নিসর্গ

দার্জিলিং ভ্রমণের সাশ্রয়ী উপায়!

দার্জিলিং ভ্রমণের সাশ্রয়ী উপায়!- নিয়ন আলোয়

দার্জিলিং, বাঙালীর স্বল্প সময়ে, সহজে আর স্বল্প ব্যায়ে ভ্রমণের এক অপূর্ব যায়গা। কিন্তু তাই বলে এতো কম খরচে যে পরিবার নিয়ে দার্জিলিং বেড়িয়ে আসতে পারবো ভাবনাতেই ছিলোনা। একা বা বন্ধু-বান্ধব মিলে গেলে আলাদা ব্যাপার। কিন্তু পরিবার নিয়েও যে এতো কম খরচে ঘুরে আসা যায় ছোট্ট ছোট্ট কিছু টেকনিক ফলো করলে আর সাথে বিলাসিতাটা একটু কমালে সেটা এবার ভালোভাবে শিখে এলাম। এবং সেই অল্প খরচে এমন একটা ভ্রমণের পরে টিমের সবাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি এরপর ভারতের যে কোন যায়গায় বেড়াতে গেলে, এই টেকনিকটাই ফলো করবো। তাতে করে অনেক কম টাকায় বেশ ভালোভাবে ঘুরে আসা যাবে।

গত ডিসেম্বরে আমরা তিন পরিবার মিলে গিয়েছিলাম ডুয়ার্স আর দার্জিলিং। ভ্রমণ শেষে খরচের হিসেব করে দেখতে পেলাম, পরিবার প্রতি, পাঁচদিনে মোট খরচ হয়েছে ১৫০০০ টাকা করে! অবিশ্বাস ঠেকেছে প্রথমে হিসেব দেখে, মনে করেছি কোথাও বোধয় ভুল করেছি হিসেবে, তাই অন্য আর একজনকে দিয়ে হিসেব করে দেখলাম নাহ, ঠিকই আছে হিসেব।

দার্জিলিং ভ্রমণের সাশ্রয়ী উপায়!

মাত্র ১৫০০০/- টাকা খরচ হয়েছে আমাদের তিনজনের পুরো ডুয়ার্স-দার্জিলিং এর যাওয়া-আসা, থাকা-খাওয়া আর বিভিন্ন যায়গায় ঘোরাসহ। তবে আফসোস এই খরচটা আরও কমে যেত যদি রংপুর গিয়ে আলাদা মাইক্রো না নিতে হত, বুড়িমারির বাসের টিকেট পাইনি বলে এখানে আমাদের ২৫০০ টাকা বেশী খরচ হয়ে গেছে।

এবার তবে এই গল্পে অন্য কোন কিছুর বর্ণনা বাদ দিয়ে শুধু পুরো ট্রিপের খরচের গল্পটা বলি। কোথায়, কিভাবে আর কত খরচ করেছি আমরা।
ঢাকা থেকে আমরা নন এসি বাসে ৫৫০ টাকা করে বাস ভাড়া দিয়ে রংপুর গিয়েছিলাম। তিন জনের ১৬৫০/- টাকা। রংপুর থেকে ২৫০০ টাকায় মাইক্রো ভাড়া করে দুই ঘণ্টায় বুড়িমারি বন্দর।

পরিবার প্রতি ৮০০ টাকার একটু বেশী। জনপ্রতি ট্র্যাভেল ট্যাক্স দেয়াই ছিল তাই সময় নষ্ট কম হয়েছে। বন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বেলা শেষ হয়ে যাওয়া আর ডুয়ার্স আগে যেহেতু যাওয়ার অভিজ্ঞতা নেই তাই ঝুঁকি না নিয়ে একটি জীপ নিলাম ১৫০০ রুপী দিয়ে। পরিবার প্রতি ৫০০ টাকা পড়লো ডুয়ার্স এর লাটাগুড়ি অরণ্যে পৌছাতে।

দার্জিলিং ভ্রমণের সাশ্রয়ী উপায়!

লাটাগুড়ির নির্জন অরণ্যে পৌছাতে প্রায় রাত হয়ে গিয়েছিল আমাদের। সাথে ছোট বাচ্চা আর ফিমেল মেম্বার ছিল বলে সোনার বাংলা রিসোর্টের এক রুমেই উঠতে হয়েছিল সেদিন দুইটি ডাবল বেড আর একটি ফ্লোর ম্যাট সাথে পর্যাপ্ত বালিস আর কম্বল দেয়াতে আরেমেই কাটিয়েছিলাম সে রাত। ভাড়া পরেছিল ১৮০০ রুপী। মানে প্রতি পরিবারের ৬০০ রুপী। আর কেউই যেহেতু হানিমুন কাপল ছিলামনা সেহেতু কারোই সমস্যা হয়নি এক রুমেই শেয়ার করে থাকাতে। এরপর দিন থেকেই বাজেট আমাদের ধারনার চেয়ে কমতে শুরু করলো।

দার্জিলিং ভ্রমণের সাশ্রয়ী উপায়!

লাটাগুড়ি থেকে শিলিগুড়ি হয়ে দার্জিলিং যাবার দুটি উপায় ২৫০০-৩০০০ টাকার জীপ ভাড়া করে প্রথমে শিলিগুড়ি আর তারপর আবার জীপে ১৬০০ অথবা জনপ্রতি ১৫০ রুপী করে দার্জিলিং। দ্বিতীয় উপায় হল লাটাগুড়ি স্টেশন থেকে ২০ রুপীর টিকেট কেটে, ডুয়ার্সের অরণ্যের রূপ দেখতে দেখতে শিলিগুড়ি স্টেশন। তারপর দার্জিলিং রিজার্ভ বা শেয়ার জীপে। আমরা দ্বিতীয়টা বেছে নেয়ায় পরিবার প্রতি খরচ বেঁচে গিয়েছিল ১০০০ টাকা করে।

দার্জিলিং -এ প্রথম দিনের রুম ভাড়া ছিল ১০০০ রুপী করে আর দ্বিতীয় দিন চমৎকার হোটেলে খোলা বারান্দাসহ রুম ভাড়া ১৩০০ রুপী করে। দার্জিলিং থেকে কালিম্পং হয়ে শিলিগুড়ি পর্যন্ত একটি জীপ পেয়েছিলাম ৩৫০০ রুপীতে, পরিবার প্রতি প্রায় ১২০০ রুপী।

শিলিগুড়িতে ভালো মানের ডাবল রুম পেয়েছিলাম ৯০০ রুপীতে। আর একদিন থেকে সকালে ৩০০০-৩৫০০ টাকায় জীপ রিজার্ভ বা করে একটু সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ৬০ টাকা করে সরকারী বাসে উঠে চ্যাংরাবান্দা বাইপাস পর্যন্ত এসে, ৩০ টাকা করে টোটো ভাড়া দিয়ে বর্ডারে। বর্ডার পার হয়ে ৬০০ টাকা করে ভাড়া দিয়ে ঢাকায়। বাস থেকে নেমে ১২০ টাকা সিএনজি ভাড়া করে মিরপুর-২।

দার্জিলিং ভ্রমণের সাশ্রয়ী উপায়!

এই হল যাওয়া-আসা, থাকা-বেড়ানোর খরচ। এবার আসা যাক খাবারের খরচে। ঢাকা থেকে রাতের বাসে ওঠাতে রাতের খাবারটা বাসা থেকেই খেয়ে বাসে ওঠা গেছে। সকালে রংপুরে নাস্তা জনপ্রতি ২০ টাকা পরোটা দুইটা আর এর একটা করে ডিম, পানি নিজেদের সাথেই ছিল পর্যাপ্ত। দুপুরে ৮০ থেকে ১০০ টাকা করে বুড়ির হোটেলে খাওয়া। রাতে লাটাগুড়ি বাজারে অমলেট আর পরাটা ৪০ রুপী করে জন প্রতি আর বাচ্চাদের জন্য ৮০ রুপীর চিকেন বিরিয়ানি সাথে সবার জন্য লিমকা। পরিবার প্রতি সকাল-দুপুর আর রাতে খরচ হয়েছিল ৬০০ টাকার মত।

দার্জিলিং এ সব সময় খাবার জন্য আমার পছন্দ মসজিদের গলিতে অবস্থিত ইসলামিয়া হোটেল ভাত আর মাংস খাওয়া যায় জনপ্রতি ৪৫ থেকে ৫০ টাকায়। আমাদের প্রতি বেলায় পরিবার প্রতি খরচ হয়েছিল ২৫-৪৫ টাকা করে গড়ে ৩০০ টাকা। দুই দিনের শুধু দার্জিলিং এর খাবারের খরচ ৪০০ টাকা আর অন্যান্য খাবার নিয়ে আরও ২০০, মোট ৬০০ টাকা। দুই দিনে গড়ে ১০০০ টাকা। আর দার্জিলিং থেকে কালিম্পং হয়ে শিলিগুড়িতে যেতে পথে নাস্তা আর শুকনা খাবারে খরচ হয়েছে ২০০ টাকা পরিবার প্রতি।

শিলিগুড়ি গিয়ে হোটেলে ফ্রেস হয়ে, আমাদের সব সময়ের শেষ দিনের মেগা ডিনার কেএফসিতে। জনপ্রতি ১২০ টাকায় ভরপুর রাইস আর চিকেন মিল। বাইরে বেরিয়ে ২০ টাকার ঠাণ্ডা লিমকায় চুমুক। হোটেলের পাশ থেকে মধ্যরাতে ৫ রুপীর চা আর ৫ রুপীর বিস্কিট, পথে বসে আর হেঁটে হেঁটে। সকালে হোটেলের পাশের ভ্রাম্যমাণ দোকান থেকে গরম গরম লুচি আর আলুর দম দিয়ে ১০ রুপীর নাস্তা সেরে বাসে উঠে বর্ডারে। আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বুড়ির হোটেলে ১০০ টাকা করে ভাত-ডাল আর মাছ বা মাংস, যার যেটা পছন্দ।

পথে লালমনিরহাট আর রংপুরে একটু চা আর ডিম সেদ্ধ খেয়ে ঘুম। সকালে ঢাকা। ব্যাস সফর শেষ হয়ে গেল নিতান্ত কম খরচেই।

এবার তবে টোটাল খরচের তালিকাতা ঝটপট দেখে নেয়া যাক কত করে খরচ হয়েছে পরিবার প্রতি, ৫ দিনের ডুয়ার্স- দার্জিলিং ভ্রমণের।

ঢাকা-রংপুর বাস ভাড়া ১৬৫০/- (তিন জনের পরিবার)
নাস্তা- ৬০/-
রংপুর-বুড়িমারি মাইক্রো ভাড়া ১০০০/-
দুপুরের খাবার রাউনড-৩০০/-
ট্র্যাভেল ত্যাক্স-১৫০০/-
চ্যাংরাবান্দা-লাটাগুড়ি জীপ ভাড়া- ৬০০/-
লাটাগুড়িতে রুম ভাড়া সেয়ারে- ৭০০/-
লাটাগুড়িতে রাতের খাবার- ১৮০/-
লাটাগুড়ি-শিলিগুড়ি ট্রেনভাড়া- ৭৫/-
শিলিগুড়ি-দার্জিলিং জীপ ভাড়া- ৬০০/-
দার্জিলিং এ রুম ভাড়া প্রথম রাত- ১৫০০/-
রাতের খাবার- ১৫০/-
সকালের নাস্তা- ৭৫/-
দ্বিতীয় দিনের রুমভাড়া- ১৫০০/-
দুপুরের খাবার- ২০০/-
রাতের খাবার- ২০০/-
পরদিন সকালের নাস্তা- ১০০/-
অন্যান্য খাবার- ২০০/-
দার্জিলিং থেকে কালিম্পং হয়ে শিলিগুড়ি জীপ ভাড়া- ১৫০০/-
পথে খাবার- ২০০/-
রাতের খাবার- ৫০০/-
হোটেল ভাড়া- ১১০০/-
সকালের নাস্তা- ৫০/-
বাস ভাড়া- ২০০/-
টোটো ভাড়া- ১০০/-
দুপুরের খাবার- ৩০০/-
বাস ভাড়া- ১৮০০/-
রাতের হালকা খাবার- ১০০/-
সিএনজি ভাড়া- ১২০/-
মোটঃ ১৬৫৬০/- টাকা

এবার প্রশ্ন আসতে পারে ১৬৫৬০/- টাকাকে কেন ১৫০০০/- টাকা বললাম?

বললাম এই কারনে যে ১৫০০ তিন জনের ভ্রমণ ট্যাক্স। ভ্রমণ ট্যাক্সকে আমি ভ্রমণ খরচের আওতাও ধরিনা, কারন এটা ফিক্সড কস্ট, যেমন পাসপোর্ট ও ভিসা করার খরচ, যেটা বাধ্যতামূলক এবং সরকার নির্ধারিত খরচ সেটা তো সবাইকেই সমান ভাবে দিতেই হবে। আমার মতে ভ্রমণ খরচ বলতে আমি সেই খরচকেই বুঝি যেটা আপনি, আমি চাইলেই নিজেদের ইচ্ছা, পছন্দ, রুচি আর সাধ ও সাধ্যমত কমাতে বা বাড়াতে পারবো। সেটাই একচুয়াল ভ্রমণ খরচ। এটা সম্পূর্ণই আমার ব্যাক্তিগত মত, ভিন্নমত থাকতেই পারে।

তো এই হল আমাদের সর্বশেষ ডুয়ার্স-দার্জিলিং ভ্রমণের অবাক করা খরচ, যেটা আমাদের নির্ধারিত বাজেটের চেয়েও কম। মাত্র ১৫০০০ টাকায় পুরো পরিবারের ৫ দিনের ডুয়ার্স-দার্জিলিং ভ্রমণের খতিয়ান।

সুতরাং ভারতের যে কোন যায়গা ভ্রমণে যদি রিজার্ভ জীপ না নিয়ে ওদের ষ্টেট ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করতে পারেন আর থাকার ক্ষেত্রে রুম শেয়ার করার মানসিকতা থাকে তাহলে খরচ অনেক কমে যায়। পাশাপাশি আমরা আরও যেটা করে থাকি, সকালে ভালো করে নাস্তা করি, দুপুরে ভাত বা ভারী খাবার খেয়ে সময় নষ্ট না করে শুকনো খাবার খেয়ে সারাদিন ঘুরেফিরে সন্ধ্যা বা রাতে ভালো করে ডিনার করে রুমে ফিরি। তাতে করে সময় বাঁচে আর বাঁচে খরচও।

আপনি কিভাবে ঘুরবেন সেটা একান্তই আপনার ব্যাপার, ভালোলাগা সাধ আর সাধ্যের ব্যাপার। আমার এভাবে ঘুরে বেড়াতে ভালোলাগে।

আমি এভাবেই খুব কম খরচে ঘুরি, এটাই আমার আনন্দ, আমার ভালোলাগা আর ঘুরে এসে মনের মাধুরী দিয়ে সেসব অনুভূতি গুলো লিখে শেয়ার করা, আমার ভালোবাসা।

সবাই ভালো থাকুন, সবার ভ্রমণ সুন্দর আর আনন্দঘন হোক, সেই প্রত্যাশায়।
সকল ভ্রমণে পরিবেশ পরিষ্কার রাখুন এবং অন্যদেরও সচেতন করুন।

Most Popular

To Top