বিশেষ

স্টিভেন স্পিলবার্গঃ হলিউডের জীবন্ত কিংবদন্তী

স্টিভেন স্পিলবার্গঃ হলিউডের জীবন্ত কিংবদন্তী- Neon Aloy

২০০২ সালের ৩১ মে, ৫৫ বছর বয়সী মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে লাল গালিচার সামনে, ফিল্ম এন্ড ইলেক্ট্রনিক আর্ট সাবজেক্টে ব্যাচেলর ডিগ্রী অর্জন করতে যাচ্ছে সে। ১৯৬৮ সালেই ডিগ্রীটা অর্জন হতো, সব কোর্স শেষে ন্যূনতম ১২ মিনিটের একটা মুভি এ্যসাইনমেন্ট জমা দিতে হয়। যুবকের এ্যসাইনমেন্ট দেখে তার প্রফেসর হতাশ, বলেছিল– আর যাই হোক, তোমাকে দিয়ে মুভি বানানো হবে না। তার সময়ের প্রফেসররা কেউই নেই, এখনকার প্রফেসররা তার মুভির উপরই পড়াশুনা করেছে। মানুষটা ৩৪ বছর পর তার এ্যসাইনমেন্ট জমা দিলো, মুভির নাম সিন্ডলার’স লিস্ট। সে যখন ডিগ্রী নেয়ার জন্য হেঁটে যাচ্ছে গালিচা ধরে, তখন স্টেজে বাজছে তারই মুভি ইন্ডিয়ানা জোনস ট্রাইলোজির থিম সং।

স্টিভেন স্পিলবার্গঃ হলিউডের জীবন্ত কিংবদন্তী

হ্যাঁ, বলছিলাম স্টিভেন স্পিলবার্গের কথাই। ধনকুবের প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, নির্মাতা যার ঝুলিতে আছে ৩টি অ্যাকাডেমিক অ্যাওয়ার্ডসহ ১৮৩টি পদক এবং ১৮৬টি মনোনয়ন। জুরাসিক পার্ক, সিন্ডলার’স লিস্ট, রাইডারস অব দ্যা লস্ট আর্ক, লিংকন, সেভিং প্রাইভেট রায়ান, মাইনোরিটি রিপোর্ট, ক্যাচ মি ইফ ইউ ক্যান, ব্রীজ অব স্পাইস, ই.টি প্রভৃতি সব মুভি এসেছে তার হাত ধরেই। ১৩ জনের হাতে উঠছে সেরা অভিনেতার অ্যাকাডেমিক অ্যাওয়ার্ড তার মুভি থেকেই।

স্টিভেন স্পিলবার্গঃ হলিউডের জীবন্ত কিংবদন্তী

জন্ম ১৯৪৭ সালের ১৮ ডিসেম্বর অহিও প্রদেশে। পিয়ানোবাদক মাতা লেহা ফ্রান্সেস আর ইঞ্জিনিয়ার বাবা আর্নল্ড স্পিলবার্গের চার সন্তানের একমাত্র ছেলে সন্তান স্টিভেন। বাবার চাকরির সুবাদে ছোটবেলা কেটেছে নিউ জার্সি, অ্যারিজোনা, ফনিক্স আর ক্যালিফরনিয়ার বিভিন্ন জায়গায়। এ জন্যই পড়াশুনায় থিতু হতে পারেন নি। আরও ছিল ডিসেল্কশিয়ার সমস্যা (ডিসেল্কশিয়া এক ধরনের অটিজম, আক্রান্তদের পড়তে এবং লিখতে সমস্যা হয়, প্রায়ই বর্ণের ধারাবাহিকতা গুলিয়ে ফেলে, b লিখতে যেয়ে d লিখে ফেলেছে এমন সমস্যাও দেখা যায়)। এ কারনে সহপাঠী এবং অন্য ছাত্রদের কাছ থেকে কম হয়রানির শিকার হননি। শিক্ষকরাও বাদ ছিলেন না। পড়াশুনার থেকে মানুষ দেখতেই ভাল লাগতো বেশি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতেন বসে বসে আশেপাশের মানুষের কর্মকাণ্ড দেখতে দেখতে। সুযোগ পেলেই ছোটখাটো ফিল্ম বানাতেন। সম্বল ছিল বাবার হ্যান্ডিক্যাম, আর বাকি তিন বোন। এক সময় মনে হল বড় কিছু করার। অ্যারিজোনায় নিজেদের গ্যারাজেই ৫০০ ডলারে সহপাঠীদের নিয়ে বানিয়ে ফেললেন “ফায়ারলাইট” নামক সাইফাই মুভি।

স্টিভেন স্পিলবার্গঃ হলিউডের জীবন্ত কিংবদন্তী

মুভি দেখানো হল ফনিক্স লিটল থিয়েটারে। টিকেটের দাম ছিল ১ ডলার, দর্শকের সংখ্যাও ছিল ৫০০। এক দর্শক খুশি হয়ে ২ ডলার দিয়েছিলেন। ওটাই মুভি থেকে স্টিভেন লাভ করা প্রথম ডলার। ভাল লেগে গেল কাজটা। এ সময় আরও কিছু মুভি বানিয়ে ফেললেন – এসকেপ টু নোহোয়ার, দা লাস্ট গান, ওয়াগন ট্রেন, স্লিপস্ট্রিম। ১৯৬৮ সালে পরিচালনা করলেন “এম্বলিন”। “এম্বলিন” তার সেরা কাজগুলার একটি। এ মুভি তার মনে এতোই দাগ কেটে গেছে যে পরবর্তীতে নিজের প্রোডাকশন হাউজের নাম দেন “এম্বলিন”। এই এম্বলিন প্রোডাকশন হাউস থেকেই আসে ট্রান্সফরমারস, জুরাসিক পার্ক, সেভিং প্রাইভেট রায়ান , ক্যাচ মি ইফ ইউ ক্যান, ই.টি, ব্রীজ অব স্পাইস, লিঙ্কন, দা টার্মিনালের মতো মুভি। এনিমেশনেও কম যায় নি, অ্যাডভেঞ্চার অব টিনটিন, কাস্পের, গ্রিমনিলস, পলটারগ্রেস্ট প্রভৃতি মুভিও এসেছে এ হাউজ থেকে।

ইচ্ছে ছিল ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়াতে ভর্তি হবেন। কিন্তু রেজাল্ট ইচ্ছের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ালো। ভর্তি হতে হল ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট কলেজে। ভর্তি হলেন ঠিকই কিন্তু মন পরে রইলো মুভির জগতে। এ সময়ই পরিচয় হল ইউনিভারসাল স্টুডিওর সাথে। শুটিং স্পটে বসে থাকতেন ঘণ্টার পর ঘটনা। ধীরে ধীরে চেনাজানাটাও হয়ে গেল। গল্পে গল্পে ‘এম্বলিন’ও দেখিয়ে দিলেন একদিন। চমকে উঠলেন স্টুডিওর হর্তাকর্তারা। ছোট্ট দুই বালক-বালিকার ১৬ মিনিটের সাধাসিঁধে গল্পে দেখলেন নতুন সম্ভাবনা। ইউনিভারসাল স্টুডিওর সাথে ৭ বছরের চুক্তি হয়েও গেল। কাজ শুরু করলেন এম.ডি, মার্কাস ওয়েলবি আর কলোম্বিয়া সিরিজের পর্ব পরিচালনা করে।

এককভাবে স্টিভেন স্পিলবার্গের প্রথম পেশাদারী কাজ ‘ডুয়েল’। এক সাধারণ ব্যবসায়ীকে এক নেশাগ্রস্ত ট্রাক ড্রাইভারের তাড়া করার গল্প। দেড় ঘণ্টার মুভিটি তৈরি করতে সময় লেগেছে ১৬ দিন সময় আর ৩৫ লক্ষ ডলার। অথচ ‘ডুয়েল’কে ইউ.এস. মুভি জগতের সেরা মুভিগুলোর একটি বলে ধরা হয়ে থাকে। এ মুভির তৎকালীন (১৯৭১সাল) আয় ৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি। এরপরের গল্পটা শুধুই সাফল্যের।

এককভাবে বড় পরিসরে স্পিলবার্গের প্রথম পরিচালনা ‘দ্যা সুগারল্যান্ড এক্সপ্রেস’(১৯৭৪)। এই মুভির মধ্য দিয়েই স্পিলবার্গ হলিউডের মধ্যমণি হয়ে উঠেন। ১৯৭৫ সালে তাঁর পরিচালনায় মুক্তি পেল ‘জওস’। হাঙরের মতো হিংস্র প্রাণীর আক্রমণ এবং সে প্রতিকূলতার ভিতর থেকে নিজেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার যে গল্প, এ ধারার শুরু এই ‘জওস’ থেকেই ধরা হয়। জওস’ই স্পিলবার্গকে আন্তর্জাতিক মুভি জগতে সমাদৃত করে। এরপর পরিচালনা করতে থাকলেন ‘ই.টি’, ‘লিংকন’, ‘সেভিং প্রাইভেট রায়ান’, ‘মাইনোরিটি রিপোর্ট’, ‘রাইডারস অফ দ্যা লস্ট আর্ক’, দ্যা কালার পার্পল’র মতো বিখ্যাত সব মুভি। প্রযোজনাও করেছেন সমান তালে, ‘ব্যাক টু দ্যা ফিউচার’, ‘ট্রান্সফর্মার’, ‘অ্যান আমেরিকান টেল’, ‘ম্যান ইন ব্ল্যাক’ ইত্যাদি। মুভির সাথে সাথে কাজ করেছেন আরও অনেক বিষয়েই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রেক্ষাপটে তৈরি টিভি সিরিজ ‘ব্যান্ড অব ব্রাদারস’তাঁরই প্রযোজনা। অভিনেতা টম হ্যাঙ্কসকে সাথে নিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফটোগ্রাফারদের নানান ঘটনা নিয়ে তৈরি করেছেন ‘শুটিং ওয়্যার’ নামের ডকুমেন্টারি। ‘মেডেল অফ অনার’ নামক বিশ্বযুদ্ধকেন্দ্রিক ভিডিও গেমের সেটও তাঁর তৈরি।

বলার অপেক্ষা রাখে না, স্টিভেন স্পিলবার্গ এক জীবন্ত কিংবদন্তি। কয়েক দশকের মুভি জগতকে সমৃদ্ধ করে রেখেছেন। বিচরণ করছেন নানান দিকে, দর্শকদের জন্য রেখে গেছেন অসাধারণ সব মুভি। দেয়াটা হয়তো এখনও শেষ হয়নি, কিছুদিন আগেই বের হল তাঁর পরিচালনায়, টম হ্যাঙ্কস এবং মেরিল স্ট্রিপ অভিনীত ‘দ্যা পোস্ট’ মুভিটি।

স্টিভেন স্পিলবার্গঃ হলিউডের জীবন্ত কিংবদন্তী

সমগ্র দর্শক এবং সমালোচকদের ধারণা ‘দ্যা পোস্ট’ও হতে যাচ্ছে স্পিলবার্গের সেরা কাজগুলির একটা। আশা করা যায়, আমৃত্যু মুভি জগতে আরও আলো ছড়িয়ে যাবেন তিনি, বিচরণ করবেন আরও অধিক প্রান্তে। ভবিষ্যতে আরও মনোমুগ্ধকর সব মুভি নিয়ে হাজির হবেন আমাদের সামনে, এ আশা সকল ভক্তদের।

স্টিভেন স্পিলবার্গ সম্পর্কিত কিছু তথ্যঃ

১. ‘সিন্ডলার’স লিস্ট’কে সর্বসময়ের ব্যায়বহুল সাদাকালো মুভির একটি ধরা হয়। কিন্তু অবাক হলেও সত্যি, স্পিলবার্গ এই কাজের জন্য এক টাকাও পারিশ্রমিক নেননি। আউসউইচ কন্সেনট্রেসন ক্যাম্পেই তাঁকে মুভি করার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্যাতিতদের কথা ভেবে এ ক্যাম্পে শুটিংয়ে রাজি হননি তিনি।

২. স্পিলবার্গই প্রথম PG-13র প্রস্তাব দেন। PG-13 হচ্ছে এক ধরনের অনুমতিপত্র। ১৩ বছর বয়স্ক কিংবা তার অধিক বয়সীদের জন্য উপযুক্ত মুভিকেই এই অনুমতি দেয়া হয় । প্রথম যে মুভিকে এ অনুমতি দেয়া হয় তার নাম- Red Dawn(1984)।

৩. স্পিলবার্গ কফি পছন্দ করতেন না। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, তিনি তাঁর পুরো জীবনে এক কাপ কফিও খাননি ।
৪. এই বিখ্যাত পরিচালককে কখনও জেমস বন্ড ফ্রাঞ্চাইজের মুভি পরিচালনা করতে দেয়া হয় নি। দুইবার তাঁকে সরাসরি না বলে দেয়া হয়েছে। ১৯৭৩ থেকে ১৯৮৫ পর্যন্ত সাত মুভিতে জেমস বন্ড চরিত্রে অভিনয় করা রজার মোরও এ কথা স্বীকার করেছেন।

Most Popular

To Top