পেদ্রোজ যুক্ত হয় আরেকটি বড় কোম্পানির সাথে এবং তিনি পরিণত হন বিশ্ব বাণিজ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই কোম্পানিই এখন এসিএস (ACS) নামে পরিচিত। কিন্তু জনপ্রিয় হওয়ার ভূত তখনও তার মাথা থেকে যায়নি।

সুযোগ কাজে লাগাতে তিনি ভোলেননি। ১৯৯৫ সালে ঋন সমস্যায় থাকা রিয়াল মাদ্রিদের প্রেসিডেন্ট হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ব্যর্থ হন। তিনি আবার মনোনিবেশ করেন তার বাণিজ্য সাম্রাজ্য প্রসারে। কেটে যায় ৫টি বছর। তার বাণিজ্য সম্রাজ্য যখন আরও পরিপক্ক এবং জনসেবায় মানুষের মনেও মোটামুটি জায়গা করে নিয়েছেন, তখনই আবার রিয়ালের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পুনঃচেষ্টা করেন। তৎকালীন রিয়াল চেয়ারম্যান লরেঞ্জো সাঞ্জ এর বিরুদ্ধে ভোটে দাঁড়ান তিনি। সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ভাবে প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে স্বপ্ন পূরন করেন। এখানে একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে। পেরেজ ভোটে জেতার জন্য এক অবিশ্বাস্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা হল তিনি ভোটে জিতলে লুইস ফিগোকে সাইন করাবেন।

ফ্লোরেন্টিনো পেরেজঃ বদ্ধ পাগল নাকি জিনিয়াস!

তৎকালীন প্রেক্ষাপটে এ নেহাত পাগলের প্রলাপ ছাড়া কিছুই নয়। ফিগো তখন বার্সেলোনার ক্যাপ্টেন। কেউ ভুলেও ভাবেনি পেরেজে তাঁর প্রতিশ্রুতি রাখতে পারবেন। নির্বাচনে জিতে এসে এই অসম্ভবকেই সম্ভব করে দেখালেন পেরেজ। মাদ্রিদে সাইন করলেন ফিগো। এ কাজ যে তিনি কিভাবে সম্পন্ন করেছিলেন তা আজও কেউ জানে না!

চতুর্দিকে হইচই পড়েছিল ! বার্সা ফ্যানবেস প্রচণ্ড শকড! তখনও কেউ জানত না যে খেলা তো সবে শুরু!

শুরু হল পেরেজের ইনিংস।

এই ইনিংস খানিকটা রোলারকোস্টার রাইডের মত!

পরের শকটা এল খুব দ্রুত। তবে এবার বার্সা নয়, খোদ মাদ্রিদ ফ্যানদের উপর। দলের অন্যতম কাণ্ডারি, ডিফেন্সিভ মিডিও ম্যাকলেলেকে স্রেফ বেঁচে দিলেন পেরেজ। কোনো কারণ ছাড়াই! টিমের ভারসাম্য নষ্ট হতে বসল। মাদ্রিদিস্তারা আগুন, কিন্তু বদলে যাকে দলে আনলেন পেরেজ, তাকে দেখে চক্ষু ছানাবড়া হওয়ার উপক্রম! এ যে খোদ ডেভিড বেকহ্যাম!

ফ্লোরেন্টিনো পেরেজঃ বদ্ধ পাগল নাকি জিনিয়াস!

পেরেজ যে ছক কষছিলেন তা কারোরই মাথায় ছিল না। গোপনে তৈরি শুরু করছিলেন দিগ্যালাক্টিকোস তৈরীর প্লান। দলের প্রতিটি প্লেয়ারের ব্র্যান্ড ভ্যালু হাই হতে হবে এই ছিল তাঁর ক্রাইটেরিয়া। এর এফেক্ট পড়তে শুরু করেছিল টিমের উপর। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যবসা করতে গিয়ে ফুটবলের ক্ষতি হচ্ছে এই অভিযোগ ওঠায় পেরেজ পদত্যাগ করেন। সালটা ২০০৬।

কিন্তু যিনি রিয়াল লাইফে ফিফা খেলার স্বাদ পেয়েছেন তিনি কি আর ফুটবল সার্কিট ছেড়ে থাকতে পারেন! ফিরতে তাকে হলই।

২০০৯ সাল, ১৪ই মে, পেরেজ প্রেস কনফারেন্স ডেকে বললেন তিনি আবার প্রেসিডেন্সিয়াল ইলেকশানে দাড়াবেন।

৫৭ মিলিয়ন ইউরো গ্যারান্টি দিতে হয় রিয়াল মাদ্রিদের নির্বাচনে লড়তে গেলে। পেরেজ বাদে সেই গ্যারান্টি আর কেউ দিতে না পারায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় জিতে দ্বিতীয় বারের মত ক্ষমতায় এলেন ফ্লোরেন্টিনো পেরেজ। এসে শুরু করলেন স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে বেচা কেনা। আমরা যেভাবে বাজার থেকে আলু কিনি, পেরেজও মোটামুটি একইভাবে প্লেয়ার কেনেন। কেজি দরে। কাকা, আল্বিওল, রেকর্ড ট্রান্সফার ফি দিয়ে ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্দো, হিগুয়াইন, দি মারিয়া, অজিল… কে নেই তাঁর লিস্টে? স্বপ্নের টিম বানানো শুরু করলেন পেরেজ।

ফ্লোরেন্টিনো পেরেজঃ বদ্ধ পাগল নাকি জিনিয়াস!

রিবিল্ট হল গ্যালাক্টিকো। কিন্তু ধৈর্য বলে কোন বস্তু নেই তাঁর। ট্রফি না জিতলেই নির্বিচারে কোচ ছাঁটাই করেন তিনি। তাঁর শিকার হয়েছেন পেলেগ্রিনি, মরিনহো, ভিন্সেন্ত দেল বস্কির মত গ্রেট কোচেরা। একটা মাত্র ট্রফিলেস সিজনের জন্য কার্লো আঞ্চেলত্তিকে স্যাক করে নিজের ফ্যানবেসের কাছে তুমুল গালিগালাজের স্বীকার হন পেরেজ। লা দেসিমা জেতার পরেও দি মারিয়ার মত এসেনশিয়াল প্লেয়ারকে বেচে দুর্নাম কুড়িয়েছেন তিনি। অজিল, দি মারিয়া, কার্লো, ম্যাক্লেলেকে বেচার জন্য মাদ্রিদিস্তারা কোন দিন পেরেজকে ক্ষমা করবে না। কিন্তু একথা বাজি রেখে বলা যায় অন্য কোন প্রেসিডেন্টের সাধ্য ছিল না পেরেজের ট্রান্সফার অ্যাচিভমেন্ট ছোঁয়ার।

পেরেজ না থাকলে হয়ত রিয়াল মাদ্রিদ থাকত, কিন্তু “দি রিয়াল মাদ্রিদ” হয়ত চোখে পড়ত না কারোরই। আজ ফিগো, ব্যাকহাম,ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো মত খেলোয়াড়দের দিকে তাকিয়ে মাদ্রিদিস্তাদের দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলতে হত “ইস! এরা যদি আমাদের ক্লাবে খেলত!” আর হুম, এই পেরেজের জন্যই রিয়াল মাদ্রিদ আজ বিশ্বের সব চাইতে ধনী ক্লাব!

হ্যাঁ, এখন কি বলবেন পেরেজ কে? বদ্ধ পাগল না জিনিয়াস?

সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ন আপনার…

Most Popular

To Top