টুকিটাকি

দড়িতে ঝুলে থাকা ৫০০ টাকার জীবন!

পদ্মার বুকে কেবল ভেসেছে ফেরি শাহ আমানত-১। শরতের সময়টাতে পদ্মায় ঢেউ একদম নেই। ফেরি যাবে পাটুরিয়া থেকে দৌলতদিয়া। ২০/২৫ মিনিটের অলস সময়টা কাটানোর জন্য বেশ আয়েশি একটা ব্যবস্থা রয়েছে ফেরির একদম উপরের ফ্লোরে, ভিআইপি কেন্টিন ধরনের। সামনের দিকটার জানালার কাঁচ সরিয়ে দিলেই ভর দুপুরের রোদ মাখানো হুঁ হুঁ বাতাস গায়ে এসে আছড়ে পরে। যতদূর চোখ যায় পদ্মার রূপালী জলের ঝিলিক।

এখানকার আধা ঘন্টার ফেরি ভ্রমণের ভাড়া জনপ্রতি ৫০ টাকা। ফেরিতে পারাপরা হওয়া বাসের যাত্রী হলে ভাড়া জনপ্রতি ৩০ টাকা।
পদ্মার বুকে সেই ভর দুপুরে জেলে নৌকা বা অন্য কোনও নৌযানও তেমন একটা চোখে পরছিলো না।
ভিআইপি ক্যান্টিনটাতে অতিথি সংখ্যা সর্ব সাকুল্যে ৩ জন।

সামনের পুরোটাই কাঁচের জানালা দেওয়া। এক পাল্লা খুলে দিয়ে পদ্মায় ঠিক মতো চোখ বুলিয়ে ওঠার আগেই পাশের আরেকটি পাল্লার দিকে চোখ পরে যায়।

আকস্মিক মনে হলো যেনো সূঁতোয় ঝোলানো বড় একটা পুতুল কি? না কি ভূতুড়ে কিছু? না চোখ বা মনের বিভ্রম?
ঝটপট নিজেকে সামলে নেওয়ার পর ক্ষনিকেই সম্বিত ফিরে পেয়ে বোঝা গেলো মূল বিষয়টা। জানালার কাঁচের বাইরে থেকে এক শ্রমিক দড়িতে ঝুলে কাজ করছেন। কাঁচের বাইরে মাথা বের করে ভালোভাবে দেখা গেলো, অন্তত এক’শ ফুট উপরে ঝুলে ফেরিতে রং এর কাজ করছেন একজন। ফেরির ভেতর থেকে দেখলে অনেকটাই যেনো মনে হয় কেউ একজন শূন্যে ঝুলে আছেন।

এভাবেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয় মোস্তফা কামালদের

জানালার বাইরে অর্ধেক শরীর গলিয়ে দিয়ে কথা হয় লোকটার সাথে। নাম মোস্তফা কামাল। বাড়ি কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে।
কামাল জানালো, রং এর কাজ করছে ৫ বছর হলো। সেই শুরু থেকেই এই ফেরিতেই একইভাবে কাজ করে যাচ্ছে সে। ২/৪ মাসে একবার গ্রামের বাড়ি যায়। নিজে কোন রকম খেয়ে পরে থেকে বাড়িতে রেখে আসা বৃদ্ধ মা, স্ত্রী আর এক সন্তানের জন্য উপার্জনের বাকী টাকাটা পাঠিয়ে দেয়। তা দিয়েই চলে সংসারের ওই তিন জনের।

এভাবে ঝুলে থেকে কাজ করতে ভয় লাগে কিনা, ঝুঁকি কেমন জানতে চাইলে কামালের কাজ করতে করতেই সাবলীল জবাব- এই ফেরি যখন থেকে তখন থেকেই আমরা আছি। এ কাজতো সবাই পারে না। সব কামেরই রিক্স আছে। এইটায় একটু বেশি রিক্স, এই আর কি?
কামালের ঠোঁটে মুচকি হাসি। যেনো নিজের জীবনকেই নিজে তাচ্ছিল্য করলো।

আবারও কাজ করতে করতে কথোপোকথন চালিয়ে যায় কামাল।
কামাল বলেন, “এই কাজ করতে করতে এখন আর কোনও কিছুই মনে হয়না। করতে করতে অভ্যাস হইছে, চর্চা হইছে। মাঝে মধ্যে শরীর কাঁপে, জ্বর ধরে। কিন্তু কামতো কামই।”

কামাল জানায়, দৈনিক ৫০০ টাকা মুজুরিতে কাজ করে সে। এই সামান্য টাকায় প্রতিনিয়ত এমন ঝুঁকির কাজ করে পোষায় কিনা জানতে চাইলে কামাল এবার অনেকটা তৃপ্তির সুরেই বলেন, ঝুঁকি থাকলেও ১২ মাসই ফেরিতে কাজ মিলে, তাই পুষিয়ে যায়।
সব কিছুর পরেও তো নিজের জীবনের মায়াতো থাকে। সেফটি বেল্ট লাগাতে পারেন। সেটা লাগিয়ে কাজ করেন না কেনো জিজ্ঞেস করলে, এবার কামাল সামান্য লাজুক ভঙ্গিতে বলেন, বেল্ট লাগালে সময় নষ্ট, বিরক্ত লাগে, মনে হয় বেল্টটা টেনে ধরে রাখে, এজন্য সেফটি বেল্ট ব্যবহার করেন না কামাল।

তারপরও জীবনতো আগে, কামালকে আবারও মনে করিয়ে দিলে সে অনেকটা না শোনার ভান করে নিজের কাজে মন দেয়।
ফেরির ক্যান্টিনের পাউরুটি টোস্টটা দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সাথে গরম চা। ফেরিও প্রায় ওপারের ঘাটের কাছাকাছি। গরম টোস্টে কামড় দিতে দিতে বারবারই চোখ যায় রোদে পোড়া, এক হাতে দড়ি আর অন্য হাতে রং করার ব্রাশ ধরে থাকা কামালের দিকে।

কেবল ৫’শ টাকা মুজুরি নিয়ে প্রতিদিন জীবন বাজি রেখে লড়তে হয় কামালদের।

Most Popular

To Top