নাগরিক কথা

একুশে বইমেলার একটি দূরবীক্ষণ পর্যবেক্ষণ এবং আংশিক অনুবাদ প্রসঙ্গ

বই মেলা

১.
বাংলাদেশের বাহিরে অবস্থান করার কারণে একুশে বইমেলায় যাওয়া হয় না তিন বছর। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে এর আগে বই মেলায় না গিয়ে বলা সম্ভব হতো না কি কি নতুন নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে। হেঁটে হেঁটে , স্টলে স্টলে গিয়ে যেন আবিষ্কার করতে হতো কোন জায়গায় গুপ্তধনের মতো কোন বই লুকিয়ে আছে তা। সেটা অন্যরকম একটা পাওয়ার আনন্দের ছিলো। অপ্রত্যাশিত কিছু পাবার আনন্দর মতো।

যদিও সব সময়েই খবরের কাগজে অথবা নিউজে প্রকাশিত বইয়ের কথা থাকতো কিন্তু সব ছিলো অপ্রতুল। এখন ইন্টারনেট আর সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে নিয়মিত এবং অহরহ চোখের সামনে চলে আসে কোথায় কি বই প্রকাশিত হয়েছে আর কোন বইটা পাওয়া যাবে কোন স্টলে। এতে দুটি ঘটনা ঘটে। প্রথমত মেলায় ঘোরা হয় না, যে যার মতো স্টলে যাচ্ছে। লিস্টের বই কিনে নিয়ে চলে আসছে। লেখক সেখানে থাকলে কয়েকটা ছবি তুলছে। চেক ইন দিচ্ছে। কিন্তু বঞ্চিত হচ্ছে ‘এক্সপ্লোরেশন’ করা থেকে। বিষয়টা অনেকটা ট্রাভেলার এবং টুরিস্টের পার্থক্যর মতো। টুরিস্টরা কোথাও যায় পূর্বে সেই যায়গার ছবি দেখে, থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করে। ট্রাভেলার’রা যান এক্সপ্লোর করতে। তারা শুধু জানে তাদের চলতে হবে এবং পথ আবিষ্কার করে নিতে হবে নিজের মতো করে। তো বইমেলার বর্তমান হালচাল হয়েছে টুরিস্ট মানসিকতার। ট্রাভেলিং এর এক্সপ্লোরেশনের নেশা সেখানে অনুপস্থিত।

দ্বিতীয় যে ব্যাপারটা ঘটে সেটা হচ্ছে বাণিজ্যিক এবং অর্থনৈতিক। পাঠক সরাসরি জানছে কোন বইটা কোথায়। তাই সময় বাঁচিয়ে সরাসরি নির্দিষ্ট স্টলে গিয়ে সেইটাই শুধু কিনছে। কয়েকটি ছবি তুলছে। সোশ্যাল মিডিয়াতে আপলোড দিচ্ছে। ফলশ্রুতিতে যাদের বা যে সব প্রকাশনীর বিপণন বা মার্কেটিং ব্যবস্থা যত উন্নত তারাই শুধু পাঠক পাচ্ছেন। অন্যরা পাচ্ছেন না। ভালো কিছু তাদের ভাণ্ডারে থাকার পরেও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছেন না। প্রতিযোগিতার বাজারে ভালো বিপণন ব্যবস্থা না থাকলে ক্ষতি পোহাতে হবে সেটা সত্য এবং স্বাভাবিকও। যা থেকে পরিত্রাণ নেই। কিন্তু যতটুকু চলার কথা সেইটুকুও কেউ চলতে পারছেন না মূলত টুরিস্ট ঘরনার আধিক্যতার জন্য। এই বই মেলার টুরিস্ট পাঠকদের নিয়ে কোন অভিযোগ নেই। কিন্তু হতাশা আছে পাঠ-অন্বেষী বাতিক গ্রস্থ পাঠকেদের দিন দিন বিলুপ্তি হয়ে যাওয়া দেখে আর ওইদিকে টুরিস্টদের সংখ্যার আধিক্য দেখে। যার ফলে মেলায় গিয়েও লেখক পাঠকের মিলন মেলা বলে মনে হচ্ছে না। বাজার মনে হচ্ছে। তবে মেলা মানেই বাজার। যতই লেখক পাঠকের মিলন মেলা বলে আমরা মহিমান্বিত করি না কেন মেলাটাকে, কিন্তু এই বাজার ছোটবেলার সেই আবেগের বাজারের পরিবর্তে বাজারি বাজার হচ্ছে, এটাই চোখে বাঁধছে বেশি।

২.
গত কয়েক বছর ধরেই বইমেলায় প্রকাশিত বইয়ের লিস্টে প্রচুর অনুবাদ গ্রন্থ চোখে পরে। থ্রিলার, কমেডি, হরর, রোমান্স, সায়েন্স ফিকশন ইত্যাদি প্রায় সব ধরণের ফিকশন কিংবা বিজ্ঞান অথবা রাজনৈতিক বা আত্মজীবনী সহ নানা পদের নন-ফিকশনের অনুবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে মার্কেট ভালো অনুবাদের। এইটা ভালো। অবাঙ্গালীরা কি করে ভাবনা চিন্তা করছে বা বিশ্ব কতটা বৈশ্বিক ভাবে চিন্তাভাবনা করছে আবেগ দিয়ে যুক্তি দিয়ে সেটা এইসব অনুবাদের সাথে স্পষ্ট হতে থাকে। যা আমাদের অবস্থানকে আরো আন্তর্জাতিক করার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সার্বিক ক্ষেত্রে আমরা কি আসলেই আন্তর্জাতিক হচ্ছি? চাহিদা আছে বিধায় আমরা ধর তক্তা মার পেরেকের মতো করে অনুবাদ করে ফেলছি। প্রচুর অনুবাদের অভিজ্ঞতার জন্য অনুবাদের কোয়ালিটিও ভালো হচ্ছে হয়তো। কিন্তু বাণিজ্যিক চাহিদার বাইরে এভাবে অনুবাদ করার বিষয়টা কি ইথিকাল বা নৈতিক? যখন সাদা চোখের পর্যবেক্ষণে বলে কম করে হলেও পঁচানব্বই শতাংশ বই অনুবাদ হচ্ছে মূল বিদেশি রচয়িতার বা প্রকাশকের কোন ধরণের পারমিশন বা কমিউনিকেশন ছাড়া!

অনেক আগে সেবা প্রকাশন একটা স্ট্রাটেজি ফলো করতো। ষাট বছর পূর্বের প্রকাশিত বই গুলোই শুধু তারা সরাসরি অনুবাদ করতো ঠিক মূল বইয়ের নাম দিয়ে। কারণ যতদূর জানি (ভুলও হতে পারে), লয়ালিটির আইনকানুনে ষাট বছর হয়ে গেলে অনুবাদের ক্ষেত্রে স্বত্ব সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয় কিছুটা। তাই অনুবাদ কর্ম গুলো অনৈতিক হয় না ঠিক এখন যেমনটি করে হচ্ছে অপেক্ষাকৃত আধুনিক বই গুলো অনুবাদের ক্ষেত্রে (বিস্তারিত বলতে পারছি না কারণ আমি আইন বিশেষজ্ঞ নই)। তখন সেবা প্রকাশন অপেক্ষাকৃত নতুন বই গুলো অনুবাদ করতো না সরাসরি। মূল বিদেশি বইয়ের নির্যাসের-ছায়ায় নিজের মতো করে লিখে ফেলতো। সেই সব বইয়ের প্রতিটাতেও উল্লেখ থাকতো কোন বইয়ের ছায়া নিয়ে বইটি করা। এটাও হয়তো সম্পূর্ণ নৈতিক নয় কিন্তু কিছুটা হলেও মন্দের ভালোর মতো চক্ষুলজ্জা বিহীন অনুবাদ কর্ম নয়।

এইটা অন্তত বলা যায়, পড়তে যানা মানুষ মাত্রই নৈতিকতার আদর্শ সম্পর্কে প্রথম ধারণা পায় বাবা-মা, শিক্ষকের চাইতে তাদের পাঠ করা বই-পত্র থেকে, যা লেখেন লেখকেরা । সেই লেখকেরাই যদি অনুবাদের সময় এভাবে অনৈতিক ভাবেই লিখে যান কিংবা চক্ষু লজ্জাবিহীন হন বা না দেখার ভান করে থাকেন আর প্রকাশকরা সেটা প্রকাশ করেন তাহলে আমাদের শুধু বলতে নয়, মানতে হবে আমাদের নৈতিকতার সমস্যা আছে।

অনুবাদ নিয়ে বলতে গিয়ে প্রথমে বলেছি অনুবাদ দিয়ে আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠা হয়। কিন্তু কথাটা আংশিক সত্য। প্রকৃত সত্য হচ্ছে অনুবাদ অন্য ভাষা থেকে নিজের ভাষায় করা এবং নিজের ভাষার জিনিস অন্য ভাষায় অনুবাদ করার মাঝেই একমাত্র আমাদের আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ডের হয়ে ওঠা অন্তর্নিহিত। আমাদের অনেক মহা বিজ্ঞ মানুষ আছে যারা লেখনীতে, টিভিতে-টকশোতে আলোচনায় শুধু বিদেশি কিছু নিজের ভাষায় অনুবাদ করতে বলেন। অনুবাদের নৈতিকতা চর্চার কথা বলেন না। এবং বলেন না নিজের জিনিস আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলতে পাল্টা অনুবাদ করার কথা।

তারা কথায় কথায় জাপানের উদাহরণ টেনে শোনান, একটা সময় জাপানিদের টেক্সটবুক ছিলো ইংরেজিতে তারপর ধীরে ধীরে সব হয়েছে জাপানি ভাষায়। আর সেই জন্য দাবী করে সব কিছুই জাপানিদের অনুবাদ করে ফেলার উদ্যোগের কথা। কিন্তু তারা দেখেন না কিংবা বলেন না জাপানিরা কম কিন্তু নিজেদের কৃষ্টি-কালচার বিদেশি ভাষায় অনুবাদ করে নি !

চীনের দিকে তাকালে আমরা তাই দেখবো, তাদের সব কিছু প্রতিনিয়ত চৈনিক ভাষায় হচ্ছে। গবেষণা পত্রও লেখা হয় চৈনিক ভাষায় কিন্ত সেখানে কি তারা সীমাবদ্ধ? তাদের আলাদা ডিপার্টমেন্ট আছে যা সেই সব প্রকাশিত কাজ গুলোকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে দিচ্ছে।

রাশিয়া কি পরিমাণ অনুবাদ করতো নিজেদের সব কিছু অন্য ভাষায় তা সোভিয়েত আমলে কম উপলব্ধি করি নি। সরকারি বেসরকারি এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে তারা অনুবাদ করে গিয়েছে নিজেদের থেকে ভিন দেশি ভাষায়। সবাই তাই করছে।

তাই আমরা পাই ভিন দেশের লেখা। সুদূর লাতিন আমেরিকার লেখা গুলো সম্পর্কে অনুবাদ না হলে কি বিশ্ববাসীর মতো আমরাও পেতাম, নাকি জানতাম কেউ লিখে ওই অঞ্চলে যেমন বাকি দুনিয়া জানে আনা আমাদের কথা, আমাদের সাহিত্য চর্চার কথা। বর্তমানের কথা। আমরা শুধু একটাই জানি। সেই রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, তার সব অনুবাদ হয়েছে। আর কিছু করার নেই। যা করতে হবে সেটা ব্যবসা। নিজেদের কাজকে দুনিয়ার সামনে তুলে ধরার কিছু নেই। তাই আমরা সব নিচ্ছি। নিজেদের ভাষায় অনুবাদ করছি। কিন্তু ভুলে যাই কিছু নিতে হলে অবশ্যই সাথে কিছু দিতে হয়, অল্প হলেও দিতে হয়। নইলে সেই নেয়াটা আর নেয়া থাকে না, হয় ভিক্ষাবৃত্তি নয়তো চৌর্যবৃত্তি। যা আমরা করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত, ফলে আমাদের চৌর্যবৃত্তি আর ভিক্ষাবৃত্তির স্বভাবই শুধু প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে যেটা ইতিমধ্যে হয়েছে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে, হয়েছে ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে, এখন হচ্ছে জ্ঞান ও সাহিত্য চর্চায়।
সর্বোপরি নিজেদের কাছে নিজেরা ছোট হচ্ছি, কিন্তু আমরা না দেখার ভান করছি এবং এভাবে আরও বড় পরিসরে সমগ্র পৃথিবীর সামনে আমরা ছোট হচ্ছি। আর হচ্ছি নৈতিকতা ও স্ট্যান্ডার্ড বিহীন পাঠে ও পঠনে।

[এডিটরস নোটঃ নাগরিক কথা সেকশনে প্রকাশিত এই লেখাটিতে লেখক তার নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে তার অভিমত প্রকাশ করেছেন। নিয়ন আলোয় শুধুমাত্র লেখকের মতপ্রকাশের একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফরমের ভূমিকা পালন করেছে। কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির সম্মানহানি এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আপনার আশেপাশে ঘটে চলা কোন অসঙ্গতির কথা তুলে ধরতে চান সবার কাছে? আমাদের ইমেইল করুন neonaloymag@gmail.com অ্যাড্রেসে।]

Most Popular

To Top