ইতিহাস

পৃথিবীর ইতিহাসের ভয়ংকরতম বিমান হামলার ইতিবৃত্ত

১১ সেপ্টেম্বর ২০০১ সাল। আমেরিকান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ১১ একটি বোয়িং ৭৬৭ বিমান লোগান বিমানবন্দর থেকে সকাল ৭ টা ৫৯ মিনিটে ১১ জন ক্রু, ৮১ জন যাত্রী নিয়ে লস অ্ঞ্জেযালেসের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। যাত্রার অল্প সময় পরে কন্ট্রোল রুমের সাথে ফ্লাইট ১১ এর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পৃথিবীর অন্যতম সেরা এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের হর্তা কর্তা কেউ তখনও কল্পনা করতে পারে নি যে পৃথিবীর ইতিহাস বদলে যেতে চলেছে। পৃথিবীর ইতিহাস বদলানোর প্রথম ফ্লাইট তার যাত্রা শুরু করে দিয়েছে। কন্ট্রোল রুম থেকে ফ্লাইট ১১ এর সাথে বার বার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হচ্ছিল কিন্ত যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছিলনা। অল্প সময় পরেই ফ্লাইট ১১ তার যাত্রা পথ পরিবর্তন করে নিউ ইয়র্কের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে।

সকাল ৮ টা ১৪ মিনিট ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ১৭৫ একটি বোয়িং ৭৬৭ বিমান লোগান বিমানবন্দর থেকে ৯ জন ক্রু ও ৫৬ জন যাত্রী নিয়ে লস অ্ঞ্জেযালেসের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। এই ফ্লাইটিও ফ্লাইট ১১ এর মতো তার যাত্রা পথ বদলিয়ে নিউ ইয়র্কের দিকে যেতে থাকে।

সকাল ৮ টা ২০ মিনিট আমেরিকান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ৭৭ একটি বোয়িং ৭৫৭ বিমান ওয়াশিংটনের ডালাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৬ জন ক্রু ও ৫৮ জন যাত্রী নিয়ে লস অ্ঞ্জেযালেসের দিকে যাত্রা করে। ফ্লাইট ৭৭ ও বাকি বিমানের মত রহস্যময় আচরণ শুরু করে। এটি কন্ট্রোল রুমের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে ভার্জিনিয়ার দিকে যাত্রা করে।

সকাল ৮ টা ৪২ মিনিট ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ৯৩ একটি বোয়িং ৭৫৭ বিমান নিউ ইয়র্ক থেকে সান ফ্রান্সিসকোর দিকে যাত্রা করে। ফ্লাইট ৯৩ তে ৭ জন ক্রু এবং ৩৭ জন যাত্রী ছিল। যাত্রার কিছু সময় পরে ফ্লাইট ৯৩ এর কন্ট্রোল রুমের সাথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

পর পর ৪ টি ফ্লাইটের রহস্যময় আচরণে আমেরিকান এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের সব কর্মকর্তা কর্মচারী শঙ্কিত হয়ে পরে। অল্প সময়ের মধ্যে ৪ টি বিমান হাইজ্যাক হবার কথা ছড়িয়ে পরে। ফ্লাইট ৯৩ তে যাত্রীদের সাথে ৪ জন হাইজ্যাকার ছিল বাকি গুলায় ৫ জন করে হাইজ্যাকার ছিল।

সকাল ৮ টা ৩২ মিনিটে ফ্লাইট ১১ সম্পর্কে Federal Aviation Administration (FAA) কে অবহিত করা হয়। তারা সাথে সাথে North American Aerospace Defense Command (NORAD) কে অবহিত করে। NORAD ২ টি যুদ্ধ বিমান F-15s প্রস্তুত করে ফ্লাইট ১১ কে উদ্ধার করার জন্য।

সকাল ৮ টা ৪৩ মিনিটে ৫ জন হাইজ্যাকার ফ্লাইট ১১ কে নিয়ে বিপদজনক ভাবে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। ৮ টা ৪৬ মিনিটে ফ্লাইট ১১ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নর্থ টাওয়ারে ক্রাশ করে। ভবনটিতে আগুন ধরে যায়। ১৭ মিনিটের মধ্যে সকাল ৯ টা ৩ মিনিটে ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ১৭৫ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সাউথ টাওয়ারে আঘাত করে। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ভবন গুলো আগুনে জ্বলতে থাকে। ৫৬ মিনিট আগুনে জ্বলার পরে ৯ টা ৫৯ মিনিটে সাউথ টাওয়ার সম্পূর্ণ রুপে ধ্বসে পরে। অপর দিকে ১০২ মিনিট আগুনে জ্বলার পরে ১০ টা ২৮ মিনিটে নর্থ টাওয়ারটিও ধ্বসে পরে। এভাবেই পৃথিবীর সবচাইতে বড় ভবন গুলো মাটিতে মিশে যায়।

বিমান হামলায় আক্রান্ত টুইন টাওয়ার

অপর দিকে আমেরিকান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ৭৭ ভার্জিনিয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। সকাল ৯ টা ৩৭ মিনিটে আমেরিকা তথা পৃথিবীর অন্যতম সুরক্ষিত স্থান পেন্টাগনে ফ্লাইট ৭৭ আঘাত করে আমেরিকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কে নাড়িয়ে দেয়।

হামলার পর বিধ্বস্ত পেন্টাগনের একাংশ

ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ৯৩ তখন ও আকাশে ছিল। সকাল ১০ টা ৩ মিনিটে ফ্লাইট ৯৩ পেনসেলভেনিয়ার কাছাকাছি বিধ্বস্ত হয়। ৪ জন হাইজ্যাকার সহ সব যাত্রী নিহত হয়। ধারণা করা হয় ফ্লাইট ৯৩ এর লক্ষ্য ছিল প্রেসিডেন্টের বাসভবন White House.

এই ভয়ংকর হামলায় ২৯৯৬ জন মানুষ মারা যায়। ৬০০০ জন আহত হয়। ভার্জিনিয়ার পেন্টাগনে ১২৫ জন শ্রমিক মারা যায়। ভবন গুলোর আগুন নিভাতে ৩৪৩ জন দমকল কর্মী নিহত হয়। প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক ক্ষতি হয়। সারা পৃথিবীর শেয়ার বাজারে ধ্বস নামে।

যত গুলো বিমান আকাশে ছিল সব বিমান কে জরুরী অবতরণ করার ঘোষণা দেওয়া হয়। আমেরিকান এয়ারফোর্স কে নির্দেশ দেওয়া হয় আকাশে আর কোন হাইজ্যাক হওয়া বিমান থাকলে সেটিকে সাথে সাথে ধ্বংস করার। FAA আমেরিকার আকাশে সব ধরনের আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়। হাজার হাজার যাত্রী বিমান বন্দর গুলোতে আটকা পরে। ৫০০ এরও বেশি ফ্লাইট ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তার মাঝে ২২৬ টি বিমান কানাডাতে ল্যান্ড করে। এত অধিক সংখ্যক বিমান ও যাত্রী আশ্রয় দিতে কানাডা অপারেশান ইয়েলো রিবন চালু করে। প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ কে নিরাপত্তা দিতে সারা দিন একটি বিমানে রাখা হয়।

৯/১১ এর ঘটনা সারা পৃথিবীতে আলোড়ন সৃষ্টি করে। আমেরিকার মুসলিমদের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। ৯/১১ এর ঘটনার পরে পৃথিবীর ইতিহাস দ্রুত বদলে যেতে থাকে। যুদ্ধের দামামা বেজে উঠে। আফগানিস্থান ও  ইরাকে  হাজার হাজার মানুষ কে হত্যা করা হয়।

লিখেছেনঃ রিদওয়ান ইসলাম।

Most Popular

To Top