নাগরিক কথা

শৈশবের দাম ৩০০ টাকা

বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আয়োজনে বসে আছি, চোখ মুখ ভোঁতা করে। মেজাজটা খিঁচরে আছে, আগের রাতে দেড়টায় অফিস শেষে বাসায় ফিরেছি, পরদিন আবার সাত সকালে অফিস। ঢুলু ঢুলু চোখে কোন মতে অ্যাসাইনমেন্ট স্পটে পৌঁছালাম। নামকরা কবিরা স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করছেন, সেখান থেকে আবার যেতে হবে আবহাওয়া অধিদপ্তর। একদিকে কবিতা, অন্যদিকে আবহাওয়া দুই রকম সংবাদ বানাতে হবে, এ চিন্তায় আপাতত আমার মাথার ভেতর ফাঁকা। মন পড়ে আছে বাসার কম্বল আর বালিশে, আহা আমার সখের সকাল বেলার ঘুম। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আপাতত ঘুম কাটানোর জন্য চা খাচ্ছি।

এ সময় পাশেই শোনা গেলো ছোট্ট শিশুর কোমল গলার আবেদন, আপা একটা ফুল নিবেন। তাকালাম সেদিকে, নিষ্পাপ হাসিখুশি চেহারার দুটি মেয়ে বাচ্চা, জারভারা ফুল বিক্রি করছে। ঠিক বিক্রি করছে না, বিক্রির চেষ্টা করে যাচ্ছে প্রাণপণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থগার চত্বর তখন জমজমাট। দেশ বিদেশের শত শত কবি ও কবিতা প্রেমীদের ভিড়। এমন ভিড়ে ভালো বিকোবে, সেই আশায় হয়তো বাচ্চা দুটি প্রত্যেকের কাছে গিয়েই ফুল বিক্রির চেষ্টা করছে।

চা খেতে খতে ভাবছি, কত হতে পারে ওদের বয়স। দেখে মনে হয় ৫/৬ বছরের বেশি নয়। কিছুক্ষণ পর দেখি, দুজন উৎসব মঞ্চের সামনে নিচে বসে পড়েছে, খুব মনোযোগী ভঙ্গিতে কবিতা শুনছে ও নিজেদের মধ্যে চলছে কথোপকথন। আমিও ব্যস্ত হয়ে পড়লাম কাজে।

কাজ করতে করতে হঠাৎ টের পেলাম কেউ আমার হাত ধরে টানছে, তাকিয়ে দেখি ওই দুই শিশুর মধ্যে একজন আমার হাত স্পর্শ করেছে। আমি ইশারায় জানতে চাইলাম কি ব্যাপার? বললো, আপা একটা ফুল নেন, দশ টাকা দাম।
দুজনকে দুটা দশ টাকার নোট দিলাম। ওরাও দুটা ফুল এগিয়ে দিলে বললাম, ফুল লাগবে না এমনিই দিলাম। ওমনি দুজন টাকা ফেরত দিলো, কিছুতেই এমনি টাকা নেবে না। আমি ওদের বুঝালাম, আপু আদর করে দিয়েছি যেনো রেখে দেয়। তাদের একজন আবারো না না বলছে ও টাকা ফেরত দিচ্ছে, এই সময় আরেকজন ফুল এগিয়ে দিয়ে বললো, আপা, “এটা আমার থেইক্যা আপনার জন্য গিফট”। পাশ থেকে তখন কেউ একজন মন্তব্য করলো, “এবার কিভাবে ফিরিয়ে দেবেন, রেখে দিন। এটা আপনার জন্য অনেক মূল্যবান উপহার”। মেয়েটার আত্মসম্মানবোধ ও বুদ্ধিমত্তা দেখে হতচকিত আমি ফুলটা হাতে নিলাম, সাথে সাথেই অপরজন অন্য রঙয়ের আরেকটা জারভারা এগিয়ে দিয়ে বললো, “ওইটা তো ওর গিফট, এটা আমার গিফট”। দুই রঙয়ের দুটা জারভারা হাতে কৌতূহলী আমি তখন কাজ বাদ দিয়ে ওদের নিয়ে আগ্রহী হলাম।

জানতে চাইলাম কার কি নাম, কোথায় থাকে, স্কুলে যায় কিনা এসব।
জানা গেলো, একজনের নাম বৈশাখী, অন্যজন কণা। দুজনই আঙ্গুলের কড়ে হিসেব করে বয়স বললো দশ বছর। আদতে এমন মনে না হলেও ভাবলাম, হতেও পারে! অপুষ্টি, পরিশ্রমের কারণে হয়তো বয়সের তুলনায় শরীর বাড়েনি।
কথায় কথায় এর চেয়ে কঠিন সত্য জানা হলো আমার।

বৈশাখীরা থাকে ঢাকার শনির আখড়া, কণা-কামরাংগী চরে। সেখান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিভাবে আসে জানতে চাইলে কণা জানায়, কণার বাবা রিকশাচালক। সকালে রিকশা নিয়ে বেরিয়ে মেয়েকে নামিয়ে দিয়ে যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানে আসার আগেই শাহবাগের ফুটপাত থেকে তাকে কিছু নিয়ে দেয় তার বাবা। কখনো জারবারা, কখনো গোপাল কিংবা কাঠবেলি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও টিএসসি এলাকায় সারাদিন ঘুরে ঘুরে ফুল বিক্রি করে সে। দিনশেষে বাবা এসে আবার তাকে নিয়ে যায়। কণা জানায়, প্রায় প্রতিদিন ৩০০ টাকার ফুল বিক্রি করতে পারে সে। কোন কোন দিন ৫০০ টাকাও আয় হয়। ফুল বিক্রি করতে এসেই বৈশাখীর সাথে পরিচয় হয় কণার। দুজন এখন একসাথেই ফুল বিক্রি করে। দুজনের খুব গলায় গলায় ভাব।

বৈশাখীর গল্পও খুব একটা ভিন্ন নয়। সে আসে তার মায়ের সাথে। বৈশাখীর ভাষায়, মা ফুল বিক্রির টাকা পায় কম, বড় মানুষের কাছ থেইক্যা কেউ ফুল কিনতে চায় না। এজন্য আমারে আনে ফুল বেচতে। ওর মা দূরে দাঁড়িয়ে থাকে।
কখনো কখনো শাহবাগের ফুল দোকানগুলোতে মালা বানানোর কাজ করে ওর মা, কখনোবা বেকার থাকতে হয়। কণা জানালো, তার বাবা কোন কাজ করে না। নিজের মতো করে বলে যায় মেয়েটি, ‘বাবায় রাইতে কি কি খারাপ জিনিস খায়, আর সারাদিন ঘুমায়, মায় কিছু কইলেই মারতে চায়’।
স্কুলে যায় কিনা, জিজ্ঞেস করার সাহস হলো না। নিজের কাছেই লজ্জা লাগছিলো, কিভাবে জানতে চাইবো! একজনের মাদকাসক্ত বাবা, আরেকজনের বাবার একার উপার্জনে মা, দুই বোন, দুই ভাই ও নানা নানীর সংসার চলে না বলে এই বয়সে উপার্জনে নামতে হয়েছে। এতো কঠিন বাস্তবতায় কেমন করে স্কুলে যাবে?

কথা বলার এ পর্যায়ে বৈশাখী খুব বিরক্তি প্রকাশ করে বললো, “এবার যাইগ্যা, ফুল সব বাকী, কহন বেচুম!” আরো কিছু জানার ইচ্ছায় বললাম, আমি আরো দুটা ফুল কিনবো। মনে মনে ভাবলাম, প্রখর আত্মসম্মানবোধের এই ছোট শিশুগুলো তো আর এমনি টাকা নিবে না তাই ফুল নিতেই হবে।

কণা বললো, “না, আপনার কাছে ফুল বেচুম না”। জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে আছি, আসলে আমার জন্য আরো বিস্ময় অপেক্ষা করছে। কণা বলে যায়, “আপনে একবার দুইটা ফুল কিনা, একঘন্টা কথা কইছেন। আবার কিনলে আরো একঘন্টা কথা কইবেন, তাই আপনেরে আর দিমু না। এতক্ষণে আরো কত ফুল বেচতে পারতাম”। বৈশাখীর দিকে তাকিয়ে ধমকে উঠে কণা, বলে- “চল, চল, আর কথা না, ফুল না বেচলে ঘরে টাকা দিমু কেমনে।”

জীবনের কঠিন বাস্তবতা ওদের কড়াভাবেই অর্থনীতি শিখিয়েছে। শিখিয়েছে সময়ের দাম দিতে। এইটুকু বয়সেই সংসারের ভার ওদের কাঁধে। ওরাই পরিবারের উপার্জনের ভরসা।

আমি আর ডাকলাম না। গাড়িতে উঠে বসতেই কিছুক্ষণ পর গাড়ি চলতে থাকলো ফ্লাইওভারের উপর দিয়ে। আমার চোখের সামনে দেশের উন্নয়নের নমুনা- ফ্লাইওভার, বড় থেকে বড় দালানকোঠা, নিঃশ্বাসে উন্নয়নের ধূলা, মোবাইলে উবারের অ্যাপ আর কানে বাজছে, ‘রোজকারের আয় ৩০০ টাকা’র বাস্তবতার গল্প।
উন্নয়নের সূচকে দেশ এখন মধ্যম আয়ের না স্বল্প আয়ের এ নিয়ে চলে রাজনৈতিক দলগুলোর তর্ক-বিতর্ক। অর্থনীতিবিদরা ছকে হিসেব কষেন, আর মুছতে থাকেন। এনজিও গুলোর কত কত প্রকল্প, সভা-সেমিনার চলে থ্রি-স্টার/ ফাইভ স্টার হোটেলে, দেশে এখন কোটিপতির সঠিক সংখ্যা সরকারেরও জানা নেই- এত কিছুর মধ্যে থেকে বৈশাখী ও কণারা প্রতিদিন ৩০০ টাকায় শৈশব বিক্রি করে।

আমরা রাজধানীর রাজপথে রোজ দেখি এমন অগণিত শিশু, জ্যামের মধ্যে দৌড়ে দৌড়ে ফুল বিক্রি করছে। দেখি আর চোখ ফিরিয়ে নেই, ওরা এমনি এমনি টাকা নিতে চায় না, আত্মসম্মানবোধটা খুব প্রখর।
রাজনীতিবিদরা নির্বাচনের আগে বড় বড় ইশতেহার দেয়, পথশিশু ও হতদরিদ্র জনগণ নিয়ে কত প্রকল্প। জীবনমান বদলে দেয়ার কঠিন কঠিন বক্তব্য, এসবের ভেতর দিয়ে বৈশাখীরা জন্মায়, কণারা হাঁটতে শিখেই উপার্জনে নামে।

 

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top