নাগরিক কথা

ভাষা আন্দোলন কি শুধু একদিনের জন্য?

ভাষা আন্দোলন কি শুধু একদিনের জন্য?

[বিঃদ্রঃ এখানে বাংলার মাঝখানে ইংরেজীর ব্যবহারকে উৎসাহিত করার জন্য নয় বরং লেখার প্রয়োজনে কিছু ইংরেজী শব্দের ব্যাবহার করা হয়েছে।]

দৃশ্যপট এক
বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম প্রথম ক্লাস শুরু হয়েছে, ক্লাস করছি। টেকনিক্যাল সাবজেক্ট নিয়ে পড়ছি তাই নাকি সব বই ইংরেজীতে লেখা, না হলে উন্নত বিশ্বের পড়ালেখার সাথে তাল মেলানো যাবেনা। ইংরেজী মাধ্যম স্কুলে বেশ কয়েক বছর পড়ার সুবাদে ইংরেজী নিয়ে আমার তেমন সমস্যা হতো না, কিন্তু কয়েকজন বন্ধুকে দেখতাম ইংরেজীতে অনেক কঠিন কঠিন “সাইন্টিফিক টার্ম” এবং বর্ণনা পড়ে পরীক্ষার খাতায় ইংরেজীতে উত্তর লিখতে গিয়ে তাদের সমস্যা হচ্ছে।

এক-দুইজন “এডভ্যান্স” বন্ধু সেই প্রথমবর্ষ থেকেই “আইএলটিএস” এর কোচিং আরম্ভ করল এবং তারা কারণে-অকারণে ঢং করে ইংরেজী বলে বলে নিজেদের “স্মারটনেস” দেখাতে লাগল।

দৃশ্যপট দুই
রাত এগারটা পঁয়তাল্লিশ, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের নিচের গেইট থেকে কর্তৃপক্ষের আদেশমত দারোয়ান বাঁশি বাজাচ্ছে নিচে নেমে এসে মহান ভাষাশহীদ দিবস উপলক্ষে শহীদ মিনারের বেদীতে পুষ্পস্তবক অর্পণের র‍্যালীতে যোগ দেওয়ার জন্য। তারপরেও হলে অবস্থানকারী অনেকেরই কোনো মাথা ব্যাথা নেই, তারা বাতি নিভিয়ে যে যার কক্ষে চুপচাপ বসে আছে যেন কর্তৃপক্ষ ডাকতে এলে মনে করে সব ছাত্রী ঘুমিয়ে গিয়েছে। আরো পনের মিনিট অপেক্ষার পরে মাত্র দশ-পনেরজন ছাত্রী নিয়ে র‍্যালীটি চলে গেল, তবে এরা প্রায় সবাই প্রথম বর্ষের ছাত্রী, কর্তৃপক্ষের নির্দেশ না মেনে বাতি নিভিয়ে ঘুমিয়ে থাকার মত এতটা সাহস তাদের হয়নি এখনো।

দৃশ্যপট তিন
জাপানে আসলাম বৃত্তি নিয়ে। উদ্দ্যেশ্য হলো নিজের পাঠ্যবিষয়ের উপরে হাতে-কলমে আরো উচ্চতর শিক্ষা নেওয়া। আমার জাপানী শিক্ষক এসে বিমানবন্দর থেকে আমাকে বাসায় নিয়ে যাচ্ছেন, রাস্তায় দেখলাম সবকিছুই জাপানী ভাষায় লেখা। শুধু রাস্তার নাম্বার নির্দেশকগুলোতে ইংরেজী নাম্বার আর ইংরেজীতে রাস্তার নাম।

প্রথম দিন হাসপাতালে গিয়ে কাজ শুরু করলাম, সেখানে কর্মচারী এবং চিকিৎসক প্রত্যেকেই নিজ নিজ কাজে দক্ষ আর উচ্চতর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। কয়েকজনের হাতে দেখলাম জাপানিজ-ইংলিশ অনুবাদ করার ডিকশনারী। তারা আমার সাথে কথাবার্তা চালানোর জন্য এই ডিকশনারী ব্যাবহার করছে। হাসপাতাল এবং ল্যাবে অনেক ইউরোপিয়ান দেশ থেকে আমদানী করা যন্ত্রপাতি আছে কিন্তু সব কিছুর পাশেই জাপানী ভাষায় নিয়মাবলী লেখা। রাস্তায় কোথাও বের হতে গেলে আমার মোবাইল বের করে গুগল ট্রান্সলেটর দিয়ে ইংরেজী ভাষাকে জাপানী ভাষায় রূপান্তরিত করে সেটা দেখিয়ে মনের ভাব বোঝাতে হতো।

একুশে ফেব্রুয়ারীর দিন দুপুরবেলা সবার সাথে দুপুরে খেতে বসেছি। হঠাৎ আমার সুপারভাইজার আমাকে বললেন, ‘আজকে তো “ইন্টারন্যাশনাল ল্যাংগুয়েজ ডে”, তোমাদের “বেঙ্গল” ভাষার স্মরণে আজকে এই দিনটি উদযাপিত হচ্ছে সারা পৃথিবীজুড়ে, তোমাদের দেশে কি হচ্ছে এই দিবসটি নিয়ে?’

পরে আমি ইউটিউবে সার্চ দিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারিতে প্রভাতফেরির ভিডিও দেখালাম এবং ইতিহাস বললাম ভাষা আন্দোলনের। তারা বলল, “তোমরা অত্যন্ত আবেগী এবং দেশপ্রেমিক জাতি,আমাদের তো ভাষার জন্য কোনো আন্দোলন করতে হয় নাই”। আরেকজন শিক্ষক বললেন, “এখানে জাপানে কিন্তু তোমাদের ভাষা দিবসের স্মরণে ইকেবুকুরোতে একটা শহীদ মিনার আছে। আমি গতবার একটা সেমিনারে যাওয়ার সময় ওটা দেখেছি। বাংলা ভাষা আসলেই অত্যন্ত ভাগ্যবান যে তোমাদের মত একদল আবেগী মানুষের ভাষা এটি”।

আমি সবসময় নিজের জীবনের ঘটনাগুলোর প্রেক্ষাপটে আমার লেখার রসদ খুঁজে পাই, তাই সাধারণত “জীবন থেকে নেওয়া” কথাবার্তাই উঠে আসে বেশি। উপরের যতগুলো দৃশ্যপট আমি বর্ণনা করেছি তার প্রথম দুটির সঙ্গেই আমার মত আপনারাও কম বেশি পরিচিত।

আমাকে জাপানী সহকর্মীরা যখন এসব কথা বলছিল তখন আমার চোখে ভেসে উঠছিল প্রভাতফেরীতে ফুল দেওয়ার জন্য ধাক্কাধাক্কি। অর্ধেক ইংরেজী আর অর্ধেক বাংলায় বলা তরুণ-তরুণীদের কথাগুলো কিংবা একুশে ফেব্রুয়ারী উপলক্ষে কিছুক্ষণ দেশাত্মবোধক গান বাজিয়ে পরে হিন্দি বা পশ্চিমবঙ্গের সিনেমার গান বাজানো।

আমাদের প্রাণের এই ভাষার জন্য যদি কেউ নিজেদের পরিবারের কথা কিংবা নিজের জীবনের কথা না ভেবে অকাতরে প্রাণ দিয়ে আসতে পারে, তাহলে কেন আমরা পারবনা ষাট বছর পরেও সেই ভাষাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটা উচ্চ অবস্থানে নিয়ে যেতে?
কেন আমাদের কাছে মনে হবে শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের স্মরণে ফুল দেওয়া শুধু ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস কিংবা রাজনৈতিক কোন ফায়দার জন্য প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে?

নিজের এপার্টমেন্টে চুপচাপ নির্জনতার মাঝে বসে আছি। জাপানে মানুষ হইচই করতে পছন্দ করেনা যে যার মত থাকে। অথচ এক বছর আগের এই দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকা অবস্থায় আশপাশের হিন্দি গানের ভিড়ে আমি টিকতে পারতাম না। অক্ষম আক্রোশে শুধু ফেসবুকে এ নিয়ে পোস্টটাই দিতে পারতাম কারণ আর কিছু করার সামর্থ্য আমার নেই।

বিশ্বের বড় বড় সব গবেষক কিংবা লেখকদের বইগুলো জাপানী ভাষাতে অনূদিত হয়ে তারপরেই বিক্রি হয়। স্কুল কলেজ থেকে আরম্ভ করে এমনকি উচ্চতর শিক্ষাতেও তারা জাপানী ভাষাই ব্যবহার করে থাকে। তাহলে আমাদের ভাষাকে কেন আমরা এমন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারবনা? আমার এক সিনিয়র আপু, নাম বললে হয়তো অনেকেই চিনবেন কারণ উনি এই বয়সেই নিজের চেষ্টায় একটা সফল প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়েছেন এবং তার এমন অবদানের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্মাননাও পেয়েছেন। বেচারি বাংলা ভাষায় সহজভাবে যাতে ছাত্র-ছাত্রীরা বুঝতে পারে সে উদ্দ্যেশ্যে আমার পাঠ্য বিষয়টার কিছু “টপিক” নিয়ে একটা বই লিখেছিলেন, তাতেই উনাকে অনেক অপমানজনক কথাবার্তা শুনতে হয়েছে, যে ইংরেজী পড়তে পারেনা সে এমন “টেকনিক্যাল” সাবজেক্টে কেন পড়তে আসবে এমন কথাও লেখা হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়!

শুনেছি বিশ্বযুদ্ধের পরে জাপানের সর্বস্তরের মানুষকে নাকি একটা বার্তা পৌছিয়ে দেওয়া হয়েছিল সম্রাটের কাছ থেকে। সেখানে বলা ছিল যে যার যার অবস্থানে থেকে নিজের দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করতে যেন বিশ্বকে দেখিয়ে দেওয়া যায় যে জাপান ধ্বংসস্তূপ থেকে আবার নতুন করে উঠে দাঁড়াতে পারে শুধু দেশপ্রেমের জন্য।

যে বাঙ্গালী জাতি ভাষার জন্য সংগ্রাম করেছে, স্বাধীনতার জন্য অজস্র ত্যাগ স্বীকার করেছে সে জাতির কখনো দেশপ্রেমের অভাব আছে বলে আমার মনে হয়নি।

তারপরেও কেন আমাদের কাছে বাংলা ভাষা এত অবহেলিত? কেন শুদ্ধভাবে বাংলা ভাষায় কথা বলার চেয়ে একটু “ইংলিশ একসেন্ট” মাখিয়ে আধো আধো বোলে, “আমি চিকেন ফ্রাই খুব লাভ করি, টোমার ফেভারিট ফুড কি?” এমন বলাটাই এখন স্মার্টনেস হয়ে দাঁড়িয়েছে?

ভাষার বিকৃতির জন্য এফএম রেডিও কিংবা টেলিভিশনের নাটকের কথা বলে লাভ নেই। আপনি যেহেতু জানেনই এভাবে বললে ভাষার বিকৃতি হচ্ছে তাহলে আপনি কেন তাদের মত করে কথা বলবেন?

মাতৃভাষা মানে হলো মায়ের ভাষা,সে হিসেবে আমার মাতৃভাষা বাংলা নয়।কিন্তু তারপরেও আমি সবসময় চেষ্টা করি এই ভাষাকে শুদ্ধভাবে বলার জন্য, কারণ আমার কাছে মনে হয় আমার এই শুদ্ধভাবে বাংলা ভাষায় কথা বলাটা শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের সম্মানে ফুল দেওয়ার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

অন্যদের দোষ ধরা বাদ দিন। দেশের দুর্নীতি নিয়ে কথা বলাটাও উহ্যই থাক। আজ থেকে নাহয় সবক্ষেত্রে শুদ্ধভাবে বাংলাটাই বলি, অন্যকেউ বলতে উৎসাহিত করি।

Most Popular

To Top