টুকিটাকি

কম খরচে দেশেই হোক কিডনি প্রতিস্থাপন

দেশেই কিডনি চিকিৎসা

দেশে প্রায় দুই কোটি মানুষ কোন না কোন কিডনি সমস্যায় আক্রান্ত। আর প্রতিবছর ৩০ থেকে ৪০ হাজার মানুষের কিডনি স্থায়ীভাবে অকার্যকর হচ্ছে। এ অবস্থায় রোগীর চিকিৎসা পদ্ধতি কেবল ডায়ালাইসিস, আর তাতেও যখন আর কোন কাজ হয় না তখন কিডনি প্রতিস্থাপনই একমাত্র উপায়।

কিডনি রোগে যারা আক্রান্ত হন, তারা শুধু নিজেরাই কষ্ট পান না, চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে রোগীর পরিবারকেও তীব্র সমস্যায় পড়তে হয়। কিডনি রোগে আক্রান্তদের বেশিরভাগই উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে ভোগেন। এ ক্ষেত্রে যেমন খুব সতর্কতার সাথে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয় তেমনি চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়ে।

কিডনি প্রতিস্থাপন বা সংযোজন চিকিৎসা অনেক ব্যয়বহুল। এ চিকিৎসার জন্য সামর্থবানরা বেশিরভাগই দেশের বাইরে চলে যান। আবার ভিটে মাটি বিক্রি করে অনেক স্বল্পবিত্ত মানুষকেও দেশের বাইরে যাওয়ার কথা প্রায়ই শোনা যায়। দেশের বাইরে এই অস্ত্রোপচার অনেক ব্যয়বহুল, প্রতিবেশী দেশ ভারতেও এই চিকিৎসা করাতে ২০ থেকে ২৫ লক্ষ টাকা খরচ হয়।

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কিডনি স্থায়ী অকার্যকর হলে প্রতিস্থাপন বা সংযোজনই শেষ কথা নয়। অস্ত্রোপচারের পর সারাজীবন এই রোগীদের ফলোআপ চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয়, নইলে আবারো কিডনি অকার্যকর বা মারাত্মক জটিলতায় ভুগতে হয়।

আশার কথা হলো এখন দেশেই পাওয়া যাচ্ছে কিডনি প্রতিস্থাপন চিকিৎসা। দেশের দু’তিনটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে কিডনির এ চিকিৎসা করা হচ্ছে সফলভাবে। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম। সবচেয়ে জরুরী যে বিষয়টি জানা প্রয়োজন তা হলো, দেশের অন্য যে কোন হাসপাতালের চেয়ে বিএসএমএমইউতে কম খরচে করা হচ্ছে এ চিকিৎসা।

১ লক্ষ ৬০ হাজার টাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে করা হয় কিডনি প্রতিস্থাপন। প্যাকেজ মূল্য হিসেবে এই খরচ নিচ্ছে সরকারি এ বিশ্ববিদ্যালয়। এই প্যাকেজের মধ্যে আছে দুজনের অস্ত্রোপচার খরচ (রোগী ও ডোনার), বেড ভাড়া এবং ওষুধ খরচ। এর বাইরে রোগী ও কিডনি দাতার (ডোনার) অস্ত্রোপচার পূর্ববর্তী বেশ কিছু জটিল পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য আরো লাখখানেক টাকা ব্যয় হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে পরীক্ষা নিরীক্ষার খরচ প্রায় দেড় লাখ টাকা লেগে যায়। এ সব মিলিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে কিডনি প্রতিস্থাপন তিন থেকে সাড়ে তিন লক্ষ টাকা ব্যয় করতে হয় একজন রোগীর জন্য। এ খরচ দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন। দেশের বাইরে অন্য যেকোন দেশের চাইতে অনেক কম।

একটি বিষয় মনের মধ্যে ঘুরপাক খায়, তা হলো চিকিৎসার মান কেমন? এ নিয়ে একেবারেই নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। উন্নত দেশের মতোই এই মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে কিডনি প্রতিস্থাপন চিকিৎসা করা হচ্ছে মান সম্পন্নভাবে। বর্তমানে এখানে সপ্তাহে একটি অস্ত্রোপচারের সক্ষমতা রয়েছে। উদ্বোধনের অপেক্ষায় আছে আরো দুটি মডিউলার ওটি। এগুলো চালু হলে সপ্তাহে তিনটি করে কিডনি সংযোজন বা প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হবে বিএসএমএমইউ’র কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট বিভাগের। কিডনি প্রতিস্থাপন হয়েছে এমন রোগীকে পরবর্তী ফলোআপ চিকিৎসারও খুব ভালো ব্যবস্থা আছে এ হাসপাতালে। এক্ষেত্রেও বিনামূল্যেই দেয়া হচ্ছে ফলোআপ চিকিৎসা সেবা।

১৯৮৮ সালে প্রথম কিডনি প্রতিস্থাপন অস্ত্রোপচার করা এই হাসপাতালে (তৎকালীন পিজি হাসপাতাল)। সেসময় পরীক্ষামূলকভাবে এখানে শুরু হয়েছিলো এই চিকিৎসা সেবা। এখন পর্যন্ত ৫১৭ জনের কিডনি সফলভাবে সংযোজন বা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে এখানে। তাই, বিদেশে না গিয়ে দেশেই কম খরচে কিডনি সংযোজন চিকিৎসা করাতে পারেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে।

কারা কিডনি দান করতে পারবেন কিডনি দান বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী খুব জটিল একটি বিষয় ছিলো এতদিন। ১৯৯৯ সালের আইন আনুযায়ী রোগীকে শুধুমাত্র তার বাবা, মা, ভাই, বোন ও সন্তান কিডনি দান করতে পারতেন। এতে বেশিরভাগ সময়ই কিডনি পাওয়া নিয়ে সমস্যায় পড়তে হতো রোগীদের। তাই তারা আশ্রয় নিতেন বেআইনি কোন পথের। কেননা অনেক সময়ই তাদের সাথে হয়তো কোন অর্গান মিলতো না, তখন আইনে না থাকায় যে কারো কাছ থেকে কিডনি নেয়া (কিনে নিতে) সম্ভব ছিলো না। তাই বাধ্য হয়ে অনেককে ডোনারসহ চলে যেতে হতো দেশের বাইরে। এতে খরচও হয় আস্বাভাবিক বেশি। আইনের এই মারপ্যাচে পড়ে অনেকেই এই ব্যয়বহুল চিকিৎসা করাতে না পেরে মৃত্যুবরণ করতেন।

চিকিৎসকদের দীর্ঘদিনের আবেদনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১৯৯৯ সালের এই আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। ২০১৭ সালে সংসদে পাশ হয় নতুন আইন। এতে, কিডনি দাতার তালিকায় যোগ হয় সব ধরনের কাজিন, দাদা, দাদী, নানা, নানী ও নাতি নাতনিরা। এবং কেউ যদি মরণোত্তর কিডনি দান করতে চান তাহলে এটা করা যাবে বলে আইনে বলা হয়েছে। নতুন এ আইনকে দেশের চিকিৎসকরা স্বাগত জানালেও আরো কয়েক প্রজন্মকে এখানে যোগ করা হলে কিডনি রোগীদের প্রতিস্থাপন চিকিৎসা সহজ হতো বলে মনে করেন তারা।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top