বাউন্ডুলে

যে পাড়ার ঘর বাড়ির কোন দরজা নেই!

যে পাড়ার ঘর বাড়ির কোন দরজা নেই!

ঘরে দরজা না থাকলে আমাদের দেশে কি কি হতে পারে একবার চোখ বুজে কল্পনা করুন তো। চুরি, সে তো নির্ঘাত। এক রাত দু’রাত করে কয়েক রাত পেরিয়ে গেলেও কোনও না কোনও এক রাতে আপনার ঘরের মূল্যবান জিনিসটি এক দিন না একদিন খোয়া যাবেই। সে আপনি গ্রামে গঞ্জে, চরে যেখানেই থাকুন না কেনো। এরপর ডাকাতি, খুনসহ নানান অনিরাপত্তায় ভুগেই তো আপনি ঘরে দরজা আটকিয়ে ঘুমান। তাই নয় কি? শুধুতো আটকানো না, দরজার খিলটি ঠিকমতো লাগলো কিনা, ছিটকিনিটা নড়বড়ে কিনা, পারলে আরও সাথে দু চারটা বাড়তি তালা ঠিকঠাক লক করা হলো কিনা তা রাতে ঘুমানোর আগে চেক না করলে ঘুমাতেই কারও কারও অস্বস্তি লাগে। ঘরে মূল্যবান জিনিস থাকলেতো কথাই নেই। কেউ কেউ দরজার ভেতরেও আরও একটি দরজা লাগান ইদানিং। যেনো প্রথম দরজা বন্ধ করেও আস্থা নেই, যেকোনও সময় চোর ডাকাত সন্ত্রাসী ওটা ভেঙ্গে ঘরে ঢুকে যেতে পারে। তাই অনেকেই এখন কাঠের দরজার ভেতর বাহিরে আরও একটি গ্রীলের দরজা করেন। এটি আমাদের দেশের শহর গ্রামসহ সব জায়গাতেই এখন দেখা যায়।

কিন্তু এই দেশেই একটা বিস্তৃর্ণ জনপদ আছে, যেখানে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বসবাস। তারা কেউ দরজা লাগান না। ব্যাপারটা হলো, তাদের ঘরে আসলে দরজাই নেই। বিশ্বাস হয়? কিন্তু দরজা না থাকলেও তাদের ঘরে কোনও চুরি ডাকাতি হয় না। তাদেরকে কেউ এসে ঘুমের মাঝে খুন করে যায় না।

হ্যাঁ, বলছি বাংলাদেশের বিস্তৃর্ণ পার্বত্য অঞ্চলের কথা। যেখানে ডজন খানেক ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের বসবাস। মূলত পার্বত্য জেলা উপজেলা সদর থেকে একটু গহীনে, একটু দূর্গমে হাজার হাজার মানুষের হাজার হাজার ঘর বাড়িতে কোনও দরজা নেই। দরজা নিয়ে তাদের মাথা ব্যথাও নেই।

প্রথমে একজনের বাড়ির গল্প শোনাই। তাতে অন্যদের সম্পর্কে আপনরাদের খানিক ধারনা হবে হয়তো। রাঙ্গমাটি শহর থেকে কমপক্ষে শত কিলোমিটার দূরের গল্প। জায়গাটি পড়েছে বিলাইছড়ি উপজেলায়। বিলাইছড়ি থেকে ইঞ্জিন নৌকায় যেতে হয় কমপেক্ষ ৫ ঘন্টার পথ। তারপর আমাদের এই সমতলের মানুষদের প্রায় এক দিনের পথ পাড়ি দিতে হয় পাহাড়ি দূর্গম পথে।

এক পাহাড় দু পাহাড় করে প্রায় ২ হাজার ফুট উপরে ধূপপানি পাহাড়ে ধূপপানি পাড়া। সেখানে আছে ভাগ্যধন তঞ্চঙ্গার বাড়ি। বলতে গেলে একটা চূড়া বিস্তৃত বাড়ি। আগে পেছনে দুটি ঘর। মাচাং করা। ভাগ্যধন তঞ্চগ্যা অতিথিদের সাবলিল ভঙ্গিতে থাকতে দেন তার বারান্দায় বিছানা করে। নিজে পরিবার নিয়ে ঘরে থাকেন। কিন্তু সে ঘরে কোনও দরজা নেই। দরজার কথা তুলতেই যেনো অবাক হয়ে গেলেন। এটার যে কোনও প্রয়োজনীয়তা আছে সেটাই যেনো তিনি বোঝেন না। শুধু ভাগ্যধনের নয়, ধূপপানি পাড়ায় যে দেড়শো পরিবারের ঘর আছে তার কোনওটিতেই কোনও দরজা বলতে নেই। ভাগ্যধন বুঝিয়ে বলেন, কি হবে দরজা দিয়ে। এখানে তার জন্মের পর থেকে গত ৫০ বছরে কোনও চুরির কথা আশ পাশের ত্রিতল্লাটেও শোনেননি, নিজেদের পাড়ায়তো নয়ই। সবাই সবাইকে চেনে। কে চুরি করবে? রাতের পর রাত জুমের মাচায় কাটিয়ে দিচ্ছেন ঘরবাড়ি ফাঁকা ফেলে রেখে। কই কিছুতো হচ্ছে না।
ঘরে যে একেবারে মূল্যবান জিনিস বলতে কিছু নেই, তাও কিন্তু না। আধুনিকতার ছোঁয়া ঐ পাহাড়েও লেগেছে। ঘরে মোবাইল ফোন, চার্জার, টর্চসহ টুকিটাকি ইলেকট্রনিকস জিনিস, জামা কাপড় আর টাকাতো থাকেই। এই পুরো অঞ্চলে নিজেদের মধ্যে কোনও অসামাজিক কাজ বা কোনও নারীর শ্লীলতাহানির খবর কেউ বলতে পারবে না। ধুপপানি পাড়া থেকে আরও উপরে গেলে পাংখুইয়া পাড়া বা মং পাড়াতেও একই অবস্থা। তারা দরজা ব্যবহার করেন না।

বিলাইছড়ির পুষ্প চাকমা একটু শহরে যাতায়াত করেন বেশী। পথ চলতে চলতে দরজা প্রসঙ্গ তুলতেই বলেন, আসলে-বলেনতো এখানে কেউ কোনও অপরাধ করে পালাবেটা কোথায়? পালাতেও তো তার সারা দিন যাবে। যাবেও কোথায়? এক পাড়া না অন্য পাড়ায়তো ধরা পড়বেই। আসলে সামাজিক বন্ধন আর প্রকৃতির চিরন্তন নিয়মে বাঁধা এখানকার জীবনটা এমন যে মানবসৃষ্ট দূর্যোগ এখানে খুব একটা নাই বললেই চলে, তাই দরজাও নাই। এই ভাগ্যধন বা পুষ্প চাকমার মতো মানুষদের নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে বিস্তৃত পর্বতেও সরল মানুষের সরল জীবনে দরজার অস্বিত্ব না থাকা যেনো অন্যরকম এক সামাজিক শৃংখলা শিখিয়ে দেয়। খাগড়াছড়ি থেকে সাজেকের পথে অনেকেই গিয়েছেন। যাবার পথে পাহাড়ের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছোট ছোট আদিবাসী পাড়াগুলোতে কতজনের পা ফেলার ভাগ্য হয়েছে? গিয়ে দেখুন, ওগুলোর বেশীর ভাগেই কোনও দরজা নেই। দিব্বি চলছে তাদের জীবন। পুলিশ, চৌকিদার, নাইটগার্ড দিয়ে তাদের রাতভর পাহাড়া দিতে হয় না। যেখানে শহুরে মানুষের এখন শুধু পাহাড়াদারে হয় না। শর্টগান হাতে নিরাপত্তা সংস্থার চৌকস প্রহরী লাগে। পুষ্প রম্য করে বলে যায়, কদিন পরে আপনাদের শহুরে মানুষদের রাতের বেলাটা বাড়ির সামনে স্টেনগান, কামান, ট্যাংক নিয়ে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য পাহাড়া দেয়া লাগতে পারে।

বান্দরবনের কথা বলি এবার। বান্দরবনের থানচি, রোয়াংছড়ির দূর্গম পাহাড়ি বসতি দেখেছেন কখনও? থানচি হয়ে রেমাক্রি যান। তারপর নাফাকুম আমিয়াকুম হয়ে সাহস থাকলে মিয়ানমান বর্ডারে যান। দেখবেন ওদের বাড়ি ঘরে দরজা লাগে না। রোয়াংছড়ি উপজেলা সদর পার হয়ে বেশী দূর যেতে হবে না। সদরে বাইরে গেলেই দেখবেন দরজা বিহীন শতশত পাড়া আর সেখানকার ঘরবাড়ি। আর রোয়াংছড়ি হয়ে যদি এক দুদিন খাড়াসব দূর্গম পাহাড় ডিঙ্গাতে পারেন তাহলে রনিনপাড়া, শংখমণি পাড়া বা আপনারা যদি তিনাপসাইতার যেয়ে থাকেন তাহলে তার আশপাশের পাড়াগুলো কি দেখেছেন? আবার যদি যান তো খেয়াল করে দেখবেন বেশীরভাগ পাড়াতেই ঘরে দরজা নেই, লাগে না। কিংবা থানচি থেকে তাজিংডং হয়ে পাহাড়ি পথে কেওক্রাডং পথটায় গিয়ে দেখতে পারেন দরজাবিহীন কেমন সামাজিক নিরাপত্তার জালে নিশ্চিন্তে ঘুমান আমাদের পাহাড়ের আদি মানব গোষ্ঠী।

Most Popular

To Top