টুকিটাকি

আঞ্চলিকতার “বিএনসিসি” পাঠ, এবং আমাদের যত ভুল ধারণা

বিএনসিসি

প্রথম বন্ধু- দোস্ত, তোর গ্রামের বাড়ি কই রে?
আমি- বরিশাল।
প্রথম বন্ধু- বরিশাল? তুইও “বিএনসিসি”র পাবলিক তাহলে। শালার!!! বিএনসিসি দিয়ে ভরে গেল দেশটা।
আমি- বিএনসিসি মানে কি রে?
প্রথম বন্ধু- বিএনসিসি মানে জানিস না? বরিশাল, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্রগ্রাম।
দ্বিতীয় বন্ধু- চট্রগ্রাম কে বলছে? চাঁদপুর হবে।
প্রথম বন্ধু- কে বলছে তোরে? জানোস তুই, চট্রগ্রামের মানুষ কতো খারাপ?
দ্বিতীয় বন্ধু- তুই বেশি জানোস?
আমি- আচ্ছা, বিএনসিসি কি আসলে? এই চার জেলা কি করছে?
প্রথম বন্ধু- কি করে নাই? বিএনসিসি পাবলিক তো পুরা ভাইরাসের মতো, দেশের যেইখানে যাবি সেইখানেই পাবি। পুরা দেশটা চালায়ই ওরা। আর বিএনসিসির সব পাবলিকই ইয়ে টাইপ।
আমি- কিয়ে টাইপ?
প্রথম বন্ধু- কেমন কেমন। বেশি চালাক, সুযোগ পাইলেই গুটি করে। নোয়াখাইল্লা গুলা তো খেয়েই দৌড় দেয়, বরিশাইল্লা গুলা তো সারাদিন গুটিবাজি করার ধান্দায় থাকে আর কুমিল্লার তো বেসিকেই সমস্যা। আর চট্রগ্রাম? ওদের যেই ভাষা! শুনলে মনে হয় আবার যুদ্ধ করা লাগবে ভাষার জন্য।
আমি- আচ্ছা, আমার জানা মতে তো দেশের প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি কিংবা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বা পররাষ্ট্র মন্ত্রী কেউই এই বিএনসিসির না। তাহলে বিএনসিসি কেমনে দেশ চালায়?
প্রথম বন্ধু- প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি কি দেশ চালায় নাকি?
আমি- তো কে চালায়?
প্রথম বন্ধু- বুঝবি না এইসব, দেশটা বিএনসিসিই চালায়।

খাওয়ার পর তাড়াহুড়া করলে কিংবা নিজস্ব ভাষায় কথা বললে কেন ভাইরাস হতে হবে, আর বিএনসিসি-ই বা কিভাবে দেশ চালাচ্ছে এই সমীকরণ মিলানোর চেষ্টা করলাম কিছুক্ষণ। এ সময়, আমার দুই বন্ধু তর্ক করে, যুক্তি দিয়ে, নিজের অভিজ্ঞতার গল্প বলে প্রমাণ করতে থাকলো বিএনসিসি’তে কার থাকা উচিৎ আসলে- চাঁদপুর নাকি চট্রগ্রাম? সমীকরণের কূল কিনারা করতে না পেরে এক সময় উঠে চলে এলাম দুইজনের মাঝখান থেকে। যখন উঠে এলাম, তখনও একজন বর্ণনা করে চলেছে চট্রগ্রামের মানুষের ভাষা কতো ডেঞ্জারাস।

এইটা তো শুধু একদিনের ঘটনা, এমন ঘটনা ঘটে অহরহ। এক বন্ধু সেদিন বলছিল, “দোস্ত, গ্রামের বাড়ি কই, এই প্রশ্নের উত্তর বরিশাল দেওয়ার পর মানুষের চোখে বিস্ময় বা আতঙ্ক ছাড়া স্বাভাবিক দেখলাম না”
একদিন শুনলাম একজন বলছে, “নোয়াখালীর মানুষ এতো বাটপার! একজনরে টাকা দিছিলাম, আর ফেরত দেয় নাই।”

আচ্ছা, আমার জীবনে তো অনেক বার ঘটছে যে কথা দিয়ে কথা রাখে নাই। আমি সিউর যে বলছে, তার জীবনে শুধু একবার না, বেশ কয়েকবারই এমন ঘটনা ঘটেছে। তাহলে আমরা কেন শুধু নোয়াখালীরটাই মনে রাখবো? আর একজনের জন্য নিশ্চয়ই পুরো সম্প্রদায়কে আমরা “বাটপার” বিশেষণে ভূষিত করতে পারি না।

চট্রগ্রামের মানুষের সাথে ব্যবসা করে যে শান্তি, এমন আর কোন জেলার মানুষের সাথে করে পাওয়া যায় না। কোন ভেজালে যায় না, যা কথা দিবে তাই

আর, ভাষার কারণে কি আমরা একটা গোষ্ঠীকে আলাদা করে ফেলতে পারি? দেশের ভেতর যদি কোন সম্প্রদায়ের আলাদা ভাষা থাকে, আলাদা সংস্কৃতি থাকে এবং তারা যদি সে ব্যাপার গুলা আগলে রাখতে পারে, তাহলে তো তাদের নিয়ে আমাদের গর্ববোধ করা উচিৎ। আমাদের প্রতিবেশি দেশ ভারতে ৭০টির বেশি আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহৃত। কখনও তো দেখিনি বা শুনিনি যে, তারা কোন ভাষা নিয়ে লজ্জিত বা আবার যুদ্ধ করার প্রয়োজনবোধ করছে। যে ইংরেজদের ভাষা আজ সারা বিশ্বের মানুষের যোগাযোগের মাধ্যম, সেই ইংরেজদের নিজেদের দেশে ১১টির মতো ভাষা বিদ্যমান।

নোয়াখালীর মানুষের পিতা-মাতার প্রতি ভক্তি সম্পর্কে কি আমরা জানি? না, তারা খাওয়ার পর তাড়াহুড়া করে এইটাই শুধু জানি।

অতীত জীবনে চট্রগ্রামের মানুষের সাথে মিলমিশ কমই হয়েছে। শেষ দু-এক বছরে ভ্রমণের সুবাদে চট্রগ্রামে যাওয়া হয়েছে। যতবার তাদের সান্নিধ্যে গিয়েছি ততোবারই তাদের অতিথিপরায়ণতা দেখে মুগ্ধ হয়েছি। কতো সহজ-সরল, অবাধে বিশ্বাস করা যায়, কতো সহজে আপন করে নেয়। সেদিন কথা প্রসঙ্গে এক বড়ভাই বলছিলেন, “চট্রগ্রামের মানুষের সাথে ব্যবসা করে যে শান্তি, এমন আর কোন জেলার মানুষের সাথে করে পাওয়া যায় না। কোন ভেজালে যায় না, যা কথা দিবে তাই”। আমার মনে হয়, ছোটবেলা থেকেই সমুদ্র আর পাহাড়ের বিশালতা দেখতে দেখতে তাদের মনটাও বড় হয়ে গেছে। আর চট্রগ্রামের আঞ্চলিকের রান্নার যে স্বাদ, যারা খেয়েছে তারাই জানে।

নোয়াখালীর মানুষের পিতা-মাতার প্রতি ভক্তি সম্পর্কে কি আমরা জানি? না, তারা খাওয়ার পর তাড়াহুড়া করে এইটাই শুধু জানি। কদিন আগেই টিভিতে দেখলাম এক ডাক্তার তাঁর অভিজ্ঞতার গল্প বলছেন, উনি জীবনে যত রোগী পেয়েছেন, অসুস্থ আত্মীয়ের জন্য নোয়াখালীর মানুষের ডেডিকেশন অন্য যে কোন অঞ্চলের মানুষকে হার মানায়। ১০০ বছরের উপরে বয়স, হাঁটতে চলতে পারে না, এমন অসুস্থ মাকে কোলে করে নিয়ে আসছে ছেলে। “ডাক্তার, যেমনেই হোক, যত টাকা লাগে, মায়ের ব্যথা কমান, মা যেন কষ্ট না পায় সেই ব্যবস্থা করেন”– এমনই মিনতি থাকে তাদের।

প্রথম প্রথম কেউ “বরিশাইল্লা” ট্যাগ দিলে বিরোধিতা করতাম… আগে খারাপ লাগতো, এখন কেউ “বরিশাইল্লা” ট্যাগ দিলে আরও ভালো লাগে।

“বরিশাইল্লা” একটা আতঙ্কের নাম অনেকের কাছে। অনেক সময়ই শোনা লাগে, “তোরে বিশ্বাস করুম? হালা বরিশাইল্লা”। যদিও আমার দাদুবাড়ি-নানুবাড়ি দুটিই বরিশাল, তারপরও বরিশালের সাথে আমার সম্পর্ক ঠিক “পরিচিত” বলতে যা বোঝায় ওইরকম আর কি। খুব কমই যাওয়া হয়েছে, ঠিক কোথায় দাদুবাড়ি বা নানুবাড়ি তাও ঠিক মনে করে বলতে পারি না। তাই প্রথম প্রথম কেউ “বরিশাইল্লা” ট্যাগ দিলে বিরোধিতা করতাম, বোঝানোর চেষ্টা করতাম বরিশালের সাথে আমার সম্পর্কটা কেমন এটা বুঝাতে। আগে খারাপ লাগতো, এখন কেউ “বরিশাইল্লা” ট্যাগ দিলে আরও ভালো লাগে।

একজন আরেকজনকে পেলে নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়ে গল্প জুড়ে দিবে, দরকার হলে জীবন দিয়ে দিবে।

বরিশালের মানুষ এতো সহজে মানুষকে কিভাবে আপন করে নেয় এবং এতো কথা তারা কিভাবে বলতে পারে এইটা আমার কাছে একটা বিস্ময়। আর তাদের যে অঞ্চলপ্রীতি! একজন আরেকজনকে পেলে নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়ে গল্প জুড়ে দিবে, দরকার হলে জীবন দিয়ে দিবে। যখন দেখি দূরদূরান্তে যেয়েও অচেনা কোন বরিশালের অধিবাসী এতো সহজে আপন ভেবে কাছে টেনে নেয়, অনেক ভালো লাগে। তখন ‘বরিশাইল্লা’ ট্যাগের কারণে অনেক গর্ব অনুভূত হয়।

ভালো খারাপ মিলিয়েই তো আমরা সবাই মানুষ। সর্বত্রই ভালোর সাথে খারাপের অবস্থান। তাহলে কেন আমরা একজনের দোষে সবাইকে দায়ী করবো? “দুই-একটা ক্রিমিনালের কথা ভেবে পুরো মুসলিম জাতিকে জঙ্গি বলা যায় না”– এই সত্য প্রচারে যখন আমরা ব্যস্ত, তখন দুই-একজন টাকা ফেরত না দিলেই কিভাবে আমরা বলতে পারি যে সব নোয়াখালীর মানুষ বাটপার?

আসুন, মানুষকে তার কর্মের দ্বারা বিচার করার চেষ্টা করি, কোথা থেকে এসেছে তার ভিত্তিতে না করে। না জেনে, না বুঝে কথা বললে মনের সংকীর্ণতা প্রকাশ পায়, ছোট মনের উদাহরণ হতে হয়। আমার ধারণা, ছোট মনমানসিকতার পরিচয় দিলে নিজের এলাকা কখনই আমাদের নিয়ে গর্ববোধ করবে না। বড় পরিসরে চিন্তা করতে শিখি। বর্ণভেদ, জাতিভেদ মনোভাব দূরে ঠেলে দেই। অন্যকে অসম্মান করে নিজে সম্মান আশা করা যায় না। অন্য গোত্রকে সম্মান করলেই নিজের গোত্রের সুনাম পাওয়া যাবে।

আরো পড়ুনঃ আমরা নাহয় উত্তরবঙ্গের মফিজ, কিন্তু আপনি?

৫৬ হাজার বর্গমাইলের প্রতিটি ইঞ্চি নিয়েই আমাদের এই প্রাণের বাংলাদেশ। দেশকে ভালোবাসি এটা বলার আগে তো ভালোবাসতে হবে দেশের প্রতিটি ইঞ্চিকে। আসুন, ভালোবাসি দেশটাকে, দেশের সব মানুষ গুলোকে। অপরকে ভালোবেসে অন্যের থেকে নিজের সম্মানটুকু অর্জন করে নিই।

 

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top