টুকিটাকি

নক্ষত্রের আদ্যোপান্ত

নক্ষত্রের আদ্যোপান্ত

চিরকালই এই বিস্তীর্ণ আকাশের প্রতি মানুষের অদম্য আকর্ষণ ছিল, গম্বুজের মতো আকাশ নামধারী ছাদটা আসলে কি? কি আছে এতে? এর সীমা কতটুকু? আকাশের ওই উজ্জ্বল বস্তু গুলো আসলে কি? রাত হলেই কেন এদের দেখতে পাওয়া যায়? মিটিমিটি করে জ্বলতে থাকা উজ্জ্বল ঐ তারাগুলোর সংখ্যা আসলে কত? আবার আকাশের বুক চিরে ছুটে চলা ওই উজ্জ্বল বস্তু গুলোই বা কি? তারপর এইসব অদম্য কৌতূহল নিবারনের প্রেক্ষিতেই মানুষ আবিষ্কার করেছে তারামণ্ডল, উল্কা বৃষ্টি, নেবুলা, গ্রহ, গ্রহানুপুঞ্জ, আকাশগঙ্গা।

টিমটিম করে জ্বলতে থাকা সেসব নক্ষত্রের জীবন কাহিনী নিয়েই আজকের এই আয়োজন।

একটি তারার উজ্জ্বলতা পরিমাপের একক হল তার ম্যাগনিচিউড (magnitude) বা আপেক্ষিক উজ্জ্বলতা।জ্যোতির্বিদগণ এই magnitude পরিমাপের জন্য একটি স্কেল প্রণয়ন করেছেন। এই হিসেবে একটি তারা যত বেশি উজ্জ্বল হবে তার magnitude তত কম হবে অপরদিকে অপেক্ষাকৃত কম উজ্জ্বল তারা গুলোর magnitude বেশি হবে। এই স্কেলের প্রতিটি পূর্ণ সংখ্যা তার পূর্ববর্তী সংখ্যা থেকে ২.৫ গুন কম উজ্জলতর নির্দেশ করে। রাতের আকাশে সবচেয়ে উজ্জলতম নক্ষত্র হল সিরিয়াস বা লুব্ধক, যার আপেক্ষিক উজ্জ্বলতা -১.৪৬। যেসব নক্ষেত্রের আপেক্ষিক উজ্জ্বলতা ৮ বা তার থেকেও বেশি সেগুলো এতোই ক্ষীণ যে খালি চোখে দেখা যায় না। তারাগুলোকে তাদের বর্ণ অনুসারে চিহ্নিত করা হয় এবং এই বর্ণ তাদের তাপমাত্রা নির্দেশ করে। নক্ষত্র গুলোকে তাদের আলোর তীব্রতা বনাম তাপমাত্রার গ্রাফ অনুসারে ৭ টি ভাগে ভাগ করা হয় এবং তাপমাত্রার নিম্নক্রম অনুসারে এই ভাগ গুলো যথাক্রমে O, B, A, F, G, K & M। এই গ্রাফ নির্দেশ করে কোন বর্ণে কি পরিমাণ আলো নির্গত হয় এবং তাপমাত্রা কত। নিচের চিত্র দেখে সহজেই আমরা এটা বুঝতে পারব।

নক্ষত্রের আদ্যোপান্ত

নক্ষত্রের আদ্যোপান্ত

ছোট বেলায় আমাদের সর্বাধিক পঠিত ছড়া গুলোর মধ্যে একটি হল Twinkel twinkle little star, এই ছড়াটিতে আকাশে মিটিমিটি করে তারা জ্বলার কথা বলা হলেও আদতে তারা বা নক্ষত্র মিটিমিটি করে জলে না। তারা থেকে আগত আলোকরশ্মি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ভেদ করে আমাদের চোখে পৌঁছায়, বায়ুমণ্ডলে ব্যতিচারের ফলে এই আলোকরশ্মির দিক কিছুটা বেকে যায়, তাই পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে মনে হয় তারাগুলো মিটিমিটি করে জ্বলছে।এই কারণেই দিগন্তের কাছে অবস্থিত তারা গুলো দেখে মনে হবে তারা বেশি মিটিমিটি করে জ্বলছে।

এবার আসা যাক তারার জন্মকথন নিয়ে। তারা বা নক্ষত্রের জন্ম হয় আন্তনক্ষত্রিক কেন্দ্রীভূত গ্যাসপিণ্ড ও ধূলিকণা থেকে। এদেরকে বলা হয় নেবুলা বা নীহারিকা। মহাবিশ্বের অপার্থিব কিছু সৌন্দর্যের মধ্যে নীহারিকা অন্যতম। কিছু উল্লেখযোগ্য নেবুলার নাম, যেমনঃ ক্র্যাব নেবুলা, ঈগল নেবুলা, ক্যাট’স আই নেবুলা, অরিয়ন (কালপুরুষ) নেবুলা ইত্যাদি। একটি তারা যখন জন্ম নেয়, তখন যে উপাদানগুলোর প্রয়োজন পড়ে, তারার মৃত্যুর সময়ও সেই একই উপাদান গুলোই ছড়িয়ে পড়ে। আর এই উপাদান গুলো নীহারিকাতেই থাকে। এভাবেই নীহারিকাতে তারার জন্ম নীহারিকাতেই তারার মৃত্যু।

নক্ষত্রের আদ্যোপান্ত

নেবুলা থেকে ব্ল্যাক হোল পর্যন্ত নক্ষত্রের বিভিন্ন ধাপ

এবার আসল কথায় আসা যাক, আন্তনক্ষত্রিক এই গ্যাস বা নীহারিকা এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু গ্যাসের কণা গুলো মধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে পরস্পরের সংস্পর্শে আসে এবং এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ানো গ্যাস গুলোকে একস্থানে জড়ো/কেন্দ্রীভূত/ঘনীভূত করে। মধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে কেন্দ্রীভূত এই গ্যাস গুলোর কেন্দ্রের তাপমাত্রা বেড়ে যায় এবং প্রায় কয়েক মিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছায়! তাপমাত্রা বৃদ্ধির এ পর্যায়ে গ্যাসপিন্ডটি থেকে বিকিরিত শক্তির পরিমাণ বেড়ে যায়, ফলশ্রুতিতে এ থেকে অবলোহিত আলো (infra red light) নিগর্ত হয়। এই তাপমাত্রায় নিউক্লিয়ার ফিউশন শুরু হয়, তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। কোন ধাতব বস্তুর তাপমাত্রা যত বাড়ানো হয়, এটি তত দ্যুতি ছড়াতে শুরু করে, নক্ষত্র গুলোও ঠিক তেমনি।

প্রকৃতপক্ষে এরকম নেবুলা বা গ্যাসপিন্ড থেকে একটিমাত্র তারা উৎপন্ন হয়না। বরং শত শত তারা সৃষ্টি হয় এবং এদের সমন্বয়ে একটি নক্ষত্রপুঞ্জের সৃষ্টি হয়। সময় যতই বাড়তে থাকতো ততই নক্ষত্রপুঞ্জের আকার এবং এর তারা গুলোর মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকতো এবং একসময় তারাগুলো একে অপর থেকে দূরে দূরে সরে যায়। এভাবেই জন্ম হয় এক একটি তারার।

নক্ষত্রের আদ্যোপান্ত

 

একটি নক্ষত্র হলো বিশাল আকারের পারমাণবিক চুল্লী। এতে অনবরত ফিউশন (পারমাণবিক বিক্রিয়া) চলে, এই ফিউশন বিক্রিয়ার ফলে হাইড্রোজেন, হিলিয়াম গ্যাসে পরিণত হয় এবং সেই সাথে শক্তি উৎপন্ন হয়। এই শক্তিই নক্ষত্রের জ্বালানী যোগায়। আমরা জানি হাইড্রোজেনের তিনটি আইসোটোপের মধ্যে দুটি উল্লেখযোগ্য হল ডিউটেরিয়াম এবং ট্রিটিয়াম। এদের নিউক্লিয়াসে যথাক্রমে ১টি এবং ২টি নিউট্রন থাকে। নক্ষত্রে ফিউশন বিক্রিয়ার সময় যখন ডিউটেরিয়াম এবং ট্রিটিয়াম এর মধ্যে সংঘর্ষ হয় তখন তা থেকে একটি হিলিয়াম পরমাণু এবং একটি নিউট্রন গঠিত হয়, সেই সাথে প্রচুর পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়। এইখানে একটি মজার ব্যাপার ঘটে, আমরা জানি একটি হাইড্রোজেন পরমাণুর ভর ১.০০৭৯৭ AMU(Atomic Mass Unit)। ফলে চারটি হাইড্রোজেন পরমাণুর ভর হবে ৪.০৩১৮৮ AMU। অথচ একটি হিলিয়াম পরমাণুর ভর ৪.০০২৬ AMU. তাহলে বাকি ভরে কোথায় গেল!!! অতিরিক্ত এই ০.০২৯২৮ AMU ভর সম্পূর্ণ শক্তিতে পরিণত হয়।

নক্ষত্রের আদ্যোপান্ত neonaloy

হাইড্রোজেনের ফিউশন

তারার মধ্যকার হাইড্রোজেন জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে তার মৃত্যু ঘটে। মৃত্যু প্রক্রিয়াটি তারার ভরের উপর নির্ভর করে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়ে থাকে। অর্থাৎ মৃত্যুকালীন প্রক্রিয়ায় তারাটিকে আরও কয়েকটি ধাপ পার করতে হয়।প্রতিটি ধাপে তার পূর্বের ধাপের তুলনায় ভারী মৌলের পরিমাণ বেশি থাকে।

একসময় যখন নক্ষত্রের হাইড্রোজেন ভাণ্ডার নিঃশেষ হয়ে আসে, এরপর হিলিয়ামের ফিউশন শুরু হয় এবং অক্সিজেন ও কার্বনে রুপান্তরিত হতে শুরু করে এবং নক্ষত্রের বহিস্তর প্রসারিত হতে শুরু করে। আর এইখান থেকেই শুরু হয় শেষের(মৃত্যু) শুরু পর্যায়।

এদিকে হিলিয়ামের এই ফিসন ততক্ষণ চলতে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত কার্বন এবং অক্সিজেন থেকে নিয়ন, সোডিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, সালফার এবং সিলিকনের রূপান্তর ঘটবে। পরিশেষে এই উপাদান গুলো আবার নিউক্লিয়ার রিঅ্যাকশন এর মাধ্যমে নক্ষত্রের আয়রন কোর (অভ্যন্তর ভাগ) গঠন করবে। সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি যে প্রতি ধাপে ভারি মৌলের উদ্ভব হচ্ছে। এরপর আর নিউক্লিয়ার রিঅ্যাকশন সম্ভব হয় না কারণ আয়রনের ফিউশনের জন্য অতি উচ্চ তাপমাত্রার প্রয়োজন।

নক্ষত্রের আদ্যোপান্ত neonaloy

ফিউশনের বিভিন্ন ধাপে প্রাপ্ত ভারি মৌল

এবার তারার জীবনচক্রে চলে আসি। মহাকর্ষীয় বল বা কোন সুপারনোভা বিস্ফোরণ এর সময় সৃষ্ট শক ওয়েভের ফলে আন্তর্নক্ষত্রিক গ্যাস(নীহারিকা) গুলো পরস্পরের সংস্পর্শে আসে এবং খুব ধ্রুত কেন্দ্রের দিকে ঘনীভূত হতে শুরু করে সেই সাথে ক্রমান্বয়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। এই অবস্থাকে বলা হয় Protostar বা ভ্রূণ তারা ধাপ। এই ধাপ থেকে একসময় নিউক্লিয়ার চেইন বিক্রিয়া শুরু হয়। আর এইখান থেকেই শুরু হয় মেইন সিকোয়েন্স বা স্থিতিশীল ধাপ। এই স্থিতিশীল ধাপেই একটি নক্ষত্র সবচেয়ে বেশি সময় অবস্থান করে। সূর্য বর্তমানে এই মাঝারি ধাপে রয়েছে।

সাধারনত একটি তারার আয়ুস্কাল নির্ভর করে তার আকারের উপর। বৃহৎ আকৃতির তারাগুলো তাদের জ্বালানী অপেক্ষাকৃত মাঝারি আকৃতির তারার আগেই শেষ করে ফেলে। এর ফলে বৃহৎ আকৃতির তারাগুলোর স্থিতিশীল ধাপ প্রায় কয়েক লক্ষ বছরের মতো স্থায়ী হয়, অপরদিকে অপেক্ষাকৃত ছোট আকৃতির তারাগুলোর ক্ষেত্রে সেটা হতে পারে বিলিয়ন বছর বা তারও বেশি। এর কারণ তারকার ভর যত বেশী হয় মহাকর্ষীয় আকর্ষণের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার জন্য তারকাটিকে তত বেশী উত্তপ্ত হতে হয়।

এরপর সময়ের সাথে সাথে নক্ষত্রের জ্বালানী শেষ হতে শুরু করে, নক্ষত্রের বহির্ভাগের প্রসারণ শুরু হয় আর এইখান থেকে শুরু হয় রেড জায়ান্ট বা রক্তিম দৈত্য ধাপ। এই পর্যায়ে তারার ঔজ্জ্বল্য বেড়ে যায় বহুগুণ।বৃহদাকৃতির নক্ষত্রের এই ধাপকে বলা হয় রেড জায়ান্ট। এই ধাপ থেকেই হিলিয়ামের ফিউশন শুরু হয়। কালপুরুষ মণ্ডলের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র আর্দ্রা বা Betelgeuse এখন এই ধাপে রয়েছে।

এরপর আসে White Dwarf  বা সাদা বামন ধাপ। রক্তিম দানব ধাপ অতিক্রম করার পর যেসব নক্ষত্র তাদের যৎসামান্য জীবনীশক্তি নিয়ে ধুকতে ধুকতে বেঁচে থাকে সেখান থেকে সাদা বামন ধাপ শুরু হয়। সম্পূর্ণ জ্বালানী নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার পর মৃতপ্রায় নক্ষত্রের বহিঃস্থ গ্যাসীয় স্তর ফুলতে ফুলতে এক সময় মহাশূন্যে বিলীন হয়ে যাবে অর্থাৎ সুপারনোভা ঘটবে। নিউক্লিয়ার ফিউশন যেহেতু বন্ধ হয়ে গেছে। এখন শুরু হবে তারার নিজস্ব গ্রাভিটির কারণে কেন্দ্রের সংকোচন ও বহিস্তরের বহির্মুখী প্রসারণ। এখন যেহেতু নক্ষত্রের বহিস্তর ক্রমান্বয়ে প্রসারণশীল, ফলে এক সময় শকওয়েভ (একটি তরঙ্গ যখন শব্দ তরঙ্গের থেকে বেশি বেগে গতিশীল হয় তখন শকওয়েভের সৃষ্টি হয়) এর সৃষ্টি হবে এবং বিস্ফোরণ ঘটবে। একটি প্রসারণশীল বেলুন যেমন একসময় ফেটে যায়, নক্ষত্রের বহিস্তরও তেমনিভাবে বিস্ফোরণের মাধ্যমে ছড়িয়ে পরে। এই অবস্থাকে বলা হয় সুপারনোভা বিস্ফোরণ।একটি সুপারনোভার বিস্ফোরণ এতো শক্তিশালী হয় যে, এটি একটি পুরো গ্যালাক্সিকে আলোকিত করতে পারে।

এরপর গ্যাসীয় স্তরের অবশিষ্ট যা থাকে তা মিলে তৈরি করে একটি প্ল্যানেটারি নেবুলা। আর ভেতরের কেন্দ্র যেটা মহাকর্ষের চাপে ঘনীভূত হতে থাকে। এই কেন্দ্রীভূত হওয়া পরিমাণ এতো বেশি হয় যে এ অবস্থায় নক্ষত্রের আকার হয় পৃথিবীর মতো আর ভর হয় সূর্যের সমান, অর্থাৎ ঘনত্ব হিসেব করলে হয় প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে কয়েকশ টন। অতঃপর এই কেন্দ্র অসীম শূন্যে ধীরে ধীরে তাপ বিকিরণ করে একসময় কালো বামন ধাপে পরিণত হয়।

এখন সুপারনোভা বিস্ফোরণের পর নক্ষত্রের যা কিছু অবশিষ্ট থাকবে তার ভর যদি সৌরভরের ১.৪ গুন এর বেশি হয় তবে নক্ষত্রটি ধ্বসে (সুপারনোভা) পড়বে এবং নিউট্রন স্টার নামক ধাপের যাত্রা শুরু করবে। এই নিউট্রন দশা হল তারার সবচেয়ে সংকুচিত/ঘনীভূত অবস্থা। কেমন সংকুচিত অবস্থা সেটা বুঝানোর জন্য একটি উদাহরন দেই, ধরুন এর ব্যাসার্ধ যদি হয় ১০ কি.মি.তবে এর ভর হবে সৌরভরের দ্বিগুণ।এ অবস্থায় ইলেকট্রন ও প্রোটন গুলো সন্নিবেশিত হয়ে নিউট্রনের ঘন পুঞ্জিভূত আবরণ তৈরি করে। নিউট্রন স্টারের চৌম্বক ক্ষেত্র পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের তুলনায় ১ ট্রিলিয়ন গুন শক্তিশালী হয়। এই শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের কারণে নিউট্রন স্টারের উত্তর ও দক্ষিণ মেরু থেকে শক্তিশালী রেডিও তরঙ্গের সাথে রেডিও একটিভ কণা নির্গত হয়।

এখানে একটু বলে রাখি যে একটি নক্ষত্রের ভর যদি সৌরভরের ১.৪ গুনের কম হয় তবে তা আজীবন সাদা বামন ধাপেই থেকে যায়। এই লিমিটকে/সীমাকে বলা হয় চন্দ্রশেখর লিমিট। বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রমন এই মতবাদ ব্যক্ত করেন। আর নক্ষত্রের ভর যদি চন্দ্রশেখর লিমিট ক্রস করে তবেই কেবল তার জীবনে সেই অন্তিম মুহূর্ত সুপারনোভা আসবে।

এবার আসা যাক ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণ বিবর নিয়ে। সুপারনোভার পর অবশিষ্ট নক্ষত্রের ভর যদি সৌর ভরের ৩ গুণের বেশি হয় তবে তা সম্পূর্ণরুপে ধ্বসে পড়ে আর অসীম শূন্য থেকে চিরতরে এর অস্তিত্ব বিলিন হয়ে যায়।কিন্তু রেখে যায় এমন একটি জায়গা, যার রহস্য বিজ্ঞানীরা আজও ভেদ করতে পারেননি। এই ব্ল্যাকহোলের আয়তন সসীম কিন্তু ভর প্রায় অসীম, এ কারণে ঘনত্ব, অভিকর্ষ ত্বরণ, স্কেপ ভেলোসিটি বা মুক্তিবেগ ইত্যাদিও প্রায় অসীম। কৃষ্ণ বিবরের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ এতোই বেশি যে কোন বস্তু এর মধ্যে প্রবেশ করলে বা নাগালের মধ্যে আসলে এর অসীম গ্রাভিটির কারণে আর বাইরে আসতে পারেনা। এমনকি আলোর কণা ফোটন ও এই আকর্ষণ থেকে মুক্ত হতে পারে না। কৃষ্ণ বিবর থেকে নির্গত কোন প্রকার ফোটন বা আলোক রশ্মি বেশি দূর যাওয়ার আগেই কৃষ্ণ বিবরের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ তাকে টেনে পেছনে নিয়ে আসবে। ব্ল্যাক হোলের মুক্তিবেগ (কোন কিছু গ্রাভিটেশনাল আকর্ষণ বল অতিক্রম করতে নুন্যতম যে বেগ অর্জন করতে হয়) আলোর বেগের থেকে বেশি হওয়ার কারণে এমনটা হয়। এখন আমি ব্ল্যাক হোল এর ইফেক্ট বোঝার জন্য আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা নীতির একটি বিষয় অবতারণা করবো-

“সময় উচ্চতর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে আরও বেশি ধীরেলয়ের হয় অর্থাৎ কোন ভারী মহাকর্ষ ক্ষেত্র আলোর কম্পাঙ্ককে মন্থর করে দেয়।“

তাই বলা যায় ব্ল্যাক হোলের কাছাকাছি সময়কে নিশ্চল বলে মনে হবে। ব্ল্যাক হোলের আশেপাশে যা অঞ্চল জুড়ে এর প্রভাব বজায় থাকে তাকে ওই ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্ত বা Event Horizon বলা হয়। এখন আপনি যদি ঘটনা দিগন্তের বাইরে থেকে ঘটনা দিগন্তের মধ্যে অবস্থানকারী একটি স্পেসসিপকে পর্যবেক্ষণ করেন তাহলে দেখবেন যে স্পেসসিপের ব্ল্যাক হোলের অতলে হারিয়ে যাবার আগ পর্যন্ত এটি খুব ধীরে ধীরে চলছে বলে মনে হবে।বিজ্ঞানীরা ধারনা করেন আমাদের ছায়াপথের কেন্দ্রে এরকম ব্ল্যাক হোল আছে। যার নাম Sagittarius A*

এবার একটি ব্যর্থ তারার গল্প শোনা যাক। ভ্রূণ তারা বা Protostar ধাপে আমরা জেনেছি যে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ভর অর্জন করার পর তারায় নিউক্লিয়ার ফিউশন শুরু হয়, যাকে বলা হয় ক্রিটিক্যাল ম্যাস। কিন্তু কিছু কিছু ভ্রূণ তারা নিউক্লিয়ার ফিউশনের জন্য প্রয়োজনীয় ক্রিটিক্যাল ম্যাস অর্জন করতে সক্ষম হয় না। এর প্রকৃতি ডার্ক ম্যাটার বা কৃষ্ণ বস্তুর মতই।
যখন একটি ভ্রূণ তারার ভর সৌর ভরের ১/১০ অংশের সমান হয় তখন এটি শুধুমাত্র জ্বলতে জ্বলতে এর জ্বালানী নিঃশেষ করে ফেলে, এরপর যা অবশিষ্ট থাকে তাই হল বাদামি বামন। এরা আকারে একটি গ্রহের থেকে বড় হতে পারে কিন্তু একটি নক্ষেত্রের থেকে নয়। এরা কোন তাপ বা আলো নিঃসরণ করে না। আর এটাই হল ব্যর্থ তারা।

নক্ষত্রের আদ্যোপান্ত

তারার জীবন চক্র

অনেক বকেছি আজ আর বেশি কিছু বলব না, শুধু এই টুকুই বলবো যে আজ হতে ৫০০ কোটি বছর পর, যখন আমাদের সূর্য লাল অতি দানব তারায় পরিণত হবে, তখন পৃথিবীসহ নিকটস্থ গ্রহসমূহকে এর গ্রাভিটির জন্য গ্রাস করতে শুরু করবে এবং একসময় শ্বেত বামনে পরিণত হবে। আর তখন পৃথিবী নামের কোন এক গ্রহ যে ছিল সেটা হয়তো কেউ জানতেই পারবে না!

তথ্যসূত্রঃ

লিখেছেনঃ Md.Zubayed Hossain Shourov

Most Popular

To Top