শিল্প ও সংস্কৃতি

দেশের বুকে আন্তর্জাতিক শিল্প

নগরের ভেতর যেনো আরেকটি শিল্পনগরী, ঢাকা আর্ট সামিট। দেশীয় শিল্পীদের শিল্পকলা প্রদর্শনীর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শিল্পীদের নিয়ে, এক ছাদের নিচে ভিন্ন উপস্থাপনে এরই মধ্যে সুনাম কুড়িয়েছে এই আয়োজন। বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের শিল্পকর্ম ও চিন্তা চেতনা দেখতে অপেক্ষা করতে হয় দুই বছর।

শিল্প এবং স্থাপত্যকে নতুন আঙ্গিকে মানুষের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে, প্রতি দু’বছর পর পর ‘ঢাকা আর্ট সামিট’ এর আয়োজন করে সামদানী আর্ট ফাউন্ডেশন। এবছর, ২ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলে চতুর্থ ঢাকা আর্ট সামিটের আয়োজন। এবারের প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছিলেন ৩৫টি দেশের প্রায় ৩০০ শিল্পী। পাশাপাশি, ১২০ জনেরও বেশি বক্তার অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় ১৬টি প্যানেল আলোচনা এবং দুটি সিম্পোজিয়াম।

ঢাকা আর্ট সামিট একটি আন্তর্জাতিক, অবাণিজ্যিক, দক্ষিণ এশীয় আর্ট এবং আর্কিটেকচার নিয়ে গবেষণাধর্মী এবং প্রদর্শনী প্ল্যাটফর্ম। ৫৫টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান পার্টনার হিসেবে ছিলো এই আয়োজনে, এছাড়া সহযোগিতা করেছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, ট্যুরিজম বোর্ড, বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি ও জাতীয় জাদুঘর। এবার, সামিটে প্রথবারের মতো অংশ নিয়েছে ইরান ও তুরস্ক।

সামদানী আর্ট ফাউন্ডেশনের যাত্রা শুরু ২০১১ সালে। রাজীব সামদানী ও নাদিয়া সামদানী, শিল্পানুরাগী এ দম্পতির আগ্রহ ও স্বপ্ন থেকেই শিল্পকলা নিয়ে এ ফাউন্ডেশন গড়ে উঠে। ‘গোল্ডেন হার্ভেস্ট’ প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী এ দম্পতির মনের ক্ষুধা ‘সামদানী আর্ট ফাউন্ডেশন’। তাদের অপার চেষ্টা ও আগ্রহের কারণেই ঢাকা আর্ট সামিটের মাধ্যমে, দ্য মিউজিয়াম অব মর্ডান আর্ট, লন্ডনের টেট মিউজিয়াম, নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্ট এর মতো বিশ্বের নামকরা মিউজিয়ামের কিউরেটরদের সাথে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার চিত্রকলা ও শিল্প ভাবনার আদান প্রদান সম্ভব হয়েছে।
পাঠক, হয়তো ভাবছেন কি এই ঢাকা আর্ট সামিট, কেনইবা একে শিল্পের বড় প্ল্যাটফর্ম বলা হচ্ছে। যাদের এই আয়োজন দেখার সুযোগ হয়েছে, তারা আমার কথার সাথে অবশ্যই একমত হবেন। আর যারা এখনও দেখেননি, তাদের বিভ্রান্তি দূর করার জন্য ঢাকা আর্ট সামিটের আয়োজনের সামান্য কিছু অংশের আলোকপাত করছি।

 

উপরের ছবি গুলো বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের শিল্পীদের কনটেম্পোরারি আর্ট দিয়ে সাজানো গ্যালারির কিছু অংশ। ভবিষ্যতে দেশের শিল্পকলার হাল ধরবে যারা, তাদের জায়গা করে দিতেই আর্ট সামিটের এ উদ্যোগ। এখানে ফুটে উঠেছে, বাংলাদেশের সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং, শতবছরের পুরনো কাঁথা অলংকরণের ঐতিহ্য, লোকশিল্পের বৈচিত্র্যময় চর্চা।

 

সংখ্যালঘুদের কষ্ট, বঞ্চনার, বাধ্য হয়ে নিজ বসত ভিটা ছেড়ে যাওয়ার যন্ত্রণাময় চিত্র ফুটে উঠেছে, এমন অনেক চিত্র ও শিল্পে। একটি গ্রাম ছিলো এখানে- শিরোনামে সাজানো হয় গ্যালারিটি। শিল্পীরা এখানে দেখিয়েছেন, ভৌগলিক অবস্থান, ভাষা, সংস্কৃতি আলাদা হলেও সংখ্যালঘুদের বঞ্চনার চিত্র সব দেশেই এক রকম।

 

 

শুধু চিত্রশিল্পই নয়, শত বছর আগের ফটোগ্রাফিও স্থান পায় এ প্রদর্শনীতে

 

পশ্চিমা আগ্রাসনের প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন মৌলিক বিষয়বস্তুও প্রতিফলিত হয়েছে কয়েক শিল্পীর শিল্পকর্মে। যেমন- উপনিবেশবাদ বিলুপ্তির সময় সমসাময়িক দেশজ পরিচয়ের পুনরুত্থান প্রচেষ্টা। মূলত এখানে দেখানো হয়েছে ভিয়েতেনামে পশ্চিমা ঔপনিবেশিক আগ্রাসন শেষ হওয়ার পর, নিজস্ব পাটশিল্পের ঐতিহ্য নিয়ে ঘুরে
দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা।

দারুণ দৃষ্টিনন্দন, ক্যানভাসের উপর চারকোল ও অ্যাক্রেলিকে আঁকা চিত্র- ‘দ্যা রেসিস্টেন্ট মুভমেন্ট’। ভারতের কাশ্মীরের শিল্পী প্রভাকর পাচপুতের আঁকা ছবি। প্রভাকর, ছবিগুলো এঁকেছেন বস্ত্র কারখানার তৈরি কাপড়ে। এতে, ৮০’র দশকে মুম্বাই এর বস্ত্র কারখানা আন্দোলনের চিত্র প্রকাশ পেয়েছে শিল্পীর তুলিতে। চারকোলে আঁকা পরাবাস্তব ছবির ভেতরে প্রভাকর ফুটিয়ে তুলেছেন, এমন এক দেশ যেখানে মানুষ তার মাতৃভূমি ও আত্মসম্মান ধরে রাখতে লড়াই করতে জানে। এছাড়াও আরেকটি ছবিতে দেখা যায়, নতুন জীবনের সন্ধানে কর্মঠ মানুষের শরীর, যাতে পড়েছে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি এবং বিষাক্ত আবহাওয়ার ছাপ। আসলে, শিল্পীর জীবনই তার শিল্পে ফুটে উঠে। প্রভাকরের জন্ম ভারতের মহারাষ্ট্রের চন্দ্রপুর জেলায়, যা ভারতের বৃহত্তম কয়লা খনির একটি। কয়েক প্রজন্ম ধরে তার পরিবার সেখানে খনি মজুর হিসেবে কাজ করে এসেছে। তাই, দূর্বিসহ জীবন সংগ্রামের গল্পই তার শিল্পের উপজীব্য।

এমনি নানা দেশ, কাল, সময়ের শিল্পকলা নিয়েই ঢাকা আর্ট সামিট। চিত্র, ভাস্কর্য, স্থাপত্য, ফটোগ্রাফি, ভিডিও আর্ট, চলচ্চিত্র, ডকুমেন্টারিসহ শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমের সাথে সাধারণের পরিচয় করিয়ে দেয়ার এক অনন্য প্রচেষ্টা এ আর্ট সামিট। পাশাপাশি, সংস্কৃতির আরেক মাধ্যম সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি, সাহিত্যকর্মও তুলে ধরা হয় এখানে। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে জনসাধারণের দেখার সুযোগ করে দেয়াটাও অনেক বড় ব্যাপার।

নানা দেশের শিল্পী, কিউরেটর, শিল্প সমালোচলকদের নিয়ে সামিটের শিক্ষামূলক আয়োজন গুলো দেশের বিভিন্ন স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। এতে সহযোগিতা করে মাইক্রোসফট বাংলাদেশ।
আর্ট সামিটে প্রতিবছরই দক্ষিণ এশিয়ার শিল্পকলার ইতিহাস প্রাধান্য পায়। তাই এ সামিট হয়ে উঠেছে দক্ষিণ এশীয় শিল্পকর্মের জন্য বৃহত্তম আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম।

Most Popular

To Top