টুকিটাকি

মাস্তান ছেলে মান্না

মাস্তান ছেলে মান্না- নিয়ন আলোয়

নায়ক মান্নার শব দেহ তখন এফডিসিকে পৌঁছেছে কেবল। এফডিসি মোড় থেকে একদিকে কাওরান বাজার, অন্যদিকে মগবাজার রেলগেইট থেকে প্রায় সাত রাস্তা পর্যন্ত লক্ষাধিক মানুষ ভিড় করে আছেন, এক ঝলক নায়ককে শেষবার দেখবেন বলে। কারও কারও কাছে অবিশ্বাস্য লাগলো প্রিয় নায়কের মৃত্যু সংবাদ, সেদিন এই ভিড়ের কয়েক হাজার মানুষ ডুকরে কেঁদেছিলেন প্রিয়জন হারানোর কষ্টে।

বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশে চলচিত্র অঙ্গনের যে মানুষগুলো চিরবিদায় নিয়েছেন তাদের মধ্যে নায়ক মান্নার জানাজায় মানুষের উপস্থিতি ছিলো সব চেয়ে বেশী।

আম্মাজান, আম্মাজান চোখের মণি আম্মাজান…… একসময়ের তুমুল জনপ্রিয় গান। গানটি তার কথা ও সুরের চেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠে একজন নায়কের অভিনয় ও লিপসিংয়ের কারণে। চিত্রনায়ক মান্না নিজের খোলস ভেঙ্গে হয়ে উঠেছিলেন খেটে খাওয়া মানুষের প্রতিনিধি।

মান্না, তার বেশিরভাগ ছবিতেই গ্রামের দরিদ্র পরিবারের বেড়ে উঠা যুবক, রিকশা/ ঠেলা চালক, বস্তির ছেলে কিংবা দিনমুজুর মানুষের চরিত্রে রূপদান করেছেন। এতে, অত্যাচারিত, নিপীড়িত হওয়ার পর প্রতিবাদী হয়ে উঠা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো অনবদ্য অভিনয় শৈলী দর্শক হৃদয়ে পাকাপোক্তভাবে স্থান করে নেয়। পর্দায়, কখনো পুলিশ মান্না অন্যায়ের সাথে আপোষ না করে মাস্তান মান্না হয়েছেন। যে মাস্তান চুরি করেছে, ডাকাতি করে বস্তির মানুষদের খাইয়েছে, এমনকি খুনও করেছে অচেনা কোন মেয়ের সম্ভ্রম রক্ষা করতে গিয়ে। মান্নার এমন চরিত্রে অভিনয় নায়ক হিসেবে ঢালিউডে তাকে একচেটিয়া সাফল্য এনে দিয়েছে। সমাজের একশ্রেণীর মানুষের কাছে মান্না হয়ে উঠেছিলেন রূপকথার রাজপুত্রের মতো, তাদের ত্রাণকর্তা।

বাংলা চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে সবচেয়ে বেশি মাস্তানের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন, মান্না। সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পুলিশের চরিত্রে অভিনয়ের রেকর্ডটিও তার। রাজনীতি নির্ভর গল্পেও মান্না ছিলেন দর্শকনন্দিত। মান্নার অভিনয়ে রাজনৈতিক ছবি ‘মিনিস্টার’ হয় ব্যবসাসফল।

মান্নার পুরো নাম, এস এম আসলাম তালুকদার। ১৯৬৪ সালে টাঙ্গাইলের কালীহাতিতে জন্ম নেয়া ছেল্টি চলচ্চিত্রের ঝলমলে জগতে পা রাখেন ১৯৮৪ সালে এফডিসির ‘নতুন মুখের সন্ধানে’ কার্যক্রমের মাধ্যমে। দুইশতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন মান্না। ১৯৯১ সালে প্রথম মূল নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেন কাশাম মালার প্রেম ছবিতে। এ সিনেমাটি তুমুল জনপ্রিয়তা পেলে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। একের পর এক মুক্তি পেতে থাকে মান্না অভিনীত সিনেমা। তার সব ছবিই ব্যবসাসফল হয়েছিলো ।

তিনি অভিনয়ে নিজস্ব একটি ধরণ তৈরি করতে পেরেছিলেন, যা মান্না স্টাইল নামে পরিচিত। যেমনটি করেছিলেন চিত্রনায়িকা শাবানা। অভিনয়ের বাইরে চলচ্চিত্র প্রযোজনাও করেছেন নায়ক মান্না। স্বামী-স্ত্রীর যুদ্ধ, মান্না ভাই, পিতা মাতার আমানত, দুই বধু এক স্বামীসহ তার প্রযোজিত সব ছবিই ব্যবসাসফল।

নব্বইয়ের দশকে চলচ্চিত্রের অশ্লীলতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন মান্না। তবে, মান্না অভিনীত কিছু চলচ্চিত্রেও অশ্লীলতার ছোঁয়া ছিলো, সেসব থেকে বেরিয়ে দাঙ্গা, লুটতরাজ, তেজীসহ বিভিন্ন অশ্লীলতামুক্ত ছবি উপহার দেন দর্শককে। এসময় খ্যাতি ও জনপ্রিয়তার তুঙ্গে অবস্থান হয় তার।

খ্যাতির চূড়ায় থাকা অবস্থাতেই মাত্র ৪৪ বছর বয়সে ২০০৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পৃথিবী ছেড়ে যান জনপ্রিয় এ নায়ক। মান্নার মৃত্যুর দশ বছর হয়ে গেলেও বাংলা চলচ্চিত্র জগতে তার শূন্যতা আজো পূরণ হয়নি। সেরকম জনপ্রিয় নায়ক আজো পায়নি ঢালিউড।

২০০৩ সালে বীর সৈনিক ছবির জন্য মান্না সেরা অভিনেতার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার পান।

Most Popular

To Top