ইতিহাস

বিডিআর বিদ্রোহ ও একজন শেখ হাসিনা

বিডিআর বিদ্রোহ

২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯। বাংলাদেশ আর এ দেশের মানুষ সাক্ষী হলো আরো একটি নৃশংসতার । এদেশের অনেক অজানা আর রহস্য ঘেরা ঘটনার ইতিহাসে যুক্ত হলো আরো একটি পাতা। বিশ্বাস-অবিশ্বাস, সত্য-মিথ্যার খেলার আরো একটি দিন “বিডিআর বিদ্রোহ” নামে লেখা থাকবে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে। সদ্য ছায়া সামরিক শাসন থেকে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের পথে চলতে শুরু করা শেখ হাসিনা সরকারের জন্য এটি যেমন ছিলো এক বিরাট চ্যালেঞ্জ, তেমনি এই ঘটনার ভুক্তভোগীদের জন্য ছিলো বিশাল এক নেতিবাচক পরিবর্তন। শেখ হাসিনা সরকার সেই চ্যালেঞ্জ উতরে গেছেন ভালো ভাবেই, কিন্তু সেই স্বজনহারা পরিবার ঘটে যাওয়া এই পরিবর্তনে নিজেদের কিভাবে মানিয়ে নিয়েছে তা আমরা জানি না।

ঘটনার সংক্ষিপ্ত নিবরণঃ

তখন চলছিলো রাইফেলস সপ্তাহ ২০০৯। ২৪ তারিখ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর উদ্বোধন করেন। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে ২৫ তারিখ সভা শুরুর আগে। বিডিআর দরবার হলে বাহিনীর মহাপরিচালক শাকিল আহমেদ সহ আরো বেশ কিছু উচ্চ পদস্থ সেনা কর্মকর্তাকে হত্যার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ।

২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টার কিছু পরেই দরবার হল থেকে এই বিদ্রোহের সূচনা। প্রথমে দরবার হলে মহাপরিচালক সহ বেশ কিছু সামরিক অফিসারকে জিম্মি করে বাহিনীর সদস্যরা। বিদ্রোহের শুরুতে গণমাধ্যমে প্রচারিত হতে থাকে বিদ্রোহীদের নানা বক্তব্য। এইসব প্রচারের সময়ও গণমাধ্যম বুঝতে পারেনি, বৈষম্য, “অপারেশন ডাল ভাত” এ অনিয়ম, নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের টাকার ন্যায্য বন্টন সহ নানা অধিকারের কথার আড়ালে কি অমানবিকতা চলছিলো ভেতরে।

তখনকার গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, বিদ্রোহের শুরুর দিকেই হত্যা করা হয় মহাপরিচালক সহ দরবার হলে অবস্থিত উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসারদের। যে তথ্য তখন কেউ জানতে পারেনি।

বেলা ১১টার দিকে সেনাবাহিনী অবস্থান নেয় পিলখানা ঘিরে। সেনাবাহিনী যাতে ভেতরে যেতে না পারে সেজন্য ভারী অস্ত্র নিয়ে বিডিয়ারের সব গেটে অবস্থান নেয় বিদ্রোহীরা। সেখান থেকে সারাদিন গুলিও করা হয়।

বেলা দুইটার দিকে সরকার আলোচনার আহবান জানায় বিদ্রোহীদের। আলোচনার এই আহবান নিয়ে প্রথমে আসেন সে সময়কার স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক আর জাতীয় সংসদের হুইপ মির্জা আযম। বেশ কয়েকবারের চেষ্টায় বেলা ৩টার দিকে সরকারি প্রতিনিধি দল সাদা পতাকা নিয়ে ভেতরে যেতে সমর্থ হয়। সেখান থেকে তারা বিদ্রোহী বিডিয়ার সদস্যের ১৪ জনের একটি দল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন বাসভবন যমুনায় যান। এই দলের নেতা হিসেবে ছিলেন ডিএডি তৌহিদ। সেখান তারা আলোচনার পর অস্ত্র সমর্পনের কথা স্বীকার করে আসে। আর এর বিনিময়ে তাদের সাধারণ ক্ষমার ঘোষনা দেয়া হয়।

বিডিআর বিদ্রোহ

আলোচনার জন্য যাচ্ছেন জাহাঙ্গীর কবির নানক

কিন্তু সেই সদস্যরা ফিরে গিয়ে আমারা তাদের নৃশংস চেহারার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। তারা নতুন শর্ত দেয় যে, সদর দপ্তরের চারপাশ থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। এরপর বেশ কয়েক দফা আলোচনার রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের কাছে অস্ত্র জমা দেয় কিছু সদস্য, পাশাপাশি ভেতরে জিম্মি বেশ কিছু পরিবারকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা হয় তখন। তবে মন্ত্রী চলে যাবার পর বন্ধ হয়ে যায় অস্ত্র সমর্পণ। পরদিন দফায় দফায় আলোচনা চলে আর মাঝে মাঝে ভেতর আটকে পরা অসহায় পরিবার গুলোকে উদ্ধার করে আনা হয়। তখন তাদের কারো কারো জবানিতে শোনা যায় নারকীয় সব বর্ণনা।
এইদিনই, পুরান ঢাকার নবাবগঞ্জের পার্ক এলাকায় এক নর্দমায় পাওয়া যায় ৭ সেনা কর্মকর্তার লাশ। বোঝা যায় পিলখানার ভেতরে হত্যার পর সেখানে কোন এক নর্দমায় ফেলে দেয়া হয় জাতির এই সূর্য সন্তাদের মরদেহ গুলো।

বিডিআর বিদ্রোহ

এই নর্দমায় পাওয়া যায় লাশ

২৬ তারিখ জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া এক ভাষণে প্রধানমন্ত্রী আত্মসমর্পণের আহবান জানানোর পাশাপাশি বলেন অন্যথায় কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এরপর থেকেই আস্তে আস্তে মুক্তি দেয়া হতে থেকে ভেতরে আটক রাখা সেনা কর্মকর্তা ও তাদের পরিবার গুলোকে।

মিডিয়ার ভূমিকাঃ

ঘটনার শুরু থেকেই দেশের প্রতিটি টিভি চ্যানেল লাইভ প্রচার শুরু করে। প্রথম দিকে সো চ্যানেলেই বিদ্রোহী জোয়ানদের নানা দাবি দাওয়ার কথা প্রচারিত হতে থাকে। পিলখানার বিভিন্ন গেট থেকে বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যদের বক্তব্য তুলে ধরেন সাংবাদিকেরা। কিন্তু বিচক্ষণ  অনেক সাংবাদিকই বুঝতে পারেন নি আসলেই ভেতরে কি ঘটছে। সৈনিকেরা তাদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া, অফিসারদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ দিতে থাকেন। সাংবাদিকেরা জিজ্ঞেস করলে তারা জানান ভেতরে সব অফিসার নিরাপদে আছে আর তাদের দাবি মেনে নিলে সবাই মুক্তি পাবে। কিন্তু পরে দেখা যায় অনেক অফিসারকেই তারা হত্যা করেছে।

বিচার প্রক্রিয়াঃ  

২০১৩ সালে এই হত্যাকাণ্ডের রায় দেয়া হয়। বিশেষ এই আদালতের বিচারক ডঃ মোঃ আকতারুজ্জামান, ৫ নভেম্বর এই রায় দেন। ইতিহাসের এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের রায়ে, ফাঁসি হয় ১৫২ জনের। এদেশের ইতিহাসে কোন মামলায় এতো মানুষের একসাথে ফাঁসি হবার ঘটনা এর আগে ঘটেনি। ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন, ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড আর ২৭৮ জনকে খালাস দেয়া হয়।

এরপর আপিলে হাইকোর্টের রায় আসে ২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বর। এই রায়ে ১৩৯ জনকে ফাঁসি, ১৮৫ জনকে যাবজ্জীবন আর ২০০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়।

নানা গুঞ্জনঃ

আমাদের দেশে যে কোন ঘটনার পরেই সরকারকে নানা ভাবে দায়ী করা হয়। খোঁজা শুরু হয় সরকারের নানা ভুল ত্রুটি। জানা অজানা ষড়যন্ত্রের কাহিনী ভেসে বেড়ায় লোকমুখে। এই মর্মান্তিক ঘটনাতেও তাই করা হয়েছে।

প্রথম অভিযোগ কেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাথে সাথে সেনাবাহিনীকে অভিযানে পাঠালেন না? আমরা যদি একদম সাদা চোখে দেখি তাহলে সহজেই বোঝা যায়, সদ্য নির্বাচিত একটি সরকার, যার বয়স তখনো মাসের কোটা পার হয়নি তাদের পক্ষে এতো তাড়াতাড়ি এমন সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ ছিলো না।

এরপর বলা হয়, কেন আলোচনার জন্য রাজনৈতিক নেতা না পাঠিয়ে সেনাবাহিনীর কাউকে পাঠানো হলো না? যেখানে বিদ্রোহ হয়েছে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সেখানে আলোচনার জন্য আবার সেই বাহিনী থেকে লোক পাঠানো কতটা যুক্তিযুক্ত তা বোধগম্য নয়। তবে হ্যাঁ এখানে সরকারের সুযোগ ছিলো একটি সর্বদলীয় বৈঠক ডেকে আলোচনা করার। কেননা মাত্র একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় যাবার পর এই ধরনের ঘটনায় জাতীয় ঐক্য তৈরি করা সহজ ছিলো।

এছাড়াও এ ঘটনা সরকার নিজের চক্রান্ত,  বিরোধী দল এই ঘটনার পেছনে দায়ী, এমন হাজারো কাঁদা ছোড়াছুড়ি আজ পর্যন্ত চলছেই!

এদেশে এমন আলোচনা চলতেই থাকে। কিন্তু বেশির ভাগ সময় জনগণ জানতে পারে না আসল ঘটনা!

Most Popular

To Top