টুকিটাকি

পেশা যখন কেঁচো শিকারি

ঘটনাটা হাওর পাড়ের। তখন বিকেল পার হয়ে সন্ধ্যা হই হই করছে। নেত্রকোণার মোহনগঞ্জের ডিঙ্গাপুতা হাওর পাড়, দিগন্তজোড়া বিস্তৃত হাওরের পার ধরে যে মেঠো পথটি চলে গেছে সেটি ধরে কাঁধে ভাড় নিয়ে দুটি ঝাঁকি ঝুলিয়ে ছুটছেন একজন মাঝ বয়সী লোক।

বিষয়টিতে মনোযোগ দেওয়ার কিছু ছিলো না। কিন্তু সাথে থাকা একজন নিজ থেকেই প্রশ্ন করে উঠলেন- “বলুন তো এই ঝাঁকিতে কি নিয়ে যাচ্ছে?” উত্তর তো একটাই হওয়ার কথা- মাছ ছাড়া আর কি হবে। সাথের সঙ্গী বললেন, “না। মাছ না। ঐগুলো কেঁচো। উজান থেকে এই কেঁচো ধরে এনেছে। হাওরের প্রত্যন্ত গ্রামের জেলেদের কাছে বিক্রি করবে।”

মানে কি? বলতে বলতেই পেছন থেকে ডেকে আনা হলো ঝাঁকিওয়ালা মাঝ বয়সী মানুষটিকে। জানতে চাইলে তিনিও বললেন তার দুই ঝাঁকি ভরা আছে কেঁচো। দেখার অনুরোধ জানাতেই ঝাঁকির ঢাকনা সরিয়ে দিলেন তিনি। প্রতিটি ঝাঁকিতেই কিলবিল করছে বড় জাতের কয়েক হাজার কেঁচো।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি! এতো কেঁচো এক সাথে ধরলেন কিভাবে? কি হবে এই কেঁচো দিয়ে। দেখেই যেনো গা শিরশির করে ওঠে। কেঁচো শিকারি জানালেন, কেঁচো ধরার বিশেষ তরিকা আছে তাদের। গাছের এক ধরনের ফল দিয়ে কেঁচো ধরতে হয়। তিনি জানান, হাওড়ের জেলেদের কাছ থেকে অগ্রিম অর্ডার নেয়া হয়। সে অনুযায়ী কেঁচো ধরতে বের হন তিনি। হাওড় অঞ্চলে বেশি কেঁচো পাওয়া যায় না। তাই উজানের দিকে যেতে হয়। সারা দিন দুজন মানুষ মিলে কেঁচো ধরলে দুটি বড় মাপের ঝাঁকি ভরে কেঁচো ধরা যায়। এক এক ঝাঁকি কেঁচো জেলেদের কাছে বিক্রি হয় তিন থেকে চার’শ টাকায়। সে কেঁচো বরশীতে গেঁথে মাছ ধরেন জেলেরা।

কেঁচো ধরার কৌশলটিও পুরোটাই সামনা সামনি দেখালেন কেঁচো শিকারি। এবার আরও অবাক হওয়ার পালা। শত বছর ধরে হাওড় অঞ্চলের মানুষ এই কৌশলে কেঁচো ধরে আসছেন। ঝুলি থেকে একটি ফল বের করলেন কেঁচো শিকারি। কি ফল-জানতে চাইলে বললো, ’মেওয়া গুডা’। কেওড়া ফলের মতো দেখতে ফলটির আসল নামটি জানা গেলো না। বইয়ে বা বিজ্ঞানে কি ফল এটি তা কেঁচো শিকারি বলতে পারেননি।

এক মগ পানিতে ফলটি নিয়ে হাতে ঘষতে থাকলেন তিনি। সাথে সাথে হাত আর পানি ভরে গেলো সাবানের মতো ফেনাতে। সেই ফেনা ওঠা পানি পাশেই মাটিতে ঢেলে দিলেন। কয়েক সেকেন্ডর মধ্যেই মাটির নীচ থেকে বেরিয়ে এলো ২/৩টি কেঁচো। এবার বিস্ময়ের পালা!
কেঁচো শিকারি বললেন, এই পন্থায় যে জায়গায় কেঁচো থাকে সেখানেই এই পানি ঢেলে দিলে যত কেঁচো থাকবে সব উঠে আসবে মাটির নীচ থেকে। তার ভাষায়, এই পানির গ্যাস কেঁচো সহ্য করতে পারে না। তিনি জানান, শুধু শীত কালেই তিনি এই কাজ করেন, অনেকটা পার্টটাইম জবের মতো। যখন হাতে আর কোনও কাজ মিলে না, তখন কেঁচো শিকারে বের হয়ে যান। এক ঝাঁকি কেঁচো দিয়ে জেলেরা কয়েক মণ মাছ ধরতে পারেন বলেন জানান কেঁচো শিকারি।

নিজের নামটি গোপন রেখে ঝাঁকি কাঁধে তুলে আবার নিজ গন্তব্যের দিকে ছুটে যান তিনি। আর এই বিচিত্র পেশা ও কৌশলে শহুরে কিছু মানুষ অবাক হয়ে ফিরে আসি হাওড় পাড় থেকে।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top