ইতিহাস

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন বর্বরতা আর দেখেনি ইউরোপ!

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন বর্বরতা আর দেখেনি ইউরোপ!- Neon Aloy

আজ থেকে ২২ বছর আগে সেব্রেনিৎসার পতনের মধ্যে দিয়ে শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের মাটিতে সংঘটিত সব থেকে বৃহৎ এবং ঘৃণিত এক হত্যাযজ্ঞ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মানব ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গণহত্যার প্রসঙ্গ উঠলে এক বাক্যে সবার মুখে চলে আসবে সেব্রেনিৎসা মুসলিম হত্যার কথা। আধুনিক ইউরোপের কলঙ্ক বলে পরিচিত এই গণহত্যা। এটি খুব বিস্ময়কর নয় যে এই গণহত্যা বিশ্বের তিন পরাশক্তি মার্কিন, ব্রিটিশ এবং ফরাসি সরকারের পররাষ্ট্রনীতির জন্য ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।

বসনিয়া ও হারজেগোভিনা ইউরোপ মহাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে বলকান উপদ্বীপে অবস্থিত একটি রাষ্ট্র। ১৯৯২ সালের মার্চে বসনিয়া স্বাধীনের পরপরই এখানে মুসলমান, ক্রোয়শীয় ও সার্বীয় জাতির মধ্যে গৃহযুদ্ধ বাধে। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সালের এই একতরফা যুদ্ধে প্রায় ২৫ হাজার ৬০৯ জন [সরকারি হিসাব অনুযায়ী] মুসলিম নিহত হয়।

১৯৯৫ সালের জুলাই মাসে সেব্রেনিৎসা শহরটিকে ঘোষনা করা হয় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনির অধীনে একটি “নিরাপদ এলাকা” হিসেবে। এই ঘোষণার সাথে সাথেই বসনিয়ান- সার্ব ঘাতক বাহিনী ১১ জুলাই থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত ৩দিন ধরে শহরটিতে অভিযান চালায় এবং তাদের হাতে নিহত হয় আট হাজার নিরাপরাধ বসনিয়ান মুসলিম, যাদের বেশিরভাগই ছিল পুরুষ ও কিশোর। ইতিহাসে এটি সেব্রেনিৎসা হত্যাকাণ্ড নামে পরিচিত। এই হত্যাযজ্ঞ কে দ্য হেগ এ অবস্থিত আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল “জেনোসাইড” হিসেবে ঘোষনা করে। ততকালীন বসনিয়ান- সার্ব নেতা জেনারেল রাদকো ম্লাদিচ এই গণহত্যার নির্দেশ দানের অভিযোগে অভিযুক্ত হন। এখনও এ হত্যাকাণ্ডে নিহত হতভাগ্যদের দেহাবশেষের সন্ধান মেলে ওই এলাকায়। এ পর্যন্ত এই অঞ্চলে ৭৬টি স্থানে অন্তত দেড়শ গণকবরের সন্ধান মিলেছে।

বসনিয়ান জেনোসাইট

রাদকো ম্লাদিচ

বসনিয়ার যুদ্ধ শুরু হয় ১৯৯২ সালের সাত এপ্রিল ও শেষ হয় ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বরে। বসনিয়ার মুসলমানরা ষাট ও সত্তুরের দশকের দিকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু করেছিল। এ সময় তাদের মধ্যে ইসলামী চেতনার বিকাশ ঘটছিল। এই সময় মার্শাল টিটোর জোটনিরপেক্ষ নীতির সুবাদে বসনিয় মুসলমানরা মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পায়। ফলে তাদের ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। এরই ধারা অনুযায়ী পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে সারায়েভো বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ চালু হয়। টিটো ১৯৮০ সালে মারা যান। কিন্তু সার্বের তৎকালীন মানুষজন বসনিয়ার ও কোসোভোর মুসলমানদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী বা ইসলামী মনোভাবের বিস্তার- কোনোটাকেই মেনে নিতে পারছিল না।

১৯৯০ সালের জানুয়ারি মাসে ইয়োগোস্লাভিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির পতন ঘটে। এর সাথে সাথে দেশটিতে শুরু হয় রাজনৈতিক বিভেদ। ইয়োগোস্লাভিয়ার মুসলমান ও ক্রোয়াটরা সার্বদের কর্তৃত্বকে পছন্দ করতো না। ১৯৯১ সালের ২৫শে জুন ক্রোয়েশিয়া ও স্লোভেনিয়া স্বাধীনতা ঘোষনা করে। তাই এরপর পরই মুসলিম ও ক্রোয়াট সংসদ সদস্যরা স্বাধীনতার দাবি জানায়। কিন্তু ইউরোপীয় ও মার্কিন সরকার এই দাবির বিরুদ্ধে বাধা দিতে থাকে। তারা গণভোটের শর্ত আরোপ করে বসে। বসনিয় সার্বরা গণভোট বর্জন করে। গণভোটের পরিবর্তে তারা একটি রাষ্ট্র গঠনের দাবি জানায়। যার নেতৃত্বে থাকবে বসনিয় সার্বরা। কিন্তু পূর্ব- সমঝোতার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক নীতি অনুযায়ী গণভোট দেয় বসনিয়ার সরকার । বিদেশী পর্যবেক্ষকদের নজরদারিতে অনুষ্ঠিত এই গণভোটে দেশটির ৬৪ শতাংশ নাগরিক একটি অবিভক্ত ও স্বাধীন বসনিয়া গড়ার পক্ষে রায় দেন। কিন্তু একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর দিনই তথা ১৯৯২ সালের ৭ এপ্রিল বসনিয়া হার্জেগোভিনা সার্বদের আগ্রাসনের শিকার হয়।

১৯৯২ সালের ৩০মে বসনিয়ার সংঘাতে হস্তক্ষেপের দায়ে সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রোর ওপর জাতিসংঘ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। মে মাসের শেষের দিকেই বসনিয়ার যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এরই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কঠোর সমালোচনা করেন বসনিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আলিয়া ইজ্জতবেগোভিচ। তার মতে সাবেক ইয়োগোস্লাভিয়ার ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার কারণে সার্বরাই লাভবান হচ্ছে। কারণ এর ফলে বসনিয়া আত্মরক্ষার সুযোগ পাচ্ছে না। জাতিসংঘ বসনিয়ার প্রেসিডেন্টের এই প্রতিবাদকে মোটেই গুরুত্ব দেয়নি। মার্কিন, ফরাসি, রুশ, ব্রিটিশ ও স্পেনিশ সরকারও সাবেক ইয়োগোস্লাভিয়ায় অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখার ওপর জোর দিয়ে আন্তর্জাতিক বাহিনী মুসলমানদের পক্ষ নিয়ে হস্তক্ষেপ করবে না এমন এক বিবৃতি দেন। তবে তারা বসনিয়ার ৬ টি অঞ্চলকে (সারায়েভো, বিহাচ, তুজলা, গোরাজদে, জেপা ও সেব্রেনিৎসা) নিরাপদ জোন ঘোষণার প্রস্তাব দেয় যাতে মুসলমানরা সার্ব হামলা থেকে রক্ষা পায়। ১৯৯৩ সালের ২২জানুয়ারি ওয়েন-স্টোলটেনবার্গ প্রস্তাব বাস্তবায়ন শুরু হয়। তখন তিন পক্ষই এই শান্তি প্রস্তাব মেনে নেয়।

সার্ব ও ক্রোয়াটরা যুদ্ধ- বিরতি লঙ্ঘন করে ১৯৯৩ সালের মে মাসে বসনিয়ার আরো কিছু অঞ্চল দখল করে। একই বছরের ৩০ জুলাই আবার এই তিনটি পক্ষ ওয়েন-স্টোলটেনবার্গ প্ল্যান মেনে নেয়। প্ল্যানে বলা হয়, বসনিয়া হার্জেগোভিনায় তিনটি জাতির সহাবস্থানে একটি যুক্তরাজ্য গঠনের কথা এবং এর কেন্দ্র শুধু পররাষ্ট্র ও বৈদেশিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করবে। রিপাবলিকস অফ বসনিয়ান ইউনিয়ন নামের এই নতুন রাষ্ট্রের ৫২ শতাংশ ভূমি বসনিয়ার সার্বদেরকে, ১৭ শতাংশ ক্রোয়াটদেরকে এবং ত্রিশ শতাংশ দেয়া হয় মুসলমানদেরকে। রাজধানী সারায়েভোর জন্য থাকে এক শতাংশ ভূমি যা দুই বছর জাতিসংঘের অধীনে থাকবে। তিন পক্ষ ওই শান্তি প্রস্তাব মেনে নেয়া সত্ত্বেও যুদ্ধ অব্যাহত থাকে এবং এভাবেই ওয়েন-স্টোলটেনবার্গ প্ল্যান ব্যর্থ হয়। এরপর আরো কয়েকটি পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়।

পরবর্তীতে সার্বরা ১৯৯৫ সালের মে মাসে সারায়েভো ও তুজলায় গোলা বর্ষণ করলে বিপুল সংখ্যক বসনিয় মুসলমান নিহত হয়। এ ছাড়াও সার্বরা ন্যাটোর হামলা ঠেকাতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর ২০০’র বেশি সেনাকে পণবন্দী করে। এই শান্তিরক্ষীরা পণবন্দী হওয়ায় জাতিসংঘ গোরাজদে অঞ্চলে সার্বদের তীব্র হামলার কোনো জবাব দেয়নি। জাতিসংঘ সার্বদের সঙ্গে অপোস রফা করার কথা অস্বীকার করে আসলেও একই সময়ে শান্তিরক্ষীরা সারায়েভোয় সার্ব- অধিকৃত অঞ্চল থেকে সরে আসলে সার্বরা পণবন্দী শান্তিরক্ষীদের ছেড়ে দেয়। এ ছাড়াও সার্বদের জঙ্গি বিমানগুলো বসনিয়ার নিষিদ্ধ অঞ্চলের আকাশেও অবাধে টহল দিয়ে বেড়ায়। অবশেষে সার্বরা ১৯৯৫ সালের জুন মাসে জাতিসংঘের রক্ষীদের কোনো বাধা বা প্রতিক্রিয়া ছাড়াই সেব্রেনিৎসা ও জেপা শহরটি দখল করে নেয়। জাতিসংঘের ৮১৯ নম্বর প্রস্তাবে অনুযায়ী সেব্রেনিৎসা শহরটি নিরাপদ অঞ্চল বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু সার্বরা শহরটি দখল করে সেখানকার হাজার হাজার বেসামরিক মুসলমানকে হত্যা করে ও হাজার হাজার নারীকে ধর্ষণ করে। নিহতের সংখ্যা ৮ হাজার ছাড়িয়ে যায়। তাদের বেশিরভাগই ছিল বৃদ্ধ ও যুবক। রাদকো ম্লাদিচ এর নেতৃত্বাধীন সার্ব বাহিনী এই গণহত্যা চালায়।

কমিউনিস্ট শাসিত সাবেক যুগোস্লাভিয়া ভেঙে স্বাধীন হওয়ার দুই বছরের মাথায় এই যুদ্ধ শুরু হয়। এ যুদ্ধে সার্ব ও ক্রোয়েট বাহিনী চরম বর্বরতার পরিচয় দেয়। সার্বিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট স্লোভোদান মিলোসোভিচ এবং বসনিয়ার সার্ব নেতা রাদকো ম্লাদিচ লাখো মানুষ হত্যা করে ইতিহাসে ঘৃণিত হয়ে আছেন। মিলোসোভিচ প্রয়াত হলেও বিচারের হাত থেকে রেহাই পাননি ম্লাদিচ। ২০০১ সালে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। ১৯৯৭ সালে ম্লাদিচ গা ঢাকা দেন এবং তাকে খুঁজে বের করতে ইউরোপের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো হিমশিম খেয়েছে। অবশেষে দীর্ঘ ১৩ বছর পর ২০০৮ সালে তাকে বেলগ্রেডের শহরতলী থেকে গ্রেফতার করা হয়। ৭০ বছর বয়সী কারদিচের বিরুদ্ধে সেব্রেনিৎসা গণহত্যাসহ কয়েকটি অপরাধে জড়িত থাকায় মোট ১১টি অভিযোগ আনা হয়েছিল। এর মধ্যে ১০টিই দোষী সাব্যস্ত হন সাবেক সার্বীয় এই নেতা। বসনিয়ার কসাই হিসেবে পরিচিত সাবেক সার্ব সেনাপ্রধান জেনারেল রাদকো ম্লাদিচকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন দ্য হেগের অপরাধ আদালত।

বসনিয়ান জেনোসাইড

স্লোভোদান মিলোসোভিচ

২০০৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত সেব্রেনিৎসা হত্যাকাণ্ডে নিহত ৬ হাজার ১৬৬ জনের দেহাবশেষ সমাধিস্থ করা হয়েছে। এ বছর গণহত্যা দিবসে সমাধিস্থ করা হবে আরও প্রায় সাড়ে ৪০০ জনকে। তবে পরিচয় সনাক্ত হওয়া অপর ১৩৪ জনকে এখনই সমাধিস্থ করা হবে না। তাদের পরিবারের দাবি, নিহতদের দেহের আরও অংশের সন্ধান মিললেই তবে সমাধিস্থ করা হবে।

এদিকে, এখন পর্যন্ত ৭ হাজার একশ জনের দেহাবশেষ উদ্ধার করে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় সনাক্ত করা হয়েছে। সন্ধান চলছে নিখোঁজ আরও ১২০০ জনের।

মানবতার বিরুদ্ধে এইসব ভয়াবহ অপরাধের দায় কেবল সার্বিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট স্লোভোদান মিলোসোভিচ এবং বসনিয়ার সার্ব নেতা রাদকো ম্লাদিচ এর মতো নেতার ঘাড়ে চাপানো হলেও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যসহ নানা সাক্ষ্য- প্রমাণে দেখা যায় জাতিসংঘের দায়িত্বহীন ভূমিকা ও পশ্চিমা সরকার গুলোর অন্যায্য ভূমিকার কারণেই এই মানবীয় বিপর্যয় ঘটেছিল। পশ্চিমা সরকার গুলোর জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের আওতায় বসনিয়ার মজলুম মুসলমানদের সহায়তার নামে সেখানে সেনা পাঠায়। তা সত্ত্বেও বাস্তবে তারা কোনো কার্যকর পদক্ষেপই নেয়নি। বরং তাদের জন্যই নিহত হয়েছে হাজার হাজার নিরাপরাধ মানুষ।

Most Popular

To Top