ক্ষমতা

সিরিয়াঃ এক রক্তনদী

সিরিয়া

সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের ১০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত সরকার বিরোধী বিদ্রোহীদের সবচেয়ে দৃঢ় দূর্গ ‘পূর্ব ঘৌতা’ এলাকা। ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সরকারি বাহিনী ও তাদের মিত্র রুশ বাহিনীর নিরবিচ্ছিন্ন বোমা হামলায় সেখানে এ পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে কয়েক হাজার। যার মধ্যে রয়েছে অসংখ্য নারী ও শিশু। ১০৪ বর্গকিলোমিটারের পূর্ব ঘুটা অঞ্চলে চার লাখ মানুষের বসবাস। নাগরিকদের অর্ধেকের বয়স ১৮ বছরের নিচে। সিরিয়া সরকারের এই হামলায় এসব মানুষ আটকা পড়েছে সেখানে।

রাজধানীর খুব কাছাকাছি হওয়ায় এই জেলা সিরিয়া সরকারের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। পূর্ব ঘৌতা এলাকায় যে বিদ্রোহীরা অবস্থান করছে তারা মূলত কয়েকটি ভাগে বিভক্ত। কয়েকটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী মিলিয়ে একটি জোট ‘হায়াত তাহরির আল শামস’। এদের উপস্থিতির কারণেই সিরিয় সরকার সেখানে হামলা চালাচ্ছে। বিদ্রোহী মুক্ত করে সেখানে সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাই মূল উদ্দেশ্য। ২০১৩ সাল থেকে পূর্ব ঘুটা জেলা সিরিয়ার সরকারের অবরোধের অধীনে ছিলো। ২০১৭ সালে তুরস্ক, রাশিয়া ও ইরান পূর্ব ঘুটাকে “ডি-এসক্লেশন জোন” নামে অবহিত করে।

সিরিয়া

এভাবেই ধ্বংস হচ্ছে শহরের পর শহর

মার্চে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ ৮ বছরে পা দিবে। গৃহযুদ্ধ হিসেবে শুরু হওয়া সিরিয়ার এই লড়াই এখন গৃহযুদ্ধ ছাপিয়ে একটা প্রক্সি যুদ্ধ হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী আই এসের বিরুদ্ধে লড়াই করছিলো সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ সরকার। তাকে সমর্থন দিচ্ছে রাশিয়া ও ইরান। পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্র আইএস দমনে সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ চালাচ্ছিলো এই সিরিয়াতেই। আবার সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্স বা এসডিএফ একই সময়ে লড়াই করছিলো আই এসের বিরুদ্ধে। এদের সমর্থনে আছে আমেরিকা ও ইসরায়েল এবং একাধিক ন্যাটো দেশ। আবার, এসডিএফ চায় সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করতে।
তাহলে ঘটনা দাঁড়াচ্ছে এসডিএফের সাথে আছে মার্কিনি ও তার মিত্র পক্ষ, যারা চায় প্রেসিডেন্ট আসাদ ক্ষমতায় না থাকুক। এদিকে, আসাদের সাথে রাশিয়া ও ইরান, রাশিয়া চায় আসাদ সরকারের মাধ্যমে সিরিয়ায় তাদের প্রভাব বজায় থাকুক। মানে হলো রাজায় রাজায় যুদ্ধ। একে তাই গৃহযুদ্ধ না বলে প্রক্সি যুদ্ধ বলাই সমীচীন। ধারণা করা হচ্ছে খুব তাড়াতাড়ি সিরিয়াকে মাঝখানে রেখে এই প্রক্সি লড়াই পরাশক্তি দেশগুলোর মধ্যে সরাসরি লড়াইয়ে পরিণত হতে পারে।

পূর্ব ঘৌতায় বিদ্রোহীদের ঠেকাতে আসাদ সরকার নির্দয়ভাবে বিমান থেকে বোমা হামলা চালাচ্ছে। এই হামলা থেকে বসতবাড়ি, শপিংমল, হাসপাতাল কিছুই রক্ষা পাচ্ছে না। যাতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে বেসামরিক লোক। ঘৌতা অঞ্চলের দুমা শহর এই হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। সেখানে খাবার ও পানীয় ফুরিয়ে গেছে, নতুন করে কোন ত্রাণও যাচ্ছে না।
এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের অভিযোগ, ঘৌতায় বোমা হামলা চালিয়ে, শহরের ভেতরে ছয়টি হাসপাতাল ও চিকিৎসা কেন্দ্র ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।

সিরিয়ার মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা ডব্লিউটিও বলছে, সোমবার সকাল পর্যন্ত ৫৬১ বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে। সিরিয়ার আনাদোলুর সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, গত তিন মাসে ১৮৫ জন শিশু ও ১০৯ জন নারী নিহত হয়। আর, সিরিয়ার সরকারী কর্মকর্তারা বলছেন “সন্ত্রাসীরা” মানব ঢাল হিসেবে বেসামরিকদের ব্যবহার করছে।

সিরিয়া

এভাবেই লাশের স্তূপ হয় প্রতিদিন

এছাড়া, এই হামলায় আসাদ সরকার রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। সিরিয়ার বেসামরিক প্রতিরক্ষা রক্ষী বাহিনী বলছে যে, পূর্ব ঘৌতাতে সরকারি হামলায় নিহত ব্যক্তিদের দেহে “বিষাক্ত ক্লোরিন গ্যাসের সংস্পর্শে সামঞ্জস্যপূর্ণ” লক্ষণ দেখা গেছে। আহতদের চিকিৎসা করা চিকিৎসকরাও দাবি করেছেন ক্লোরিন গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়ার কথা। যদিও রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের কথা অস্বীকার করছে আসাদ সরকার।
জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তেনিও গুতেরেস পূর্ব ঘৌতার এমন পরিস্থিতিকে পৃথিবীর মাঝে এক নরক বলে অবিহিত করছেন।

এই অবস্থায় সেখানে ত্রাণ ও ওষুধ সরবরাহ করতে এবং বেসামরিক লোকদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে ২৫ ফেব্রুয়ারি, শনিবার, জাতিসংঘ ৩০ দিনের যুদ্ধ বিরতি ঘোষণা করে। নিরাপত্তা পরিষদে শনিবার যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাসের পরও সেখানে হামলা চালায় আসাদ বাহিনী। অবশেষে আসাদ সরকারের অন্যতম মিত্র রাশিয়া সিরিয়ার পূর্ব ঘৌতায় দিনে পাঁচ ঘণ্টা যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছে। ২৭ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার থেকেই তা কার্যকরের কথাও বলেছে রাশিয়া। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত অস্ত্রবিরতি চলাকালীন সময়ে বেসামরিক লোকদের নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়া হবে জানিয়েছে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।

 

Most Popular

To Top