টুকিটাকি

ইন্টারনেট মানেই কি চোর-ডাকাতের আড্ডাখানা?

ইন্টারনেট মানেই কি চোর-ডাকাতের আড্ডাখানা?- নিয়ন আলোয়

লাইক-শেয়ার-কমেন্টের লোভে আপনি কত নিচে নামতে রাজি আছেন?

কয়েকদিন আগে ফেসবুক পেইজ Bengal Beats এর চমৎকার একটা ফটো এলবাম দেখলাম, “সুপারহিরোদের মায়েরা বাঙালি হলে কি হতো” টাইটেলে। চমৎকার আইডিয়া, Execution বরাবরের মতই টপক্লাস!

তার ঘন্টাখানেক ঘুরতে না ঘুরতেই দেখলাম জনৈক ব্যক্তি এলবামের প্রত্যেকটা ছবি ডাউনলোড করে নিজের এলবাম হিসেবে মুভি, টিভি সিরিজ রিভিউয়ের গ্রুপগুলাতে পোস্ট করে দিয়েছে।

আসুন, ছোট্ট একটা হিসাব করি। এলবামে যদি ১০টা ছবি থাকে, তাহলে প্রতিটা ছবি তিন ক্লিকে ডাউনলোড করতে অন্তত ৩*১০=৩০টা ক্লিক করতে হয়েছে। এরপর এক ধাক্কায় সব আপলোড। অন্তত ৩২-৩৫ ক্লিক এবং ২-৩ মিনিটের ব্যাপার, যেখানে সহজে তিন ক্লিকেই ছবিগুলো ডাউনলোড না করে গ্রুপে শেয়ার করা যায় ৩-৪ সেকেন্ডে, এথিক্যাল কোন বাউন্ডারি ক্রস না করেই!

তার চেয়েও বিরক্তির ব্যাপার হচ্ছে, যে লোক এভাবে বিনা অনুমতিতে কনটেন্ট ডাউনলোড করে শেয়ার করেছেন, তিনি দেখলাম আবার আইনের ছাত্র! যাহ বাবা, দেশ তাইলে ঠিক পথেই আগাচ্ছে দেখা যায়!

আপনার মনে হতে পারে, আমার কি খেয়েদেয়ে কাজকর্মের অভাব পড়েছে কিনা যে আমি “কে কয় ক্লিক অপচয় করে জীবনের কত মূল্যবান সময় নষ্ট করলো” বিষয়ক আজাইরা প্যাচাল পেরে নিজের এবং অন্যের সময় নষ্ট করছি?

আজাইরা এত প্যাচাল পারার কারণ একটাই- প্রতিটা ইউনিক কনটেন্ট জেনারেট করতে কি পরিমাণ ক্রিয়েটিভিটি- মেধা- সময়- পরিশ্রম দিতে হয়, আমার জানা আছে। ৪ মিনিটের একটা মোশন গ্রাফিকসের কনটেন্ট জেনারেট করতে আমার এবং আমার ডিজাইনারের গত দুইদিনে ২০ ঘন্টার বেশি সময় ইতোমধ্যেই চলে গেছে, এবং এখনো কাজ চলছে! পাবলিশ হওয়ার পর দেখা যাবে কেউ এক ক্লিকে সেটা ডাউনলোড করে নিজের কনটেন্ট হিসাবে চালিয়ে দিচ্ছে! এরকম কনটেন্ট চোর, আর পকেটমারের মধ্যে আমি মৌলিক কোন পার্থক্য খুঁজে পাই না। এদের মোরাল এবং এথিক্যাল সেন্স একই লেভেলের, দুইজাতের মানুষই অন্য কারো জিনিস মেরে দেওয়াকে কোন অপরাধ মনে করে না।

ইন্টারনেট মানেই কি চোর-ডাকাতের আড্ডাখানা?

এরকম কপি-পেস্ট করাও কিন্তু পাইরেসি, সোজা বাংলায় চুরি করা!

আপনি রেগে যেতে পারেন এটা ভেবে যে সামান্য কয়টা কার্টুন ছবি ডাউনলোড করার কারণে আপনাকে রাস্তার চোর-ছ্যাচ্চরের সাথে তুলনা করছি কেন? আপনার কাছে সামান্য কয়েকটা কনটেন্টের কোন দাম না থাকতে পারে, তবে এরকম ক্রিয়েটিভ কনটেন্ট জেনারেট করার জন্য এজেন্সিগুলো লাখ-লাখ টাকা দিয়ে ক্রিয়েটিভ লোকজন হায়ার করে। ব্র‍্যান্ডিং থেকে শুরু করে মার্কেট এনালাইসিস- কত জটিল হিসাব, একেকটা কোম্পানির বিজনেস স্ট্র‍্যাটেজি পর্যন্ত কতকিছু লুকিয়ে থাকে কোন কোন ক্রিয়েটিভ কনটেন্টের পিছনে, কোন আইডিয়া আছে আপনার? এই কোম্পানিগুলোর কোটি-কোটি টাকা বিনিয়োগ, আর সেই বিনিয়োগের উপর নির্ভরশীল হাজার-হাজার মানুষের ভাত মেরে আপনি কয় টাকা লাভ করছেন, বলুন তো? প্রতি ১০০ লাইকের বিনিময়ে কয় টাকা পাচ্ছেন ফেসবুক থেকে?

এগুলো তো গেলো প্রফেশনালদের ভাত মারার হিসাব। যেই ক্রিয়েটিভ ছেলে বা মেয়ে সারারাত জেগে অথবা ক্লাসের ফাঁকে এসব কনটেন্ট বানায় শুধু নিজের মনের সুখের জন্য, তাদের মনের সুখও কি আপনি কেড়ে নেন না যখন তার জিনিসটা অনুমতি ছাড়াই নিজের নামে চালিয়ে দেন? এরা কিন্তু টাকা পয়সার জন্য এসব কনটেন্ট বানায় না, মনের শান্তির জন্য বানায়। তাদের কনটেন্ট দেখে কে কি রিএক্ট করছে, এইটা দেখেই তারা অন্তত এক সপ্তাহ খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে আনন্দে নাচতে পারে, এরকম পাগলও দেখেছি।

আমাদের বেকুবি এবং আমাদের বেকুবির কারণে পুরো ২-৩টা ইন্ডাস্ট্রি ধংস হয়ে যাওয়ার সহজ একটা উদাহরণ দেই। সময়টা তখন ২০০৬-২০০৭। এফএম রেডিওর কল্যাণে তখন অর্ণব, নেমেসিস, মিলা, ফুয়াদ, স্টইক ব্লিস, বালামের গান আমাদের মতো কমবয়সী ছেলেমেয়েদের কাছে প্রচন্ড জনপ্রিয়। সবাই এলবাম বের করলো, এবং প্রায় সবাই ধরা খেলো। কেন জানেন? গানের এলবামের দাম ছিলো ৪৫ টাকা। আর আমরা বেকুব পোলাপান সিডির দোকানে গিয়ে এলবাম না কিনে তার পাশের সাইবার ক্যাফেতে বসে ২ ঘন্টায় ৩০+৩০=৬০ টাকা খরচ করে সেই একই এলবামের পাইরেটেড কপি ডাউনলোড করতাম (সে আমলে ১০কেবিপিএস স্পিডের ইন্টারনেটই আকাশের চাঁদ ছিলো)। আমাদের জেনারেশনের কাছে তখন এটাই স্মার্টনেস ছিলো, কম বয়সে নিয়ম ভেঙে হেডম দেখানোর উপলক্ষ্য ছিলো। কিন্তু আমাদের এই সস্তা হেডম দেখানোর ফালতু প্রতিযোগিতায় প্রশ্রয় পেলো পাইরেসি, ধংস হয়ে গেলো বাংলাদেশের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি। এত এত গুণী সংগীতশিল্পী এখন বছর জুড়ে মাছি মারে আর কপাল ভাল থাকলে মাসে, দুই মাসে একটা লাইভ শো করে। এলবাম বের করে প্রফিট না হোক, অন্তত রেকর্ডিং এর খরচের টাকাটা উঠে আসলেও অনেক আর্টিস্ট খেয়ে- না খেয়ে অন্তত বছরে একটা করে এলবাম রিলিজ দিতো।

এই অডিও পাইরেসি থেকে শুরু হয়ে পাইরেসি আর কনটেন্ট চুরি এমন লেভেলে পৌঁছালো যে মানুষ মনে করা শুরু করলো যে অনলাইনে পাবলিশ হওয়া যেকোন জিনিসই তার বাপের সম্পত্তি। নাটক-সিনেমা-মিউজিক ভিডিও সব পাইরেসি হওয়া শুরু করলো। অবস্থাটা এমন যে, অনেক নামীদামী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত লোকজনও অনলাইনে পাওয়া কনটেন্ট কোন পারমিশন ছাড়াই ব্যবহার করতে দ্বিধাবোধ করেন না!

যে কষ্ট করছে, তার কষ্টের মূল্য দিতে শিখুন। নাহলে ভাল কনটেন্ট আশা করবেন না। একজনের পকেট কাটা যেমন অপরাধ, তেমনি মেধাসত্ত্ব চুরি করাটাও অপরাধ।

Most Popular

To Top