নাগরিক কথা

সন্তান আমার প্রেম করছে!

সন্ধ্যাবেলা ঘুমাচ্ছিলাম, মা এসে বললেন ছোট ফুপুর ফোন এসেছে এবং তিনি আমাকে উনাদের বাসায় এই মুহূর্তে যেতে বলেছেন। ছোটবেলা থেকেই ফুপু আর ফুপা অনেক আদর করতেন, তাই উনার আদেশ মতো বাসায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। রিকশা নিয়ে জ্যাম ঠেলে পৌছালাম ফুপুর বাড়ি। কলিংবেলে হাত দেওয়ার আগেই ভিতর থেকে হইচই এর শব্দ শুনতে পেলাম। নক করার পরে ফুপাতো ভাই দরজা খুলে দিলো। খোলা দরজার ফাঁক দিয়ে দেখি আমার ফুপু- ফুপা কলেজে পড়ুয়া ফুপাতো বোনকে নিয়ে বিচার সভা বসিয়েছেন। আমাকে দেখে ফুপু- ফুপা দুজনেই সমস্বরে কথা বলা শুরু করলেন, কার কথা যে শুনব বুঝতে না পেরে দুজনকেই থামতে বললাম। ফুপা যেহেতু অপেক্ষাকৃত শান্ত মেজাজের! তাই উনাকেই মূল ঘটনা বলতে বললাম। ঘটনার বিবরণ শুনে যা বুঝলাম “আমার ফুপাতো বোন তার এক ব্যাচ সিনিয়র ভাইয়ার সাথে প্রেম করছে এবং অনেকদিন ধরে এটা সন্দেহ করার পরে তারা ফুপাতো বোনকে মোবাইলে কথা বলার সময় হাতেনাতে ধরে ফেলেছে। প্রাথমিক চড়-থাপ্পড়টা দেওয়ার পরে এখন পরবর্তী ধাপের বিচারসভা বসেছে, আর আমার বয়স যেহেতু ফুপাতো বোনের চেয়ে একটু বেশি তাই আমাকে ডেকেছেন ওকে একটু বোঝানোর জন্য যেন এবয়সে এসব খারাপ কাজ না করে।

আমার বিতং করে লেখা এই ঘটনার সম্মুখীন নিশ্চয় অনেকেই হয়েছেন, কিংবা নিজেরাও এমন বিচার সভার আসামি হয়েছেন।
দিন দিন আমাদের দেশে এমন ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে এবং মা- বাবাদেরও সন্তানদের নিয়ে প্রেম- ভালোবাসার বিষয়ে চিন্তার শেষ নেই।

ডিজিটালাইজেশনের এ যুগে “বিশ্ব ভালোবাসা দিবস” আসার আগেই টেলিভিশনে এই উপলক্ষে নাটক, পত্রিকায় বিশেষ সংখ্যা কিংবা নানা অফারের বদৌলতে মা- বাবাদের কাছেও দিবসটি অজানা নয়। ভালোবাসা দিবস আসলে আমাদের মতো তরুণ- তরুণীদের যেমন মন নেচে উঠে তেমনি সমান তালে মা- বাবারাও হয়তো চিন্তা করেন যে, আমার মেয়েটা বা ছেলেটা কি কোনো খারাপ সর্ম্পকে জড়িয়ে পরলো কিনা।
বিশ বছর আগে সিনেমার কাহিনির মতো প্রেম করে পালিয়ে বিয়ে করা মা- বাবাটিও নিজের সন্তানদের প্রেমের বিষয়ে অনেক সময় নেতিবাচক ধারণা পোষণ করে থাকেন।

সন্তানদের প্রেম করতে দেখেও মা- বাবার চুপ করে থাকা যেমন মানানসই নয় তেমনি কোনো কিছু বোঝানোর চেষ্টা না করেই পিটাপিটি শুরু করে দেওয়াও ভালো পিতামাতার লক্ষণ নয়। মা- বাবাকে বুঝতে হবে যে আগেকার দিনে সন্তানদের প্রেমের ইচ্ছা বাবার চোখ রাঙ্গানি কিংবা মায়ের খুন্তির ঠেলায় ভালো হয়ে গেলেও এখনকার দিন একটু অন্যরকম। বিপথে যাওয়ার জিনিস গুলো যখন হাতের কাছেই আছে আর “নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি” বা “একক পরিবার” এ বড় হওয়া সন্তানের সাথে হাইসোসাইটির সভ্য মা- বাবার সম্পর্কের বন্ধন যেহেতু ধীরে ধীরে আলগা হয়ে যাচ্ছে তাই এই সময়ে সন্তানকে বোঝাতে হবে অনেক চিন্তা ভাবনা করে। সন্তানের পড়া- লেখা, ক্যারিয়ার কিংবা বিষাক্ত সম্পর্কে জড়িয়ে জীবনটাকে নষ্ট করে দেওয়ার ভয়ে বাবা- মারা মূলত সন্তানদের প্রেম- ভালোবাসাকে পছন্দ করেন না। কারণ, যে ছেলে বা মেয়ে ক্লাস সেভেন থেকেই প্রেম করা শুরু করেছে সেই ছেলে বা মেয়ে “জান/বেবি” এসব শব্দ ঠোঁটের আগায় নিয়ে আসতে কিংবা সঙ্গীর সাথে ঝগড়া হলে “আই ওয়ান্না ডাই” নামক ইঁচড়ে পাকা পোস্ট দিতে পারঙ্গম হলেও জীবনের বাস্তবতা কিংবা সম্পর্কের মধ্যেকার বিশ্বস্ততাসহ অন্য উপাদান গুলোর কথা একবারও তাদের মাথায় আসেনা। আর এর প্রমাণ অহরহ পত্র-পত্রিকা কিংবা ইন্টারনেট খুললেই আমরা দেখছি। ফেসবুকের আনসেন্সরড গ্রুপের “লিঙ্ক হপে লিঙ্ক?” এসব কথাতো নাইবা বললাম। আমি খুব কম জুটিকেই দেখেছি যারা নিজেদের মধ্যেকার সম্পর্কটাকে শুদ্ধভাবে নিয়ে যেতে পেরেছেন কিংবা সম্পর্ককে জীবনের অন্য অনুষঙ্গের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। তাই দিনশেষে অন্যদের সামনে বলতে হয় “আরেহ আমার মতো না বুইজ্জা প্রেম করিস নারে, ধরা খাবি”।

বয়ঃসন্ধিকালে বিপরীত বৈশিষ্ট্যের কারো প্রতি আকৃষ্ট হওয়া যে একটা স্বাভাবিক বিষয় এটাও মা- বাবাকে বুঝতে হবে। “কম্বাইন্ড এডুকেশন” আর ইন্টারনেটের যুগে ছেলে মেয়ে কাউকেই আপনি আলাদা করে জনমানব শূন্য এলাকায় রাখতে পারবেন না, সে চেষ্টা করতে যাওয়াও শুধু বৃথা নয় বরং উল্টো ফল নিয়ে আসতে পারে। তাই সন্তানকে দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য আপনি বরং বাতিঘরের মত কাজ করুন, খেয়াল রাখুন সন্তান যেন জীবনের ঝড়-ঝঞ্জার মাঝে হারিয়ে না যায়।

“যখন যা লাগছে তা দিতে কার্পণ্য করছিনা, নিজেরা খরচ না করে ওদের পেছনে টাকা ঢালছি তাও পড়ালেখা না করে এসব প্রেমলীলা করে বেড়াচ্ছে” এমন কথা প্রায় সব মা- বাবার মুখেই শোনা যায় এবং তাদের এমন কথা বলাটা ন্যায্য অধিকার। কষ্টে আয় করা টাকা সন্তানের ভালোর জন্য ব্যয় করতে সমস্যা নেই, কিন্তু সেই টাকা দিয়ে সন্তান কি করছে তার খোঁজ খবর রাখাও কি উচিত নয়?
কমনসেন্স দিয়ে চিন্তা করে দেখুন, অনেক বয়স্ক এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তিও মাঝে মাঝে বড় বড় ভুল করে ফেলেন, সে তুলনায় একটা সদ্য কৈশোরে পড়া ছেলে বা মেয়ে তো দুনিয়ার তেমন কিছুই ভালো করে বোঝে না।

নিজের বন্ধু মহলে সবাই যখন প্রেম করে বেড়ায় তখন “স্ট্যাটাস” বজায় রাখার জন্য হলেও অনেক টিনেজার প্রেম করা শুরু করে।তাই সন্তানের সাথে ছোটবেলা থেকেই বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলুন, তার সাথে এমন সম্পর্ক সৃষ্টি করুন যেন সে আপনাকেই তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু এবং নির্ভরযোগ্য কেউ বলে মনে করে। না হয় দেখা যাবে যে, কোনো ছোটখাট দোষ করে ভয়ে আপনার কাছ থেকে লুকাতে গিয়ে সে যেন এমন কোন ভুল না করে ফেলে যা শোধরানো যায় না কখনো। একটা নির্দিষ্ট বয়স পার না হওয়া পর্যন্ত প্রেম- ভালোবাসার মত এমন মানসিক সম্পর্ক যে নানা সমস্যার সৃষ্টি করে কিংবা নিজের ব্যক্তি জীবনের অনেক অর্জনে বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারে এটাও সন্তানকে বুঝিয়ে বলুন। নাটক- সিনেমাসহ সব মাধ্যমে যেখানে অবাধে প্রেমের বিভিন্ন উচিৎ অনুচিত সংজ্ঞা দেখানো হচ্ছে সেখানে আপনাকে তো সন্তানের ভালোর জন্য একটু সচেতন হতেই হবে, কারণ “নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি সবার আকর্ষণ একটু বেশিই থাকে”।

সবসময় মনে রাখবেন, সন্তান যেহেতু আপনার তাই আপনি বুঝিয়ে বললে সে আজ হোক কাল হোক বুঝবেই, প্রয়োজন শুধু কৌশলী কিছু পদক্ষেপের এবং দুঃসময়ে কিছু ভালো পরামর্শের। আর সন্তানদেরকে বলবো, মা- বাবার চাইতে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী কাউকে যদি খুঁজে পায় কখনো তাহলে মনে করতে হবে যে তারা আসলেই মহা ভাগ্যবান।

Most Popular

To Top