বিশেষ

একজন বৃক্ষ মানবের সাথে প্রেম

প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে জেনেছিলাম বৃক্ষমানব আবুল বাজনদারের বিয়েটা ছিলো প্রেমের বিয়ে। সব প্রেমেই কোন না কোন বাঁধা আসে, হয় ধর্ম নয় পরিবার কিংবা ধনী-গরিবের ব্যবধান। কিন্তু এখানে বাঁধা বিরল রোগ “ট্রিম্যান সিনড্রোম”। এই বাঁধা পেরিয়ে কিভাবে ভালোবাসার জয় হলো, সেই গল্প বললেন বৃক্ষমানব। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে বাজনদারের কক্ষে ঢুকতেই দেখা যায় স্ত্রী হালিমা খাতুন স্বামীর চুল আঁচড়ে দিচ্ছেন। এরপর পানি দিয়ে মুখ মুছিয়ে দিলেন। বললাম, আপনাদের ভালোবাসার গল্প জানতে এলাম। সাথে সাথেই লাজুক হাসি দুজনের।

প্রায় ১৩ বছর ধরে বিরল “ট্রিম্যান সিনড্রোম” রোগে ভুগছেন আবুল বাজনদার। এই রোগে তার হাত ও পায়ের আঙ্গুল গুলো গাছের শিকড়ের মতো হয়ে যায়। ২০১৫ সালের ৩০ জানুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে ভর্তি হন বাজনদার। এ পর্যন্ত অসংখ্য অপারেশন হয়েছে তার হাতে ও পায়ে। এখন অনেকটাই স্বাভাবিক মানুষ বাজনদার।

বিরল ট্রিম্যান রোগে ভুগলেও আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতোই বাজনদারের জীবনেও এসেছে প্রেম। বাজনদার বললেন, আমার বাড়ি খুলনার পাইকগাছা গ্রামে আর হালিমার বাড়ি চুনকুরি গ্রামে। এরপর লাজুক মুখে বলতে থাকেন নিজের প্রেমের কাহিনী।

বিরল রোগে আক্রান্ত হওয়ার আগে চুনকুরি গ্রামে বোনের শ্বশুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে পরিচয় হয় প্রতিবেশী হালিমা খাতুনের সাথে। তখন থেকে একটু একটু ভালো লাগা জন্মালেও বলা হয়নি পছন্দের মানুষটিকে। ২০০৫ সালে বিরল “ট্রিম্যান সিনড্রোম” রোগে আক্রান্ত হওয়ায় কয়েক বছর আর যোগাযোগ হয়নি হালিমার সাথে। এরপর হালিমা খাতুন নিজেই দেখতে আসেন আবুল বাজনদারকে। ততদিনে বাজনদারের হাত ও পা গাছের শিকড়ের মতো হয়ে গিয়েছে, প্রায় দুই ইঞ্চি বেড়ে গেছে রোগটা। সেবার দেখা করে ফিরে যান হালিমা খাতুন। তবে দুজন দুজনের মোবাইল ফোন নাম্বার নেন।

তারপর থেকে প্রায়ই ফোনে কথা হতো। একসময় বাজনদার হালিমাকে বলেন তার ভালোবাসার কথা। ভালোবাসার গল্প বলার এই পর্যায়ে হালিমা খাতুন লাজুক হেসে বলেন, “ওই কথা শুইনে আমি চুপ আছিলাম, তিন চারদিন ভাবছি হেরপরে জবাব দিছি।”

হালিমা খাতুন এসএসসি পাস করে কলেজে ভর্তি হয়েছেন। সম্পূর্ণ সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ তিনি। অপরদিকে আবুল বাজনদারের লেখাপড়া করা হয়নি, বিরল রোগে আক্রান্ত হয়ে অনেকটা সমাজচ্যুত হয়ে বসবাস করছিলেন। এরপরও তাদের দুজনের মনে জন্ম নেয় অকৃত্রিম ভালোবাসা।

স্বামীর সেবা করছেন হালিমা

আবুল বাজনদার বলেন, ২০১১ সালের কথা, একদিন কলেজে যাবার কথা বলে হালিমা খাতুন চুনকুরি গ্রাম থেকে পাইকগাছায় বাজনদারদের বাড়িতে চলে আসেন। সেই যে আসা আর ফেরত যাননি তিনি। অনেক বার পরিবারের লোকজন নিতে আসলেও বাজনদারকে ছেড়ে যাবেন না, এই সিদ্ধান্তে অটল থাকেন হালিমা। এরপর বিরল রোগে আক্রান্ত হাত ও পায়ে গাছের শিকড়ের মতো হয়ে পড়া আবুল বাজনদারের সাথে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন তিনি।

এবার হালিমা খাতুনের পালা। বললাম, বাকীটা আপনার কাছ থেকে জানতে চাই।

বিরল রোগে আক্রান্ত, কর্মক্ষম নয়, পরিবারের বাঁধা এতো কিছুর পরও কেন তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিলেন? প্রশ্ন করছি আর মনে মনে ভাবছি সুস্থ-সবল, শিক্ষিত, উপার্জনক্ষম অনেক মানুষই হিসাব-নিকাশের বেড়াজালে ভালোবাসা হারিয়ে ফেলে। সেখানে হালিমা খাতুন এত মনের জোর কোথায় পেলেন?

মিষ্টি হেসে হালিমা খাতুন বলেন, “প্রেম তো হইছে মন দিয়া, হের (বাজনদার) রোগ হইলে কি হইবো। মন তো আর এত কিছু মানে না।”

এরপর বলে চলেন তার মনের কথাগুলো। “অনেক আগে দেখা শুনার পর মাঝখানে বহু বছর দেখা নাই, কথা নাই। একদিন দেখতে আসবার পর হেরে দেইখা কান্দন চইল্যা আইলো। কি যে অবস্থা নিজে হাতে কিছু করবার পারে না। সব মানষে নানান কথা কয়। এসব দেখবার পর হের প্রতি আমার ভেতর কেমন যেন মায়া হইলো। বাপ-মা রাজি না, তাদের কথা এই পোলা তোরে কইর‍্যা খাওয়াইতে পারব না, সারা জীবন তোর হের সেবা কইরাই যাইবো। আমি জানি তারা রাজি হইব না, তাই পালাইয়া হের কাছে চইলা আসছিলাম”- বলেন হালিমা।

“আমার মনে হইলো আমি তারে ভালোবাসি, রোগ তো আল্লায় দিছে এর জন্যে আমি তারে ছাইড়া যামু কেন? আমার তো দুইটা হাত আছে, চলতে পারি। আমি কাজ কাম কইরা দুই বেলা ভাত জুটামু, তাও আমার ভালোবাসারে ছাইড়া যামু না”, বলেন হালিমা।

২০১১’তে বিয়ের পর ২০১৩ সালে ট্রিম্যান দম্পতির কোল জুড়ে আসে ফুটফুটে মেয়ে তাহিরা। প্রতিবেদন তৈরির কাজে আগেও বেশ কয়েকবার যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে বাজনদারের কক্ষে। প্রতিবারই হালিমা খাতুনের চোখে মুখে দেখেছি প্রাণবন্ত হাসি।

২০১৬-এর জানুয়ারিতে বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নিতে আসার আগে অন্য লোকজনের বাড়িতে ছুটা বুয়া হিসাবে কাজ করে সংসার চালাতেন হালিমা খাতুন। পাশাপাশি স্বামীর সব রকম সেবার দায়িত্বও তার ওপর। বাজনদারের খাওয়া, গোসল, প্রাকৃতিক কাজের পর পরিচ্ছন্ন করাও হালিমার নিত্যদিনের কাজ।

আবুল বাজনদার বলেন, এত বছর ধরে হালিমা তার সব সেবা করা আসছেন কিন্তু কখনো বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখেননি। বর্তমানে সুস্থ হয়ে ওঠার পেছনেও স্ত্রীর অনেক ভূমিকা আছে বলে জানান বাজনদার। তিনি বলেন, “ও (হালিমা) কত কত সাংবাদিক, এনজিও’র লোকের কাছে যাইতো আমার অসুখের কথা জানাইতে। এমন কইরাই একদিন এক সাংবাদিকের কাছে আমারে জোর কইরা নিয়া যায়। তারপর সেই সাংবাদিকের সাহায্যেই ঢাকায় আসি। হে (হালিমা) না চেষ্টা করলে হয়তো কোনদিন ভালো হইতে পারতাম না, এত দিনে অসুখ আরো বাড়ত।”

জীবনের এই পর্যায়ে এসে এই বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে মাঝে মাঝে মনে কোন অনুশোচনা জাগে কি না জানতে চাইলে হালিমার জবাব, “দেইখা শুইনা জাইনা বুইঝাই তো ভালোবাসছি। সেবা করতে বিরক্ত হওনের তো কিছু নাই। আর ঝগড়াঝাটি তো মাঝে মাঝে হইবই।”

দিন রাত সেবা করে ক্লান্তি নেই হালিমার

হালিমা খাতুনের বিশ্বাস ছিলো বাজনদারের এই রোগ জন্মগত নয়, তাই কোন না কোনদিন সে (বাজনদার) সুস্থ হয়ে যাবে। স্বপ্ন দেখতেন কোনো ভাবে যদি ইত্যাদির হানিফ সংকেতের সাথে দেখা করতে পারেন তাহলে তাকে বলবেন বাজনদারের অসুখের চিকিৎসা করানোর কথা।

হানিফ সংকেতের সাথে দেখা না হলেও হালিমার বিশ্বাসের জোরেই হয়তো একদিন সাংবাদিক আবদুল বারি’র সাথে দেখা হয়। আর ট্রিম্যান আবুল বাজনদার হয়ে ওঠেন দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার সফলতার প্রতীক।

তাদের ভালোবাসার গল্প শুনে ফেরার সময় দেখলাম দুজনের মুখে অকৃত্রিম হাসি। হালিমা এবং আবুল বাজনদারের ভালোবাসা প্রমাণ করে সত্যিকারের প্রেম হৃদয় দিয়েই টিকে থাকে, অর্থ-বিত্ত কিংবা সৌন্দর্য দিয়ে নয়।

Most Popular

To Top