ফ্লাডলাইট

রেস্তোরাঁর ওয়েটার থেকে ফুটবল ট্রান্সফারের অবিসংবাদিত রাজা!

রেস্তোরাঁর ওয়েটার থেকে ফুটবল ট্রান্সফারের অবিসংবাদিত রাজা!- Neon Aloy

পারিবারিক পিজ্জার দোকানে ওয়েটার হিসাবে কর্মজীবন শুরু। কিন্তু আজ ফুটবল বিশ্বের অন্যতম আলোচিত, বিতর্কিত ও প্রভাবশালী ব্যাক্তিদের একজন। যার অধীনে ফুটবল বিশ্বের নাম করা সব তারকারা। প্রত্যেক বছর ট্রান্সফারে এক একটি চমক সৃষ্টি করেই যাচ্ছেন তিনি। হ্যাঁ, মিনো রায়োলার কথাই বলছি। ওয়েটার থেকে ফুটবলের অন্যতম চমকপ্রদ ট্রান্সফার এজেন্ট এখন তিনি।

মিনো রায়োলা জন্মগতভাবে একজন ইতালিয়ান। ১৯৬৭ সালের ৪ই নভেম্বর ইতালির নচেরা ইনফেরিওরে শহরে তার জন্ম। কিন্তু জন্মের ১ বছর পরেই তার পরিবার ইতালি থেকে নেদারল্যান্ডের হারলেমে পারি জমায়। বেড়ে ওঠা সেই নেদারল্যান্ডেই। সেখানে পরিবারের ভরনপোষনের জন্য পারিবারিক এক ইতালিয়ান রেস্তোরা খোলেন তার বাবা। ছোট্ট বেলা থেকেই সেখানে কাজ করতেন রিয়োলা। লেনদেনের হাতে খড়িও হয় এখানেই। কাস্টমারদের হ্যান্ডেল করা, লেনদেন এবং ব্যবসায়িক চিন্তা ভাবনা দেখে কিশোর বয়সেই পারিবারিক ব্যাবসার দায়িত্ব দেওয়া হয় তার হাতে এবং এতে নিরাশ করেননি মোটেও। ১টি দোকান থেকে ১১টি দোকানে পরিনত করেন অচিরেই। কিন্তু মাত্র ১৯ বছর বয়সে সব ছেড়ে দেন তিনি এই ভেবে যে নিজেকেই কিছু করতে হবে। তবে ২০ বছরে পা দেওয়ার আগেই মিলিয়নিয়ার হয়ে ওঠেন তিনি। লোকাল ম্যাকডোনাল্ডটিকে কিনে প্রোপার্টি ডেভলপারের কাছে বিক্রি করে অচিরেই মিলিয়নিয়ার বনে যান তিনি।

ব্যাবসায় দক্ষ হলেও এর পাশাপাশি পড়তেন ওকালতি। কিন্তু তার ভালবাসার জায়গা ছিল ফুটবল। ফুটবলের নেশায় ওকালতি পড়া ছেড়ে দেন তিনি। ফুটবলেই ক্যারিয়ার গড়তে মনস্থির করেন। বাল্যকালে স্থানীয় ক্লাব ইজ এফ সি হারলেমের ইয়ুথ টিমের হয়ে খেলেছিলেন। কিন্তু প্লেয়ার হিসাবে তার পটেনশিয়াল আগেই বুঝতে পেরেছিলেন তিনি। তাই মাত্র ১৮ বছর বয়সে ১৯৮৭ সালে সেই ক্লাবের ইয়ুথ টিমের হেড হিসাবে যোগ দান করেন। নতুন রোলে গিয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খাননি তিনি বরং নিজের কর্মনিষ্ঠা ও দক্ষতায় সকলকে মুগ্ধ করে তোলেন। একবার এক ডিনারে যান ক্লাব প্রেসিডেন্টের সাথে। কথায় কথায় ক্লাবের প্রেসিডেন্টকে সরাসরি বলে বসেন ” ফুটবল কি তা নিয়ে আপনার জ্ঞান শূন্য।” প্রেসিডেন্ট ও তার প্রতিত্তরে বলেন – ” ঠিক আছে, তাহলে আমার দায়িত্বটা আজ থেকে তোমার।” এই যে হল শুরু। এভাবেই অল্প বয়সেই রায়োলা হয়ে ওঠেন ক্লাবটির স্পোর্টিং ডিরেক্টর।

হারলেমকে নিয়ে রায়োলার যে আকাশচুম্বী পরিকল্পনা ছিল যা ক্লাবের পক্ষে পূরণ করা সম্ভব ছিলনা। ক্লাবের ডিরেকশন নিয়ে বোর্ডের সাথে প্রায়ই দ্বন্দ্ব লাগতো তার। বিবাদে লিপ্ত হয়ে পদত্যাগ করেন রায়োলা। হারলেমের ডিরেক্টর হয়ে “ইন্টারমেতজো” নামের একটি ফুটবল এজেন্সি গঠন করেন তিনি। এজেন্ট হিসাবে তার যাত্রা শুরু হয় এখানেই। ইন্টারমেতজো এজেন্সির কাজই ছিল ডাচ প্লেয়ারদের ইতালিতে ট্রান্সফারে অন্যান্য এজেন্ট বা এজেন্সিকে সহযোগিতা করা। রায়োলা দ্বিভাষী হওয়ায় তার পক্ষে সুবিধাই ছিল। দুই পক্ষের ডিসকাশনগুলো তার মাধ্যমেই হত। এসময় তিনি ব্রায়ান রয়, মার্সিয়ানো ফিঙ্ক ও উইম ইয়ংকের মত ইন্টারন্যাশনাল ফুটবলারদের সিরিয়াতে আনতে সহযোগিতা করেন।

ব্রায়ান রয়ের ট্রান্সফারে তার ভূমিকা দেখে তৎকালীন সময়ে নেদারল্যান্ডের অন্যতম নামকরা এজেন্ট রব ইয়্যান্সেন রায়োলোর সাথে যোগাযোগ করেন। ইয়্যান্সেন তার একটি ক্লায়েন্টকে সিরিয়ায় আনতে রায়োলার সাহায্য চান। প্লেয়ারটির নাম? ডেনিস বার্গক্যাম্প।রায়োলার সহযোগিতায় ১৯৯৩ সালে আয়্যাক্স থেকে ইন্টার মিলানে আসেন বার্গক্যাম্প। রব ইয়্যান্সেন রায়োলার কাজে মুগ্ধ হয়ে তার এজেন্সি স্পোর্টস প্রোমশন্সে তাকে এজেন্ট হিসাবে নিয়োগ দেন। তবে যে কিনা উড়তে অভ্যস্ত তাকে কি বেধে রাখা যায়! অল্প সময় পরেই সেই চাকরি ছেড়ে নিজ ক্যারিয়ার গড়তে মনোনিবেশ করেন তিনি। সে সময়ে সিরিয়ার অন্যতম সেরা কোচ জিদেনেক জেমানের সাথে বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার। জেমান তখন খোঁজে ছিলেন একজন পার্ফেক্ট প্লেয়ারের। রায়োলাও ডাকে হতাশ করেননি। তাকে এনে দেন সে সময়ের চেক প্রজাতন্ত্রের সেরা ট্যালেন্ট এবং ভবিষ্যৎ ব্যালন ডি’অর জয়ী পাভেল নেদভেদকে।

পাভেল নেদ্ভেদের সাথে মিনো রায়োলা

নেদভেদর মত হাই প্রোফাইল ক্লায়েন্টের ট্রান্সফারের পর আর তাকে পিছে তাকাতে হয়নি। পরবর্তীতে ২০০১ সালে লাৎসিও থেকে জুভেন্তাসে আসেন নেদভেদ। নেদভেদ লাৎসিওতে বেশ খুশিই ছিলেন। রায়োলার প্রতি তার ছিল অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস। রায়োলা তাকে জুভেন্তাসের কথা বললে তিনি জুভেন্তাসেরর সাথে আলোচনায় রাজি হন। যদিও গোপনে দেখা করার কথা, জুভেন্তাসের ডিরেক্ট্রর মগি আগে থেকেই মিডিয়ার কাছে তথ্য ফাঁস করে দেন এই আশায় যে যদি গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়ে যায় রাইভাল ক্লাবের সাথে গোপনে মিটিং এর কথা, এর মাধ্যমে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে অর্থের ব্যাপারটা কমে যাবে। কিন্তু হল তার ঠিক বিপরীত। রায়োলা দাবি করে বসেন জিনেদিন জিদানের সমান বেতন দিতে হবে নেদভেদকে। জুভেন্তাসর খেলা তাদের ওপরই চড়াও হল। তাদের মিটিং এর মাঝে নেদভেদ বলে উঠল, “মিনো আমি বাড়ি যাচ্ছি। এই নাও আমার সই। তুমি আমার এজেন্ট। তুমি যদি চাও তাহলে ট্রান্সফার হবে, আর না চাইলে নাই। আমাকে পরে জানিয়ে দিও।” এই বলে মিটিং ছেড়েছিলেন তিনি। জুভেন্তাসের মিডিয়া স্টান্টের কাছে পরাজিত তো হলই না বরং রায়োলার দাবি না মানলে ট্রান্সফার বাতিল! এতে বরং তাদের নিজ ক্লাবেরই ইমেজ খারাপ হবে। এই ভেবে দাবি মানতে রাজি হয়েছিল জুভেন্তাস। আর ততক্ষণে রায়োলা তার ডিমান্ড আরও বাড়িয়ে দেন। ফলে পরাস্তই হতে বাধ্য হয় স্বয়ং জুভেন্তাসই।

২০০১ সালে রায়োলা আরেক ভবিষ্যৎ সুপারস্টারকে তার অধীনে আনেন, আর সে হচ্ছে জ্বলাতান ইব্রাহিমোভিচ। ইব্রাহিমোভিচের সাথে প্রথম দেখা করার সময় ইব্রার পড়নে ছিল দামি স্যুট, হাতে গোল্ড ওয়াচ। কিন্তু রায়োলা যান টি-শার্ট ও জিন্স পড়ে। তাকে দেখে ইব্রা বেশ অবাকই হয় এবং তাচ্ছিল্লো করেছিলেন ।
তার এই ব্যবহার দেখে রায়োলা বলেন – “তুমি কি চাও বিশ্বসেরা নাকি শো-অফ?”
তার কথায় ইব্রা বুঝতে পারেন একেই তার দরকার। আর এভাবেই ইব্রার এজেন্ট বনে যান রায়োলা।

শুধু নেদভেদ, ইব্রাই নয় ততার ঝুড়িতে আছে রোমেরো, মিখিতারিয়ান, পগবা, বালোতেল্লি, লুকাকু, ভেরাত্তি, মাতুইদি, ডনারুমাকের মত মহা তারকাদের একে একে সাইন করিয়েছেন তিনি। তবে তার ক্লায়েন্টদেরকে কখনও ক্লায়েন্টের চোখে দেখেননি রায়োলা। বরং তার কাছে তারা সবাই যেন তার পরিবারেরই অংশ। তাই ক্লায়েন্টদের জন্য চেষ্টার কখনও কোন কমতি রাখেননা তিনি। রায়োলার সাথে তার ক্লায়েন্টরা এতই ঘনিষ্ঠ যে দৈনন্দিন জীবনের ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র বিষয় গুলো নিয়েও রায়োলার উপদেশ-পরামর্শ নিয়ে থাকেন তারা। তার আলোচিত আরেকটি ট্রান্সফার হল পগবা। পগবাকে নিয়ে দুইবার বিতর্কের মুখোমুখি হন তিনি। ম্যান ইউনাইটেডের একাডেমিতে থাকার সময়ই পগবার সাথে চুক্তিবদ্ধ হন তিনি। কিন্তু ইউনাইটেডের কন্ট্র্যাক্ট মেনে নিতে পারেননি তিনি। মেনে না নেওয়ায় স্যার এলেক্সের সাথে বিবাদ বাঁধে তার। ইউনাইটেডের কাছে পগবার জন্য নির্দিষ্ট গেমটাইম ও বেশি বেতনের দাবি করেছিলেন তিনি। না মানলে পগবাকে ফ্রী-তেই নিয়ে আসেন জুভেন্তাসে। আবার ৪ বছর পর সেই জুভেন্তাস থেকেই বিশ্ব রেকর্ডের বিনিময়ে আবারও ইউনাইটেডে ফিরিয়ে আনেন পগবাকে। ট্রান্সফার জিনিয়াস যাকে বলে! মোরিনহো কোচ হবার পর একই গ্রীষ্মে ইব্রা, পগবা ও মিখিতারিয়ানকে ইউনাইটেডে নিয়ে আসেন রায়োলা। এই মৌসুমে এনেছিলেন লুকাকুকে। চেলসির মূল টার্গেট হলেও শেষ মুহুর্তে এসে লুকাকুর ইউনাইটেডের জার্সি বেছে নেওয়ার পিছে রায়োলার যে প্রভাব ছিল তা আর বলতে! আর একের পর এক হাই প্রোফাইল ট্রান্সফারের মাধ্যেমে পকেটও ভারি করিয়য়েছেন বেশ। যার ফলে ২০১৬ সালে তিনি আয় করেছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর থেকেও বেশি। আমেরিকার মায়ামিতে বিখ্যাত গ্যাংস্টার আল কাপোনের বাড়িও কিনে নিয়েছেন সেই টাকায়।

রায়োলার সাথে পগবা

এজেন্টরা যেন ফুটবলার এবং ক্লাবগুলোর মধ্যে সুতার বাঁধন। “কান টানলে মাথা আসে” কথাটির যতার্থ প্রয়োগই যেন এই এজেন্টরা। আজ ফুটবলাররা চায় অর্জন, ট্রফি বা ব্লাঙ্ক চেজ। আর তা তাদের পাইয়ে দিতে মিনো রায়োলার মত আর কেউই নেই। যত বিতর্কই থাকুক, ফুটবল ট্রান্সফারে যেদিকে চোখ গিয়েছে হাসিল করে ছেড়েছেন। আর বনে গেছেন ফুটবল ট্রান্সফারের অবিসংবাদিত রাজা।

Most Popular

To Top