ইতিহাস

রক্তাক্ত “কাবা শরীফ”

১৯৭৯ সালের ২০নভেম্বর, ভোর ৫টা। হজের শেষ দিন। গ্র্যান্ড মসজিদের ইমাম শেখ মোহাম্মাদ আল-সুবায়েল ৫০,০০০ মুসল্লি নিয়ে প্রস্তুত হচ্ছিলেন ফজরের নামাজের জন্য। কিছুদিন আগে ১৮ মিলিয়ন ইউএস ডলারে সংস্কার করা কাবার সম্মুখে ৭ একর মার্বেল পাথরে বাঁধানো কাবা শরীফ প্রাঙ্গনে কাতার ঠিক করছিলেন হাজীগণ। ইকামত শুরুর ঠিক আগে কিছু মানুষ কাঁধে কফিন নিয়ে প্রবেশ করলো মসজিদের প্রাঙ্গণে। বিশেষ নেকি পাওয়ার জন্য মৃত মুসলিমকে প্রায়ই কাবা শরীফে নিয়ে আসে মৃতের আত্মীয়স্বজন। কাতারে দাঁড়ানো হাজিদের ঠেলে খুব সহজেই সম্মুখে চলে গেল তারা কফিন নিয়ে। ইমামের পাশে কফিন রেখে দাঁড়ালো মানুষগুলো। তারপর কফিন থেকে মেশিনগান বের করে খোলা আকাশে গুলি করতে লাগলো আর থেকে থেকে চিৎকার করতে লাগল- “মিসাইয়াহ্’র আগমন ঘটেছে”,“মিসাইয়াহ্’র আগমন ঘটেছে”।

 

গ্র্যান্ড মসজিদে হামলা

হামলার পর মসজিদের ভেতর থেকে ধোয়া বের হচ্ছে

এভাবেই সেদিন ইসলাম ধর্মের পবিত্রতম স্থান, কাবা শরীফ দখল হল তথাকথিত স্বঘোষিত ইমাম মাহাদির পথ ভ্রষ্ট প্রায় পাঁচ শতাধিক সৈন্য দ্বারা।

এ নাশকতার নেতৃত্ব দিচ্ছিলো মূলত জুহায়মান আল-ওতেইবি, ধর্মপ্রচারক এবং সৌদি ন্যাশনাল গার্ডের সদস্য , সেই সাথে মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-কাহতানি, স্বঘোষিত ইমাম মাহাদি ওরফে মিসাইয়াহ্। সম্পর্কে মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-কাহতানি ছিলেন জুহায়মান আল-ওতেইবির বোনের জামাতা। জুহায়মান আল-ওতেইবির জন্ম নাজদ গোত্রে। নাজদ গোত্রের সাথে সৌদি আরবের ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আল-ওতেইবির দাদা ছিলেন সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রথম রাজা আবু সাউদের খুব কাছের একজন বন্ধু। এবং তার পরিবারের প্রায় সকলেই ছিলেন ইখওয়ান (সৌদির প্রথম সেনা বাহিনী)র উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।

জুহায়মান আল-ওতেইবি

জুহায়মান আল-ওতেইবি

 

জুহায়মান নিজেই শেখ আব্দেল আল বাজের ছাত্র ছিলেন, যিনি পরবর্তীতে সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি হন। শেখ আল আব্দেল গ্র্যান্ড মুফতি হওয়ার পর পরই তার সাথে জুহায়মানের মতের বিরোধ ঘটে। তখন রাজদ্রোহের অভিযোগে জুহায়মানকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। সেখানেই আল-কাহতানির সাথে তার পরিচয় হয়। ঘোষণা দেন, আল্লাহ তাঁকে স্বপ্নে বলেছেন, মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-কাহতানিই হচ্ছেন ইমাম মাহদি। কারাগার থেকে বের হয়ে তারা নিজেদের দর্শন প্রচার করা শুরু করে, কিন্তু গোটা ইখওয়ান সম্প্রদায়ের সাথে তাদের মতের বিরোধ ঘটে। তখন আল-ওতেইবি বিভিন্ন স্থানে তার আদর্শ প্রচার করা শুরু করে। মদিনার ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মতত্বের অনেক ছাত্র তার অনুসারী হয়ে যায় এ সময়। পরবর্তীতে আল-ওতেইবি সালাফি’র মদিনা ভিত্তিক গ্রুপ ‘আল জামা আল সালাফিয়া আল মুহতাসবিয়া’ (সালাফিদের সত্য-মিথ্যা প্রভেদকারী) দের সাথে যুক্ত হন। সে সময় এ গ্রুপ পরিচালনা করতেন ‘ইসলামিক গবেষণা এবং ফতোয়া জারি স্থায়ী কমিটি’র চেয়ারম্যান, বিখ্যাত শেখ আব্দুল আল আজিজ ইবনে বাজ। তারা তাদের বাণী মসজিদে মসজিদে কোনরকম বাঁধা ছাড়াই প্রচার করতে লাগলো। এমনকি প্রশাসনও খুব সক্রিয় ছিল না বাঁধা দেয়ার ক্ষেত্রে। এক পর্যায়ে আল-ওতেইবি এবং আল-কাহতানিকে গ্রেফতার করা হলেও পারিবারিক ক্ষমতায় অচিরেই ছেঁড়ে দেয়া হয় তাদেরকে। জেল থেকে বের হয়েই তারা গ্র্যান্ড মসজিদ আক্রমণের পরিকল্পনা করে।

তারা মূলত সৌদি রাজপরিবারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। তাদের দাবী ছিল, সৌদি সরকার ইসলামের মূলনীতি থেকে সরে গিয়ে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সাথে তাল মেলাচ্ছে। তারা পুরোদমে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছিল এবং মসজিদের নিচের চেম্বার অস্ত্র এবং গোলাবারুদে পরিপূর্ণ করে ফেলেছিল। বিদ্রোহীরা প্রায় শতাধিক হাজিকে জিম্মি করে মাটির নিচের চেম্বারে আটক করে রাখে এবং সেখানে রক্তের বন্যা বয়ে যায়। গ্র্যান্ড মসজিদ দখলের সাথে সাথেই সৌদি অন্তঃবর্তী পুলিশ পরিস্থিতি দখলে আনার চেষ্টা করে, কিন্তু নানান প্রতিকূলতায় তাদের পিছু হটতে হয়।

গ্র্যান্ড মসজিদে হামলা

বিদ্রোহীদের দমনের চেষ্টায় সৌদি পুলিশ

 

পরবর্তীতে সৌদি আরবিয়ান ন্যাশনাল গার্ড, সৌদি আর্মি, পাকিস্তানি মিলিটারি স্পেশাল ফোর্স এবং ফ্রেঞ্চ জিআইজিএন ইউনিট সম্মিলিত অভিযান শুরু করে। গ্যাস ক্ষেপণ, মাটি গর্ত, গ্রেনেড নিক্ষেপ, স্নাইপার এর মাধ্যমে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়।

প্রায় দুই সপ্তাহ রক্তের মহাপ্রলয় ঘটিয়ে যখন মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-কাহতানিসহ প্রায় সকল অধিনায়ক মৃত্যুবরণ করে, বাকি বিদ্রোহীরা আত্মসমর্পণ করে ৪ ডিসেম্বর সকালে। এ ঘটনায় প্রায় ৪৯১ জন আহত এবং ১১৭ জন বিদ্রোহী এবং ১২৭ জন হাজি ও সেনাসদস্য নিহত হন।

গ্র্যান্ড মসজিদে হামলা

হামলাকারী বিদ্রোহীরা (আত্মসমর্পণের পর)

সৌদি সরকার প্রথমে গোপনে, এবং পরবর্তীতে যুবরাজ ফয়সালের নির্দেশে প্রকাশ্যে ১৯৮০ সালের ৯ জানুয়ারি সৌদির আট শহরের বিভিন্ন চত্বরে জুহায়মান আল-ওতেইবিসহ ৬৩ বিদ্রোহীর মুণ্ডপাত করে।

এ ঘটনার পর সৌদি রাজা খালেদ শরীয়ত সম্পর্কিত কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করেন এবং ধর্মভিত্তিক পুলিশকে অধিক তৎপর করা হয়।

বহির্বিশ্বের কাছে গ্র্যান্ড মসজিদ দখলের ঘটনা প্রচার হওয়ার পর পরই আয়াতুল্লাহ খোমেনি রেডিওতে ঘোষণা দেন, আমেরিকাই মূলত এই বিদ্রোহের হোতা এবং তারাই বিদ্রোহীদের অস্ত্র, গোলাবারুদ দিয়ে সহায়তা করেছে। রাশিয়াও একই তথ্য প্রচার করে। এর ফলে, মুসলিম দেশগুলোতে এন্টি-আমেরিকা মুভমেন্ট শুরু হয়। বাংলাদেশ, লিবিয়া, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ শুরু হয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, অনেকের ধারণা ওসামা বিন লাদেন এই বিদ্রোহের মূল হোতা। এমনকি ওসামা বিন লাদেনের সাথে সম্পর্কিত গোত্রকে বাধ্য করা হয় গ্র্যান্ড মসজিদের ক্ষয়-ক্ষতির সংস্কার করতে। অনেক অভিজ্ঞ মনে করেন, তৎকালীন তরুণ ওসামা এ ঘটনার সাথে সম্পর্কিত না থাকলেও হয়তো এ বিদ্রোহ থেকেই প্রেরণা নিয়েছে।
সবকিছুর শেষেও, এ আক্রমণের মূল কারণ এখনও রহস্য!

আরো পড়ুনঃ ইতিহাসের ভয়ংকর বিমান হামলা 

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top