টাকা-কড়ি

উন্নয়ন কই হারালো?

উন্নয়ণ কই হারালো?- নিয়ন আলোয়

এ কে রেড্ডি নামে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন গভর্নর ছিলেন। তিনি একবার বলছিলেন, আমরা সকলেই জানি ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত কিন্তু ভারতে এমনকি অতীতও অনিশ্চিত। এইখানে অতীত বদলানো যায়। তার এহেন মন্তব্যের উদ্দেশ্য ছিলো স্ট্যাটিসটিক্যাল ড্রামাকে এড্রেস করা। থার্ড ওয়ার্ল্ডে এইটা হরহামেশা ঘটে। ২০১৪ সালে নাইজেরিয়া হঠাৎ করে ঘোষণা করছিলো যে, তাদের জিডিপি হইলো পাঁচশ বিলিয়ন ডলার। আরেক মিসকিন দেশ ঘানা তার আগের বছর এইরকম ঘোষণা দিছিলো। ডাটা ম্যানিপুলেইট কইরা আপনি এইরকম করতেই পারেন। যখন কোন একটা লক্ষ্য অর্জন করার জন্য আপনি পরিমাপকটাই বদলে ফেলেন, তখন এই রকম হয়।

চায়নার ইকোনমিক ডাটা নিয়া অনেকের সন্দেহ ছিলো কারন যেই সরকারী সংস্থা ডাটা সরবরাহ করে, তার ইন্সেন্টিভ আছে এইটা বদলে ফেলার। তো, বিশ্লেষকরা তাই অন্য মেজারমেন্ট ঠিক করলেন। তারা ইলেক্ট্রিসিটি কন্সাম্পশন, কার্গো ট্রাফিক এইগুলান দেখা শুরু করলেন কারন জিডিপির সাথে এইগুলার সম্পর্ক সমানুপাতিক। জিডিপি বাড়লে এইগুলাও বাড়ার কথা। চাইনিজ গভর্ন্মেন্ট যখন এইটা টের পায়ে গেলো, তারা খালি এপার্টমেন্টেও লাইট অন করে রাখা শুরু করলো। “গুডহার্ট’স ল” বলে একটা টার্মই আছে ইকোনমিক্সে, যেইখানে একজেক্টলি এই ফেনোমেনাটাকেই সংজ্ঞায়িত করা হয়। আপনি যখন জানেন যে জ্ঞান অর্জন থেকে পরীক্ষার রেজাল্ট বেশী গুরুত্তপূর্ণ, তখন আপনি নোট বই, সাজেশন, নকল এইগুলাই করবেন; জ্ঞান অর্জন তখন সেকেন্ডারী হয়ে পড়বে।

আপনি যদি ক্রিকেট খেলা বোঝেন তাইলে অবশ্যই জানেন যে, ব্যাটিং দল যত রান করে তার সবটাই হইলো বোলিং দলের বোলারদের দেয়া রান এবং এক্সট্রার যোগফল। শ্রীলংকার বোলারদের দেয়া রান এবং তাদের দেয়া এক্সট্রার যোগফল যদি তিনশ হয়, তাইলে বাংলাদেশের পক্ষে এর থেইকা বেশী রান করা সম্ভব না। কিংবা আমি যদি আপনাকে বলি যে, বাংলাদেশের রানরেট হলো ছয় তাইলে আপনি বোঝবেন যে বাংলাদেশ তাইলে তিনশ রান করছে। মোটকথা, ভ্যারিয়েবলগুলা ফাইনাল রেজাল্টকে প্রেডিক্ট করবে, কন্সিসটেন্ট থাকবে, কোন উল্লম্ফন থাকবেনা।

গত ডিসেম্বরে বিডিনিউজের ইংরেজি ভার্সনে ঢাকা ইউনিভার্সিটির একজন অর্থনীতির অধ্যাপকের একটা লেখা ছাপা হয় যেইটার বাংলা করলে শিরোনাম হয়, “অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফলগুলো কোথায় হারাইলো?”। ভদ্রলোকের নাম এম এ তাসলিম। তিনি পরিসংখ্যান ব্যুরো যে ফাঁপানো সংখ্যা প্রকাশ করে, সেইটা দেখিয়ে দিয়েছিলেন। তার কথা ছিলো, ব্যুরো যেই ন্যাশনাল একাউন্টসের ডাটা দেখায় সেইটা মাইক্রো লেভেল ডাটাগুলোর সাথে কম্প্যাটিবল না। সেক্ষেত্রে তিনি “খানা-আয়-জরিপ (HIES 2016)“ যেটা হয় ঐ ডাটার সাহায্য নিয়েছেন। এইটা রেগুলার ডাটা। প্রতিটা হাউজহোল্ডের ইনকাম ও কন্সাম্পশন এইখানে হিসাবে আসছে এবং এগ্রিগেট করলে এই ডাটা ন্যাশনাল একাউন্টসের সাথে কন্সিস্টেন্ট হওয়ার কথা। কিন্তু সেইটা হয় নাই! রানরেটের সাথে টোটাল রান মিলছেনা। আয় বাড়লে ক্যালরি কৌশেন্ট বাড়ার কথা স্বাভাবিকভাবে। ধনীরা বেশী ক্যালরি কঞ্জিউম করে, গরীবেরা কম ক্যালরি কঞ্জিউম করে। ফার্মারস ব্যাংকের উদ্যোক্তা মুনতাসীর মামুনের ক্যালরি কঞ্জাম্পশন একজন এভারেজ ফার্মারের ক্যালরি কঞ্জাম্পশনের থেকে বেশী হবে। ফরহাদ মজহারের ক্যালরি কঞ্জাম্পশন একজন বাউল কিংবা মজলুম মাদ্রাসার ছাত্রের চাইতে বেশী হবে। ন্যাশনাল ইনকাম বাড়লে আমাদের পার পারসন ক্যালরি কৌশেন্টও বাড়ার কথা। বাড়েনাই। ন্যাশনাল ইনকাম বাড়লে মজুরি সূচক বাড়ার কথা, কারন মজুরি হাউজহোল্ড ইনকামের একটা বড় কম্পোনেন্ট। ২০১০ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত প্রকৃত মজুরি বাড়ে নাই, উল্টো এইটা কমেছে। প্রকৃত আয় হিসেব করে মূল্যস্ফীতিকে আমলে নিয়ে, যদি “আয়-খানা-জরিপ ২০১৬” সত্যি হয়, তাইলে আমাদের প্রকৃত আয় এই ছয় বছরে কমেছে, যেইটা সরকারী বয়ানের সাথে সাংঘর্ষিক। তাসলিম সাহেব লেখার শেষে একটা চার্ট দিয়ে দিয়েছেন তুলনা দেখিয়ে।

আমাদের চোখের সামনে আমরা এইখানে গুডহার্ট’স ল কে কাজ করতে দেখছি। বাংলাদেশে যদি গণমাধ্যম গণমুখী হতো, ইউনিভার্সিটিতে স্বাধীন শিক্ষকেরা থাকতেন, তাইলে আমরা বহু আগেই এইরকম লেখাগুলান পাইতাম। পাইনা কারন যাদের পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল হওয়ার কথা তারা কেউ শেখ পরিবার কেউ জিয়া পরিবারের চাটুকারিতা করেন। শুধু জিডিপি না, শিক্ষাক্ষেত্রেও উদাহরন আছে। নুরুল ইসলাম নাহিদ কিছুদিন আগে শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদানের জন্য একটা পুরস্কার পায়েছেন। আমি এইটাতে অবাক হইনাই, কারন তিনি নাম্বারকে দিয়া কথা বলাইতেছেন। পরীক্ষার পাশের হার বাড়ছে, স্কুল বাড়ছে, পোলাপাইন বই পাচ্ছে, দাতারা খুশী।

আমি নিশ্চিত না, কিন্তু আপনি যদি নাইজেরিয়া যান কিংবা ঘানা যান তাহলে হয়তো দেখবেন ঐখানেও এইরকম কেউ আছেন যিনি গণতন্ত্র সাময়িকভাবে স্থগিত করে উন্নয়নের লেবেঞ্চুষ ধরিয়ে দিয়েছেন। তারাও সমানে চুষছে, রস আর পাচ্ছে না। টলস্টয় বলছিলেন যে, “পৃথিবীর সব সুখী পরিবার একরকম, কিন্তু প্রতিটা দুঃখী পরিবার আলাদা”। সেইরকম, কোন একটা দেশের উন্নতির জন্য অনেকগুলো ফ্যাক্টর একসাথে কাজ করার দরকার পড়ে এবং জিও-পলিটিক্যাল, হিস্টরিক্যাল কারনে একেকদেশের পথ ও আলাদা হতে পারে; কিন্তু তলানিতে যাওয়ার যাত্রা সব দেশেই সেইম। প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করো, শিক্ষায় প্রতারনাকে পুরস্কৃত কর, মিডিয়াকে বশংবদ বানাও, তরুণদের অরাজনৈতিক করো আর তাদের একজন প্রতিপক্ষ দাও ঘেন্না করার মত, ব্যাস। এটুকুই এনাফ। বাকিটা তারাই করবে।

লিখেছেনঃ এ. টি. এম. গোলাম কিবরিয়া

Most Popular

To Top