শিল্প ও সংস্কৃতি

কান কাটা রমজান

বসন্তের প্রথম দিনে যখন শিমুলের ডালে রঙ লেগেছে, ঠিক তখনই পৃথিবী ছেড়ে গিয়েছেন তিনি। মঞ্চ, টিভি কিংবা চলচ্চিত্র- তিন মাধ্যমেই রাজত্ব করেছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় পেয়েছেন নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের সহচার্য। স্বাধীনতার আগে পড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জৈব রসায়নে, স্বাধীন দেশে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন অর্থনীতি বিষয়ে। তবে, বিজ্ঞান কিংবা অর্থনীতির বড় বড় অংকের হিসাবে কিছুতেই মন বসেনি তার। তিনি হয়েছেন অভিনেতা, আমাদের হুমায়ুন ফরিদী।

আমাদের হুমায়ুন ফরিদী

দেখতে দেখতেই পেরিয়ে গেলো ছয় বসন্ত, তিনি চলে গেছেন ওপারে। কিন্তু বাংলা বিনোদন জগত কি আজও তার অভাব ঘোচাতে পেরেছে? না, পারেনি। হয়তো শত বছরেও পারবে না। কেননা এমন সব্যসাচী জন্মান না যুগে যুগে।
জাহাঙ্গীরনগরে পড়া অবস্থাতেই ১৯৭৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্য উৎসব আয়োজনের প্রধান উদ্যোক্তা, এ সময়েই ঢাকা থিয়েটারে যোগ দেয়ার কথা অনেকেই জানেন। তবে, অভিনয় ভালোবেসে ফরিদী মঞ্চে দাঁড়ান তারও অনেক আগে।

বাবা এ টি এম নুরুল ইসলামের চাকরির সুবাদে বিভিন্ন জেলায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছে তার। তেমন করেই ১৯৬৫ সালে মাদারীপুরের ইউনাইটেড ইসয়ালামিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানেই প্রথম নাটক করেন ফরিদী। শিল্পী নাট্যগোষ্ঠী নামে এক সংগঠনের নাট্যকর্মী হয়ে ‘ত্রিরত্ন’ নামে নাটক দিয়ে অভিনয়ের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠে ফরিদীর। এতে ‘রত্ন’ চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। সেই ‘রত্ন’ চরিত্রের কিশোর ফরিদী একসময় হয়ে উঠেন দেশের অভিনয় জগতের ‘রত্ন’। ৭০ এর দশকে একচেটিয়া মঞ্চে রাজত্ব করেছে হুমায়ুন ফরিদী। কীর্তনখোলা, শকুন্তলা, কেরামত মঙ্গল নাটক গুলোতে মঞ্চে তার অভিনয় হয়ে উঠে অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

৮০’র দশকে টিভি নাটকে অভিনয় করে রীতিমতো সাড়া ফেলে দেন। ভাঙ্গনের শব্দ শুনি, কোথাও কেউ নেই, সংশপ্তকসহ বহু নাটকে হুমায়ুন ফরিদীর অভিনয় দর্শকদের মাতিয়ে রাখে। “কান কাটা রমজান”  নামটা বললেই চোখে ভেসে ওঠে ফরিদীর চেহারা! সংশপ্তক নাটকের এই বিখ্যাত চরিত্র আজও মানুষ ভোলে নি।

বিখ্যাত চরিত্র কান কাটা রমজান

শুধু নায়করা নয়, খল নায়করাও ভালো নাচতে পারে, নাচাতে পারে- দর্শকদের এমন চমৎকার নিখাদ বিনোদন দিয়েছিলেন হুমায়ুন ফরিদী। “তোমরা কাউকে বলো না, কাউকে বলো না…এই তো প্রথম একটি মেয়ে আমার প্রেমে পড়েছে, পাগল করেছে, আমায় যাদু করেছে”  মৌসুমীর সাথে সেই নাচের স্টেপ দর্শক ভুলবে না কখনো। গানের কথাগুলো তখন মানুষের মুখে মুখে ফিরতো।

১৯৯০ সালে পা রাখেন চলচ্চিত্র জগতে। তাঁর অভিনয় সিনেমায় যোগ করে ভিন্নমাত্রা। বাংলা চলচ্চিত্র পায় অনবদ্য অভিনয়ের একজন খলনায়ক। বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের পাশাপাশি আর্ট ফিল্মেও অভিনয় করেছেন তিনি। দুক্ষেত্রেই পেয়েছেন সফলতা। ফরিদীকে  খলনায়ক , সরল ভালো মানুষের চরিত্রে কিংবা প্রেমিক পুরুষ, পর্দায় তাঁর যেকোন উপস্থিতিই দর্শক মন জয় করেছে।

কমেডিতেও কম যান না, মনে আছে ‘পালাবি কোথায়?’ চলচ্চিত্রের কথা। শাবানা, চম্পা, সুবর্ণা মোস্তফার সাথে প্রেম, গান, নাচ আর কমেডি মিলে আহা কি অভনয়!

মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক ছবি একাত্তরের যিশু, শ্যামল ছায়া, জয়যাত্রা ছবিতেও হয়েছেন প্রশংসিত। ২০০৪ সালে ‘মাতৃত্ব’ ছবির জন্য সেরা অভিনেতার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান কিংবদন্তি এ অভিনেতা।

ব্যক্তি জীবনে প্রথম স্ত্রী মিনুর সাথে তালাকে গিয়ে ১৯৮৪ সালে বিয়ে করেন সুবর্ণা মোস্তফাকে। দীর্ঘ ২৪ বছর একসাথে চলার পর ২০০৮ সালে তাদের বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর, মৃত্যু অবধি নিঃসঙ্গই কাটিয়েছেন এ অভিনেতা। প্রথম স্ত্রীর ঘরে ‘দেবযানী’ নামে এক কন্যা সন্তান রয়েছে তাঁর।
১৯৫২ সালের ২৯ মে ঢাকায় জন্ম ফরিদীর। ২০১২ সালে ১৩ ফেব্রুয়ারি পৃথিবী ছেড়ে যান কিংবদন্তী এ অভিনেতা।
বাংলা অভিনয় জগতের প্রবাদপ্রতিম পুরুষ হুমায়ুন ফরিদীকে এ বছর মরণোত্তর একুশে পদক প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়।

Most Popular

To Top