ইতিহাস

ভ্যালেন্টাইনের আড়ালে চাপা পড়া রক্তের স্রোত…

১৪ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে ঘ্যানর ঘ্যানর করার সময় এসেছে। গতবার করেছিলাম, পরিচিত বড় ভাইরা প্রতিক্রিয়াশীল বলে গালাগালি করলো, কেননা মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগে আমরা নাকি পিছিয়ে রয়েছি; যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারছি না। উনারা জ্ঞাণী গুনী লোক, তাই চুপচাপ শুনে গিয়েছি। যাই হোক, আবারো ঘুরে ফিরে চলে এসেছে ‘ভালোবাসা দিবস’!

ভালোবাসা দিবসে নিজের কাছে নিজেই প্রশ্ন করি, কোন ভালোবাসা অথবা সুখ আমাদের কাছে মুখ্য? ব্যক্তিগত নাকি সমষ্টিগত? কোন সুখের সন্ধানে আমরা দৌড়াব? ব্যক্তির সুখ? নাকি সমষ্টির সুখ? যদি সমষ্টিগত সুখের কথা বলি, তাইলে ১৪ ফেব্রুয়ারি আক্ষরিক অর্থেই ‘ভালোবাসা দিবস’, অন্তত আমাদের জন্যে হলেও। গুটিকয়েক লোক আত্মত্যাগ করেছে সমষ্টির স্বার্থে, এর চেয়ে অধিক ‘ভালোবাসা’ আর কি হতে পারে!

যাই হোক, ত্যানা না পেঁচিয়ে সরাসরি সেদিনের ঘটনা গুলো নিয়ে আবারো ঘ্যানর ঘ্যানর শুরু করি। স্বৈরাচারী এরশাদ তখন ক্ষমতায়, প্রনীত হয় কুখ্যাত ‘মজিদ খান শিক্ষানীতি’। যদিও এখানে ‘নীতি’ শতভাগ রূপে অনুপস্থিত ছিল। শিক্ষাকে বাণিজ্যিকিকরণ এবং সাম্প্রদায়িক করার প্রস্তাব দেয়া হয় সে নীতিতে। শিক্ষার বেতনের ৫০ ভাগ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা হবে, এবং রেজাল্ট খারাপ হলেও ৫০ শতাংশ বেতন দিলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেয়া হবে – এমন ভূতুরে নীতিও সেখানে অন্তর্ভুক্ত ছিল।

ইতিহাস ও ঐতিহ্য ধরে রেখে ছাত্ররা বরাবরের মতো রুখে দাঁড়াল, আন্দোলনের বিপরীতে শাসকগোষ্ঠী তাদের লাঠিয়াল বাহিনীকে রাস্তায় ছেড়ে দিল। ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারিতে ছাত্ররা পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী মিছিল বের করলে পুলিশ গুলি ছুঁড়ে। জাফর, জয়নাল, দিপালী সহ অনেকেই মারা যান। যদিও সরকারি প্রেসনোট বলেছিলে মৃতের সংখ্যা ১ জন। কিন্তু মোট ১১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। একজন বলেছিলেন সেদিনের অভিজ্ঞতার কথা, ‘১৪ ফেব্রুয়ারি আমরা শুধু জয়নালের লাশ পাই। দিপালী সাহার লাশ গুম করে ফেলে। তার লাশ আমরা পাইনি। ১৫ ফেব্রুয়ারি কাঞ্চন চট্টগ্রাম শহরে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। আরো অনেকে নিখোঁজ হন। তাদের জীবিত বা মৃত কোনও অবস্থাতেই পাওয়া যায়নি।’ সেই সাথে চলতে থাকে গণ গ্রেফতার। তীব্র আন্দোলনের মুখে স্বৈরাচারী শাসকের শিক্ষানীতি বাতিল হয়। একসময় স্বৈরাচারী শাসকেরও পতন ঘটে, যদিও তিনি এখনও রাজনীতিতে সক্রিয়। যারা আন্দোলন করে তার পতন ঘটিয়েছিল, তারাই আজ ঘর বেঁধেছে তার সাথে! এই নির্মম পরিহাস মেনে নেয়া ছাড়া উপায় নাই।

১৪ ফেব্রুয়ারি এককালে ছিলো ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’, ভালোবাসা আর রক্তে রাঙানো ছিল দিনটা। এক সময় নাকি ঢাবিতে জয়নাল, জাফর, কাঞ্চন, দিপালী সাহাদের নামে স্লোগান দেয়া হতো। এখন আর সেদিন নাই। রক্তে রাঙানো ‘ভালোবাসা’ হারিয়ে গিয়েছে ‘ভোগবাদী’ ভালোবাসার আড়ালে। ‘আমি-তুমি’ ভালোবাসার রাজনীতিতে হারিয়ে গিয়েছে জয়নাল, জাফরদের ‘সমষ্টিগত’ ভালোবাসা। এখনও গোলাপের রঙে লাল হয় ১৪ ফেব্রুয়ারি, তবে সেটা সীমিত ‘আমার-তোমার’ এর মধ্যে, সেখানে ‘সবাই’ অনুপস্থিত! মুক্তবাজার অর্থনীতি যে বিচ্ছিনতার কথা বলে, সেখানে এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক। এখন আমরা সবাই পণ্য। এক বন্ধু বলেছিল, এই যুগে কোন দিবসের সাথে ‘পণ্যের’ যোগসাজশ না থাকলে সে দিবসকে টিকিয়ে রাখা যায় না। ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ এর সাথে কোন পণ্য জড়িত না, কিন্তু আমাদের ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’তে কেনাকাটার তালিকা বহুত লম্বা। তাই স্বাভাবিক ভাবেই হারিয়ে যায় দিপালীর আর জয়নালরা।

শাসকগোষ্ঠী ছাত্র আন্দোলন ভয় পায়। বিশেষ করে আমাদের মতো দেশে – যেখানে ছাত্র আন্দোলনের ঝলমলে ইতিহাস বিদ্যমান। ছাত্র আন্দোলন শাসকদের জন্যে রীতিমত ভয়ংকর ব্যাপার! যে বা যারা এক কালে ছাত্র আন্দোলনকে সমর্থন দেয়, তারাই যখন শাসক হয়ে ওঠে তখন তারাও ছাত্র আন্দোলনকে দমন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাই, শাসকগোষ্ঠী কখনো চাইবে না জয়নাল-দিপালীদের নাম আমরা মনে রাখি, তাদের থেকে অনুপ্রেরণা নেই! এর চেয়ে শাসকগোষ্ঠী চাইবে ছাত্ররা ডুবে থাকুক ‘আমি-তুমি’ ভালোবাসায়। চুলোয় যাক রাজনীতি। আমরাও তাই আওড়াই ‘আই হেট পলিটিক্স!’

দুরাশা! তবু আশা রাখি, স্বপ্ন দেখি, জয়নাল-দিপালীরা আমাদের মাঝে ভর করবে। কোন এক ফেব্রুয়ারিতে  ঝড় উঠবে! বিশেষ করে বর্তমানে যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় গুলো দলীয় সন্ত্রাসের আখড়ায় পরিণত হয়েছে, সেখানে এইবারের ১৪ ফেব্রুয়ারি আমাদের কাছে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠার কথা! আলো দেখিয়েছিল জয়নাল-দিপালীরা, এবার দেখা যাক, সেই আলোয় কতটা আলোকিত আমরা হই!

Most Popular

To Top