ইতিহাস

ভাষা আন্দোলন এবং আমাদের যত লজ্জা…

ভাষা আন্দোলন এবং আমাদের যত লজ্জা...

ভাষা সৈনিক বা সংগ্রামীদের পূর্ণাঙ্গ কোন তালিকা নেই সরকারের কাছে। এ নিয়ে কোন সরকারই কোন কার্যক্রম হাতে নেয়নি কখনো। ২০১০ সালে ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ’ নামে একটি সংগঠনের পক্ষে আইনজীবী মনজিল মোরশেদ হাইকোর্টে রিট করেন। রিটে তিনি ভাষা আন্দোলনে জড়িতদের তালিকা তৈরীর আবেদন জানান। এই আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০১০ সালের ২৫ আগস্ট ভাষা সৈনিকদের তালিকা তৈরি করতে সরকারকে নির্দেশ দেয় উচ্চ আদালত।

সেই নির্দেশনার পর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করে, তারা প্রাথমিকভাবে ৬৬ জনের নাম দিয়ে একটি গেজেট প্রকাশ করে।এরপর নানা জটিলতার কথা বলে স্থগিত হয় সেই কাজ।

সর্বশেষ গত বছর অর্থ্যাৎ ২০১৭ সালের ১৯ জানুয়ারি ৬ মাসের মধ্যে নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে আবারো নির্দেশ দেয় উচ্চ আদালত। আদালতের এই নির্দেশের পর এক বছর পেরিয়ে গেলেও তালিকা তৈরির আর কোন উদ্যোগ নেয়ার কথা জানা যায়নি। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত বা প্রচার হয়। গণমাধ্যমের কাছে ক্ষোভ জানান ভাষা সংগ্রামীরা।

আমরা কখনো ভাষা সংগ্রামীদের সর্বজন গৃহীত একটি তালিকা পাবো কিনা সেই প্রশ্ন প্রশ্নই থেকে গেলো আজও।

এছাড়া, ২০১০ সালের ২৫ আগষ্টে দেয়া আদালতের সেই নির্দেশনার মধ্যে আরো ছিলো বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণ ও এর মর্যাদা রক্ষা করার পাশাপাশি শহীদ মিনারের পাশে গ্রন্থাগার নির্মাণেরও আদেশ দিয়েছিলো আদালত। এই আদেশও এখনো কার্যকর হয়নি। আদেশের আট বছর পর এখনো দেশের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই নেই শহীদ মিনার।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের দেশে নির্মাণ হয়েছে অনেক চলচ্চিত্র। বলা হয়ে থাকে ‘ভাষা আন্দোলন’ এর মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বীজ বোপন হয়েছিলো। কিন্তু এর ইতিহাস তুলে ধরতে নির্মাণ হয়নি তেমন কোন চলচ্চিত্র। বলা হয়ে থাকে চলচ্চিত্র ইতিহাস রক্ষায় ও প্রজন্মের কাছে ইতিহাস তুলে ধরতে ভূমিকা রাখে। তবে, সেখানেই অবহেলিত ‘ভাষা আন্দোলন’। ১৯৭০ সালে জীবন থেকে নেয়া চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন নির্মাতা জহির রায়হান। সেখানে খুব ভাসা ভাসা ভাবে এসেছে ভাষা আন্দোলনের বিষয়টি। উল্লেখযোগ্য বিষয় এই চলচ্চিত্রেই পরিচালক জহির রায়হান ব্যবহার করেছিলেন আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি গানটি। এর মাধ্যমেই গানটি পায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা। কিন্তু এরপরও এটি স্বাধীনতার আগে নির্মিত চলচ্চিত্র। স্বাধীন বাংলাদেশে শুধু ‘ভাষা আন্দোলন’ নিয়ে কোন চলচ্চিত্রের নাম বলতে পারবেন? পরিচালক শহীদুল ইসলাম খোকন নির্মাণ করেছিলেন ‘বাঙলা’ নামে একটি চলচ্চিত্র। প্রখ্যাত সাহিত্যিক আহমেদ ছফার ‘ওংকার’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এ চলচ্চিত্রে শেষ দৃশ্যে এক বোবা মেয়ের মুখের বুলিতে বাঙলা কথাটি ফুটে উঠে। এ ছবিতেও ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিক ইতিহাসের পরিষ্কার কোন কাহিনী নেই। সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিবছরই তথ্যমন্ত্রণালয় চলচ্চিত্র নির্মাণে অনুদান দেয়। এ স্বত্তেও কেনো ভাষা আন্দোলনের পুরো প্রেক্ষাপট নিয়ে কেনো কোন সিনেমা স্বাধীন দেশে নির্মাণ হচ্ছে না?- এ প্রশ্নের কোন যৌক্তিক জবাব নেই কারো কাছে।

আমাদের একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বিশ্বের অনেক দেশেই মর্যাদার সাথে এদিনটি পালন করা হয়। তাবে বাংলাদেশীদের বাংলা ভাষার শুদ্ধ ব্যবহার নিয়েও বিতর্ক কম নয়। বিভিন্ন এফএম রেডিওর উপস্থাপকদের অদ্ভুত উচ্চারণে ইংরেজি ঢঙ্গে বাংলা বলা নিয়ে গত কয়েকবছর ধরেই চলছে আলোচনা- সমালোচনা। এ নিয়েও হাইকোর্ট রুল জারি করে ২০১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ও ২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। দুটি আদেশেই বেতার ও টিভিতে বিকৃত উচ্চারণে বাংলা ব্যবহার করে অনুষ্ঠান প্রচার না করতে নির্দেশ দেয়া হয়। এরপর যেনো কে শোনে কার কথা!

সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদে বলা আছে বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। সংবিধানের এ বিধান ঠিকভাবে যেনো পালন করা হয় এজন্য ১৯৮৭ সালের ৮ মার্চ বাংলা ভাষা প্রচলন আইন প্রণয়ন করা হয়। এতে বলা আছে, সকল সরকারি অফিস-আদালত, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সব প্রতিষ্ঠানের (বিদেশিদের সাথে যোগাযোগ ব্যতীত) সকলক্ষেত্রে বাংলা প্রচলনের কথা বলা হয়। এটা না মানলে তা বেআইনি বলে গণ্য হবে। কিন্তু উচ্চআদালত ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তা মানা হচ্ছে না। বর্তমানে সাইনবোর্ডেও দেখা যায় শুধু ইংরেজি ব্যবহার করে লিখা ও বিজ্ঞাপন। এছাড়া, অনেক প্রতিষ্ঠানেই মানা হচ্ছে না এ আইন।

১৯৫২ সালে বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে প্রাণ দিয়েছিলো ভাষা শহীদেরা। পাকিস্তান আমল থেকেই বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা লাভ করলেও আজো আমাদের মাতৃভাষার মর্যাদা আমরা রক্ষা করছি কিনা, পাঠক, সেই সিদ্ধান্ত, মন্তব্য… আপনারাই করবেন।

Most Popular

To Top