ইতিহাস

কোথায় হারালো একুশে’র আমতলা?

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস পড়লেই একটি স্থানের কথা আবশ্যিকভাবে চলে আসে। তা হলো আমতলা, আমতলা প্রাঙ্গণ বা আমতলা গেইট। যারা জানেন এই স্থান সম্পর্কে তাদের আরেকবার স্মরণ করিয়ে দেই। আর যারা এখনো জানেন না বা নতুন প্রজন্ম, তারা জেনে নিন, কি হয়েছিলো ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি।

ঐতিহাসিক আমতলা

ভাষা আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে আছে আমতলা গেইট। ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান সৃষ্টির প্রায় শুরু থেকে অর্থাৎ ১৯৪৮ সাল থেকে মাতৃভাষার জন্য আন্দোলন সংগ্রাম শুরু হয়। দাবি-দাওয়া উত্থাপন, সভা-সমাবেশ ও ছোট ছোট আন্দোলন, প্রতিবাদ চলতে থাকে বছর জুড়ে। আন্দোলন বড় আকার ধারণ করে ১৯৫১ সালে এসে। ১৯৫২ সালের জানুয়ারি থেকে এ আন্দোলন রীতিমতো তীব্র রূপ ধারণ করে। দাবি একটাই- ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল, বিক্ষোভ ও জনসভার ডাক দেয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। ২০ ফেব্রুয়ারিতে যখন ছাত্র-জনতা প্রস্তুতি নিচ্ছিল পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচির, তখনই পাকিস্তান সরকার ঘোষণা দেয় ১৪৪ ধারা জারির, ঢাকা শহরে নিষিদ্ধ করা হয় সব ধরনের সভা-সমাবেশে।

একুশে ফেব্রুয়ারি পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচির জন্য ছাত্র-জনতা ভিড় জমাতে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায়। সকাল ১১ টায় ছাত্রদের সভা হয় এই আমতলায়, ১৪৪ ধারা ভাঙ্গা হবে কি হবে না তা নিয়ে দেখা দেয় মতবিরোধ। অবশেষে ছাত্ররা অটল থাকে ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার সিদ্ধান্তে। প্রাণ যেতে পারে জেনেও তারা সেদিন পিছপা হয়নি, অটল থাকে রাষ্ট্রাভাষা বাংলার জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে।

একুশে ফেব্রুয়ারি

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে আমতলা

এই সিদ্ধান্তের পর আমতলা গেইট দিয়ে ছাত্ররা দলে দলে রাস্তায় বেরিয়ে আসে। তাদের সাথে সাধারণ জনতাও যোগ দেয় । ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগান দিতে দিতে আমতলা গেইট দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসলে পুলিশ তাদের উপর লাঠিচার্জ করে, এ আক্রমণ থেকে রেহাই পায়নি ছাত্রীরাও। লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ার পরও বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের সামলাতে ব্যর্থ হয়ে গণপরিষদ ভবনের দিকে অগ্রসরমান মিছিলের ওপর গুলি চালায় পুলিশ। অনেকে আহত হন, গুলিতে শহীদ হন রফিক উদ্দিন আহমদ, আবদুল জব্বার, আবুল বরকত। আবদুস সালাম সেদিন গুলিবিদ্ধ হলেও তিনি একুশে ফেব্রুয়ারিতে মারা যাননি। আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮ এপ্রিল মারা যান এ ভাষাশহীদ।
পুরো ঘটনাটি ঘটে আমতলা ও আমতলা গেইট প্রাঙ্গণে। কালের স্বাক্ষী হয়ে থাকে এই স্থানটি।

এখন কোথায় সেই আমতলা গেইট?

আমতলা বা আমতলা গেইট সম্পর্কে অনেকেই হয়তো বইয়ে পড়েছেন। তবে, ৯৫ ভাগ মানুষই চেনেন না ঢাকায় কোথায় সেই আমতলা গেইট। বর্তমানে আমতলা গেইট ও আমতলা প্রাঙ্গণ ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধীনে।

১৯৫২ সালে বর্তমান আমতলা গেইট ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরি বিভাগের এক অংশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন ছিল। কলাভবনের সামনেই ছিলো বড় একটি আমগাছ। সেই আমতলাতেই ভাষা আন্দোলন নিয়ে বিভিন্ন সভা, সমাবেশ অনুষ্ঠিত হতো। পরে কলাভবন বর্তমান জায়গায় স্থানান্তরিত হলে পুরনো ভবনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ চালু হয়। আমগাছটি একসময় মারা গেলে ঐতিহাসিক চিহ্ন হিসেবে এর একটি খণ্ড কাচের তৈরি বাক্সে সংরক্ষণ করা হয়। যা এখন আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু সংগ্রহশালায়।

বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরী বিভাগের পূর্বপাশের গেইটটিই সেই ইতিহাসের স্বাক্ষী আমতলা গেইট।

ভাষা আন্দোলনের অনেক ঐতিহাসিক স্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ এ স্থানটিও পায়নি কোন মর্যাদা। ভাষা আন্দোলনের ৬৭ বছর পার হয়ে গেলেও এখনও নামফলকহীন অবস্থায় অবহেলায় পড়ে আছে এ স্থানটি। যে কারণে এটি বর্তমান প্রজন্মের কাছে পরিচিতি পায়নি। ব্যক্তি উদ্যোগে পরিচালিত ভাষা আন্দোলন গবেষণা কেন্দ্র ও জাদুঘরের দেওয়া একটি টিনের সাইনবোর্ডের মাধ্যমে অনেক কষ্টে চেনা যায় গেইটটি। অনেকেই ভাবেন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারটি যে স্থানে আছে, সেখানেই বুঝি ঘটেছে পুরো ঘটনা। আসলে তা ঠিক নয়। সেদিনকার ঘটে যাওয়া ইতিহাস আমরা আপনাদের আগেই জানিয়েছি। কেন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার বর্তমান স্থানে? তা আমরা আপনাদের অন্য লেখায় জানাবো।

আরো পড়ুনঃ নভেরা আহমেদঃ শহীদ মিনারের অজানা স্থপতি

আমতলা গেইটের বর্তমান অবস্থা

আমতলা গেইট ও তার আশপাশ এখন হকার ভবঘুরের আস্তানা। যত্নের সাথে ইতিহাসের ছাপ লাগেনি এখানে। ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে তেমন কেউ চেনেওনা। আসলে এই না চেনার জন্য দায়ী কে? প্রজন্মকে ইতিহাস চেনানোর জানানোর দায়িত্ব কার? এমন প্রশ্নের উত্তরে শুধু দীর্ঘশ্বাসই বেরিয়ে আসে। নানা সময়ে গণমাধ্যম গুলো এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দায়িত্বশীলদের কাছে গেছে। ভাষার মাসে টিভিতে, পত্রিকায় বার বার তুলে ধরা হয়েছে আমতলা গেইটের দূরাবস্থার কথা। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস সংরক্ষণে দায়িত্ব সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের হলেও তারাও এর দায়িত্ব নেয়নি। স্থানটি ঢাকা সিটি করপোরেশন দক্ষিণে পড়লেও তারাও এর দায়িত্ব নিচ্ছে না। স্থাপনা ও এর প্রাঙ্গণ ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালের অধীনে হলেও তারা এতদিন নেয়নি কোন উদ্যোগ। গণমাধ্যমের কাছে বার বার সবাই শুধু বক্তব্য আর কাজটি করার উদ্যোগ নেয়ার পরিকল্পনার কথা বলে এসেছে এত বছর। কখনো কখনো একে অন্যের উপর দায়িত্ব চাপাতে চেয়েছে কিন্তু কিছুই হয়নি কখনো। বছরের পর বছর অরক্ষিত, অযত্ন অবহেলায় পড়ে আছে ঐতিহাসিক আমতলা গেইট।

একুশে ফেব্রুয়ারি neonaloy

একুশে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক আমতলার বর্তমান অবস্থা

আরো পড়ুনঃ ভাষার জন্য শুধু কি আমরাই প্রাণ দিয়েছি? 

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top