টুকিটাকি

আমাদের বাংলাদেশ এবং তথাকথিতদের স্বপ্নের ইন্ডিয়া!

আমাদের বাংলাদেশ এবং তথাকথিতদের স্বপ্নের ইন্ডিয়া!- নিয়ন আলোয়

সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতাল। সারা বিশ্বের মানুষের কাছে সমাদৃত। এক বাংলাদেশী ভদ্রলোক গেলেন সেখানে, রোগের চিকিৎসা করতে। বিছানায় শুয়ে অপেক্ষা করছেন, এমন সময় ডাক্তার এসে বললেন, “চাচা, কি সমস্যা আপনার?” ভদ্রলোক বিস্ফোরিত চোখে ডাক্তারের দিকে তাকালেন। ডাক্তার মুখের মাস্ক খুলে মৃদু হেসে বললেন, “চাচা, আমার বাসা চিটাগাং”। ভদ্রলোক দুনিয়ার সকল বিতৃষ্ণা চেহারায় এনে বললেন, “আমি এতো টাকা খরচ করে কি বাঙ্গাল ডাক্তার দেখাতে এসেছি? এই হাসপাতালে আমি ডাক্তার দেখাবো না”।

নিত্যদিন ঘটতে থাকা কাহিনীগুলার একটা এটা, এরকম ঘটনা আমাদের চোখের সামনে ঘটে হরহামেশাই। প্রায়ই শোনা যায়, হাজীগণ বাসায় আসার সময় প্রচুর দাম দিয়ে দামি দামি টুপি, জায়নামাজ কিনে নিয়ে আসে এবং বাসার কেউ না কেউ শেষমেশ আবিষ্কার করে টুপি, জায়নামাজগুলোর ভিতরে ছোট একটা কাপড়ে লেখা ‘Made in Bangladesh’

দেশীয় আর ইন্ডিয়ান পণ্যের মাঝে কোন রকম সংকোচ ভুলে আমরা ইন্ডিয়ান পণ্যটাই বেছে নেই। কমদামী দেশীয় পণ্য উন্নতমানের হলেও বেশিদামের বিদেশী পণ্যটাই আমাদের কাছে বেশি সমাদৃত ।

যদি আমাদের মধ্যে ১০ জনকে জিজ্ঞাসা করা হয়, বাংলাদেশটা কেমন? আশা করা যায় ১০ জনই উত্তর দিবে, **র দেশ। এতো জ্যাম, এতো ধুলাবালি; তার উপর আবার পানি নাই, খাবারে সমস্যা, ভাল চিকিৎসা নাই, রোগবালাই বাড়তেছে দিন দিন আরও কতো কি! কথায় কথায় বলে দেই, “শালা , এরচেয়ে তো ইন্ডিয়াও ভাল”। এখন দেখা যাক, **র বাংলাদেশ আর স্বপ্নের দেশ ইন্ডিয়ার কিছু তারতম্য।

ধরা যাক জ্যামের কথা। ঢাকা শহরের জ্যাম নিয়ে আক্ষেপ নেই এমন মানুষ কমই আছে , কতিপয় গণ্যমাণ্যর মতে- এই জ্যামটার কারণেই আমাদের উন্নতিটা আটকে আছে, ওনারা সময়মতো অফিস, বিশেষ করে বাসায় পৌছাতে পারলেই দেশের অর্থনীতির চাকা পুরোদমে সচল হয়ে যেতো। তো সেই সকল গণ্যমান্যকে জিজ্ঞাসা করি–তাদের কি বিশ্বের বাকি মেগাসিটিগুলোর জ্যাম নিয়ে কোন ধারণা আছে কিনা। অফিস টাইমের ম্যারাথন জ্যামের জন্য কিন্তু ইস্তাম্বুল, টোকিও, লস আঞ্জেলস, মস্কো, বেইজিংর মতো শহরগুলাই বিখ্যাত। মুম্বাই, পুনে, কলকাতাও কিন্তু কোন অংশে কম নয়। সে হিসাবে ঢাকা শহরের জ্যামকে চিনেপুটি বললেও ভুল হবে না।

নোংরা দেশ আমাদের, এতো দুর্গন্ধ, এতো ধুলাবালি, দেশে টেঁকাই দায়। অবাক বিষয় হল, বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দূষিত শহরের তালিকায় প্রথম ২০-৩০ দখল করে আছে ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, সৌদি আরব আর চীনের শহরগুলো। কালেভদ্রে আমাদের একটা শহরের নাম আসে,তাও ঢাকা নয়, নারায়ণগঞ্জ।

লক্ষণীয়, যেখানে আমাদের দেশে স্বাস্থ্যসম্মত পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থা নেই এমন জনসংখ্যার পরিমান মাত্র ১% সেখানে আমাদের দুই যুগ আগে স্বাধীন হওয়া ইন্ডিয়াতে এখনও ৬৫০ মিলিয়ন মানুষ খোলা আকাশের নিচে মূত্র বিসর্জন করে।

দেশে বিদ্যুতের অভাব, শান্তিই নাকি নেই আমাদের। লোডশেডিংর জন্য মানুষের নাওয়াখাওয়া বন্ধ হয়ে যাচ্ছে নাকি। আমাদের পাশের দেশ ইন্ডিয়া, যারা মহাকাশ জয় করে ফেলছে, সেই দেশে ৩০০.৫ মিলিয়ন মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। আরেক প্রতিবেশি দেশ পাকিস্তানে ৬০ মিলিয়ন মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত ।

ইউনেস্কোর হিসাব অনুযায়ী ইন্ডিয়া ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ায় খেতে না পাওয়া মানুষের সংখ্যা ১৫%, ইন্ডিয়াসহ সংখ্যাটা ১৮.৫% এর মতো। পরিসংখ্যানই দেখিয়ে দেয় কি বিপুল জনসংখ্যা সেখানে না খেয়ে থাকে। ছোট্ট দেশ আমরা, অর্থনৈতিক অবস্থা খুব একটা ভাল না। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের ক্ষুদা মিটাতে হয়, তার ওপর প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকা ৭ লাখের বৃহৎ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। কই? খুব কি খারাপ আছি আমরা? কিছু একটা খেয়ে তো বেঁচে আছি।

দেশে ডাক্তারদের দোষের অভাব নেই। ডাক্তারদের নাম নেয়ার আগে একবার, নাম নেয়ার পর আর একবার গালি দেই আমরা। অথচ প্রতি ১০ হাজার রোগীর জন্য ৩ জন ডাক্তার আমাদের। সেবার পরিমাণটা কি খুব কম? কয়েক যুগ আগে যে রোগ আমাদের দেশ থেকে মুছে ফেলা হয়েছে; ইন্ডিয়া, মায়ানমারের মানুষ এখনও সে রোগের মহামারীতে মারা যায় ।

নিরাপত্তার দোহাই দিয়েও মাঝে মাঝে দেশটা গালি দেই আমরা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক, এশিয়ার অনিরাপদ ২০ শহরে আমাদের কোন নাম নেই। বেইজিং, দুবাই, জাকার্তা, মুম্বাই, দিল্লীর সাথে কুলীয়ে উঠতে পারে নি আমাদের ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ কিংবা চিটাগাং- এর মতো শহরগুলা।

সমস্যা আমাদের আছে, অবশ্যই আছে , কিন্তু সেটা তো আর বাকি সবার মতোই। ইংরেজদের মতো রক্তচোষা জাতি চুসে খেয়েছে দুই শতাব্দী, তারপর পাকিস্তানিদের পাশবিকতার দুই যুগ। খুবলে খুবলে খেয়েছে আমাদের। বিলীন হয়ে যাওয়ার কথা অনেক আগেই। কই? এখনও তো বেঁচে আছি, খুব ভালভাবেই মাথা উঁচু করে বেঁচে আছি। স্রষ্টার আশীর্বাদ আছে বলেই তো। খারাপ দিক তো থাকবেই কিন্তু আমরা কেন ভালটা তুলে ধরবো না? ইন্ডিয়ার এতো এতো সমস্যা, তারপরও কোনদিন দেখিনি, কোন কলকাতাবাসী বলেছে যে, ইন্ডিয়া খারাপ। যে দেশটায় ১ বিলিয়ন মানুষ খোলা আকাশের নিচে মূত্র বিসর্জন করছে, সে দেশের মানুষকে দেখেছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা তারা সভ্যতায় আমাদের থেকে এগিয়ে এ বিষয়ে তর্ক করতে। অনেক কিছুই তো তাদের থেকে শিখছি, ইন্ডিয়ান সংস্কৃতির কবলে পড়ে ধুঁকছে আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি। তাদের সবকিছুই গ্রহণ করছি, শুধু দেশপ্রেমটা শিখতে অনীহা আসে কেন? কেন পারি না বলতে আমার দেশটাও সুন্দর? আমার দেশটাও ভাল? কেন বলি না এই দেশটাই আমার জন্য আশীর্বাদ? দেশপ্রেম তো দুটো ভাল কথা বলেও প্রকাশ করা যায়, তবে বলতে কষ্ট কীসে? সবসময় তো ‘দেশ কি দিলো?’ এই প্রশ্নই করলাম , মাঝে মাঝে একটু প্রশ্ন করি ‘কি দিলাম এ দেশকে?’ দেশকে ভালবাসতে যুদ্ধে যেতে হবে না, শারীরিক সক্ষমতা লাগে না, শুধু লাগবে একটু মানসিকতা। আসুন ভাষার আর, ভালবাসার এ মাসে দেশের সবকিছুকে ভালবাসি, দেশের মানুষগুলোকে ভালবাসি, দেশটাকে ভালবাসি।

Most Popular

To Top