ইতিহাস

তিন জন মার্কিন প্রেসিডেন্টদের মৃত্যুর জন্য দায়ী হোয়াইট হাউজ!

তিন জন মার্কিন প্রেসিডেন্টদের মৃত্যুর জন্য দায়ী হোয়াইট হাউজ!- নিয়ন আলোয়

বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তি কে? প্রশ্নের উত্তরে যে উত্তরটি বেশিরভাগ মানুষের মাথায় আসবে তা হল- যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। বিশ্বরাজনীতির খবর যারা রাখেন, তারা জানেন তার সামান্য অঙ্গুলিহেলনে কত দেশে কতটুকু পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে! আচ্ছা, যদি বলি একাধিকবার হোয়াইট হাউসের এই ক্ষমতাধর বাসিন্দাদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে খোদ হোয়াইট হাউজই, তাহলে কেমন দাঁড়াবে ব্যাপারটা?

উইলিয়াম হেনরী হ্যারিসন ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের নবম এবং সবচেয়ে বেশি বয়সে নির্বাচিত রাষ্ট্রদূত। ৪ মার্চ, ১৮৪১ তারিখ তিনি ১ ঘন্টা ৪৫ মিনিট দীর্ঘ Inauguration ভাষণ প্রদান করেন। কয়েকদিনের মধ্যে দুর্বলতা ও অবসাদজনিত কারণে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক থমাস মিলারকে তলব করা হয়। ডাক্তার ধারণা করেন, প্রেসিডেন্সিয়াল ক্যাম্পেইনিং এর কারণেই তার এই সমস্যা দেখা দিচ্ছে। অসুস্থতা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, দেখা দেয় জ্বর, রক্তসহ কফ এবং শ্বাসকষ্ট। লক্ষণ দেখে ডাক্তার মিলার একে নিউমোনিয়া বলে শনাক্ত করেন, ধারণা করেন তীব্র শীতে কোট এবং হাতমোজা ছাড়া দীর্ঘক্ষণ ভাষণ দেয়ার কারণে ঠান্ডা লেগে নিউমোনিয়া হয়েছে, যদিও তিনি পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলেন না। প্রেসিডেন্ট হ্যারিসনের অসুস্থতা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, দেখা দেয় হজমে সমস্যা ও মারাত্মক কোষ্ঠকাঠিন্য। মিলার নিউমোনিয়ার চিকিৎসা চালিয়ে যেতে থাকেন। রোগের লক্ষণগুলো পুরোপুরি নিউমোনিয়ার সাথে যায় না, ব্যাপারটা ডাক্তার মিলারও বুঝতে পারছিলেন, কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানের তৎকালীন অগ্রগতি এর বাইরে কিছু নিশ্চিতও করতে পারছিল না। তাই ডাক্তার থমাস মিলার নিউমোনিয়াকেই সম্ভাব্য রোগ হিসেবে ধরে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে থাকেন।

প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম হেনরী হ্যারিসন

চিকিৎসায় কাজ হল না, ক্ষমতায় বসার ৩২ দিনের মাথায় হ্যারিসন মারা গেলেন। তিনি আমেরিকার ইতিহাসে প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা প্রথম ব্যক্তি।

থমাস মিলার কেন নিশ্চিত হতে পারছিলেন না যে প্রেসিডেন্টের রোগটা আসলে নিউমোনিয়া ছিল? কয়েকটি কারণ হল-
প্রথমত, অসুস্থতার ৫ দিনের দিনের মাথায় তার শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। নিউমোনিয়া হলে এই সমস্যা সময়ের সাথে বাড়ার কথা ছিল, কিন্তু তার শ্বাসকষ্ট নিয়মিত ছিল না।
দ্বিতীয়ত, তার কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা যতটা মারাত্মক ছিল নিউমোনিয়ায় সাধারণত ততটা মারাত্মক হয় না।
তৃতীয়ত, ডাক্তার মিলারকে কিন্তু শ্বাসকষ্ট বা জ্বরের জন্য ডাকা হয়নি, ডাকা হয়েছিল দুর্বলতা আর অবসাদজনিত কারণে। এগুলো নিউমোনিয়ার আদর্শ পূর্বলক্ষণ নয়।
আরেকটি বিষয়, পরবর্তী সময়ের একটা অনুসন্ধানে প্রেসিডেন্টের ভাষণের দিনের অর্থাৎ ৪ মার্চের আবহাওয়া রিপোর্ট থেকে জানা যায়, সেদিনের তাপমাত্রা ততটা ঠান্ডা ছিল না।

The disease was not viewed as a case of pure pneumonia. But as this was most palpable affection, the term pneumonia afforded a succint and intelligible answer to the nature of attack. -Doctor Thomas Miller

রহস্যের গন্ধ। প্রেসিডেন্টের মৃত্যু তো সহজ কাহিনী না!

এরপর “অনেক অনেক দিন কেটে গেল”। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ হেলথের একটা রিসার্চে একটা আশ্চর্য ব্যাপার বেরিয়ে এল। হ্যারিসনের যে অসুখ হয়েছিল, তা নিউমোনিয়া নয়, বরং টাইফয়েড বা প্যারাটাইফয়েড। দুটোর ধরন একই, পার্থক্য হল এড়া ছড়ায় যথাক্রমে salmonella typhi এবং salmonella paratyphi নামক দুইটি ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে। প্রেসিডেন্টের যে যে লক্ষণগুলো দেখা গিয়েছিল তা টাইফয়েড বা প্যারাটাইফয়েডের সাথে বেশি মেলে, উপরন্তু, যৌক্তিকভাবে চিন্তা করলে এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
“যৌক্তিক” কথাটা যে বললাম, কোন যুক্তি কথা বলছে ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ হেলথ? শুনে আশ্চর্য হবেন, তাদের মতে প্রেসিডেন্ট হ্যারিসনের মৃত্যুর কারণ তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্রের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা! খোলাসা করি।

তখন যুক্তরাষ্ট্রে পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য কোন সুয়েজ ব‍্যবস্থা ছিল না। যেটা ছিল, তাকে ড্রেইনেজ ব্যবস্থা বলাই ভালো। বাসাবাড়িতে একটি পাত্রে মলমূত্র জমা হত, রাত্রিবেলা Night Soil বলে পরিচিত পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা সেই পাত্র সংগ্রহ করে নিয়ে যেত। সেই আবর্জনা একটি নির্দিষ্ট মাঠে ডিকম্পোজ করা হত। সেই মাঠ থেকে মাত্র ৭ ব্লক দূরে ছিল একটি ঝর্ণা, যেখান থেকে হোয়াইট হাউসের জন্য পানি সংগ্রহ করা হত। দুয়ে দুয়ে চার মেলালেন ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ হেলথ এর গবেষকরা। তারা বললেন, সেই সুয়েজ ডাম্প থেকে salmonella ব্যাক্টেরিয়া গিয়ে মেশে ঝর্ণার পানিতে, আর ঝর্ণার পানি থেকে প্রেসিডেন্টের গ্লাসে। আর তা থেকে পানিবাহিত রোগ টাইফয়েড।

প্রেসিডেন্ট জেমস পক (১৭৯৫-১৮৪৯).

শুধু হ্যারিসন নয়, একই ঘটনা ঘটে আরও দুজন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের সাথে- জেমস পক এবং জেকারি টেইলর। দুজনেই হ্যারিসনের মত গ্যাস্ট্রোইনটেস্টিনাল সমস্যায় ভুগেন। যুক্তরাষ্ট্রের ১১ তম প্রেসিডেন্ট জেমস পক (প্রেসিডেন্সিয়াল মেয়াদ ১৮৪৫-১৮৪৯) অনেকদিন ভুগে ভুগে একসময় সেরে উঠলেও মেয়াদ শেষ হবার ৩ মাসের মাথায় কলেরায় মৃত্যবরণ করেন। তারপর ক্ষমতায় আসেন জেকারি টেইলর। তিনি ক্ষমতা গ্রহণের এক বছরের মাথায়, ১৯৫০ সালে মৃত্যবরণ করেন।

প্রেসিডেন্ট জেকারি টেইলর

১৮৫০ সালেই আমেরিকান সরকার ওয়াশিংটন ডিসি এবং আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহরে সুয়েজ ব্যবস্থা তৈরীর উদ্যোগ নেয়। এরপর থেকে হোয়াইট হাউজে এমন ভয়াবহ সমস্যা আর দেখা যায় নি।

যদি বলি, হোয়াইট হাউজ নিজেই তার ৩ জন প্রেসিডেন্টের মৃত্যুর জন্য দায়ী, খুব কি ভুল হবে?

Most Popular

To Top