গল্প-সল্প

একটি অনুসন্ধান!

একেবারেই অগোছালো টেবিলের উপর থেকে ডায়রিটা হাতে নিলাম। কেমন যেন সুখী সুখী একটা গন্ধ পেলাম ডায়রি থেকে। ডায়েরিটা খুলে পড়তে শুরু করলাম। না না ভাববেন না অনধিকার চর্চা করছি। আমি তদন্তের দ্বায়িত্বে আছি। আমার অধিকার আছে তদন্তের স্বার্থে এই ঘরের যেকোন কিছু পড়ার বা দেখার।

৫ই জানুয়ারি, ২০১৩ রাত ৯ টা বেজে ৫০ মিনিট
সময়টা একদম ভালো না। গত সপ্তাহের কথা। আমি বিকালে যখন আসছিলাম, খুব ভিড় দেখে থমকে দাঁড়ালাম। মানুষ ঘিরে আছে কাউকে। আমি ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেলাম কোন মতে। চমকে উঠলাম। এটাতো আমার লিমা! মানুষগুলো কি উজবুক! মেয়েটাকে ঘিরে কি মজা দেখছে? হাসপাতালে নিতে হবে না? আমি সবাইকে ধমকালাম খুব। দ্রুত হাসপাতালে নিলাম লিমাকে। মেয়েটা এখনও হাসপাতালেই আছে। কবে যে ছাড়া পাবে……!

৬ই জানুয়ারি রাত, ২০১৩, রাত ১১ টা বেজে ১৫ মিনিট
লিমাকে দেখতে গিয়েছিলাম আজ। কি আজব ডাক্তার গুলো! কিছুতেই দেখতে দিল না! কি সব আজগুবি কিছু কথা শোনালো আমাকে! এরা এরকম কেন? আরে যে মেয়েটাকে আমি কয়েকদিন পর বিয়ে করবো, সে আমার দূরের কেউ? আমি গেলে সমস্যা কি?

৭ই জানুয়ারি সন্ধ্যা, ২০১৩ সন্ধ্যা ৭ টা ১০ মিনিট
মানুষ গুলো এরকম করছে কেন? সমস্যা কি এদের? অনেক সহ্য করেছি আর না। চাকরিটা আমি ছেড়ে দেবো। এখানে থাকবো না। লিমাকে সোজা জানিয়ে দিয়েছি। বলেছি, “তুমি এখন সুস্থ। সবাই স্রেফ তোমাকে আমার থেকে দূরে সরানোর জন্য এসব করছে। আমি তোমাকে নিয়ে দূরে কোথাও চলে যাব। এটাই আমার সিদ্ধান্ত।” লিমা কখনও আমার মতের বিরুদ্ধে কিচ্ছু বলে না। বলবে কি, ওর আর আমার মত এতো বেশি মেলে যে, বিরুদ্ধে যাওয়ার দরকারই পরে না! যাই হোক, তল্পি তল্পাসহ আমি কাল এখান থেকে চলে যাচ্ছি। কোথায় যাব জানি না। তবে যেখানেই যাই, লিমা আর আমি একসাথেই যাব, এটুকু নিশ্চিত।

১০ই জানুয়ারি, ২০১৩ সকাল ১০টা বেজে ২০ মিনিট
উফ! যা গেলো আমার আর লিমার উপর দিয়ে! যাই হোক, এখন আর কোন সমস্যা নাই। আমরা বিয়ে করে ফেলেছি! এর চেয়ে বড় খবর আর কি হতে পারে! আমার ব্যাংকে যে টাকা আছে, সেই টাকার ইন্টারেস্ট দিয়ে দুজনের বেশ চলে যাবে। আর কিছু করার দরকারই নেই। আমরা জীবনটাকে উপভোগ করবো। লিমা এখনও ঘুমাচ্ছে। যাই, ওকে ডাকতে হবে।

এ পর্যন্ত পড়ার পর আমার কেমন যেন গোলমেলে লাগলো সব। কিছু ছবি আঁকার চেষ্টা করেছেন ভদ্রলোক। আঁকার হাত একেবারে খারাপ না। মনে হচ্ছে “লিমা” বলে মেয়েটির ছবিই আঁকার চেষ্টা করেছেন তিনি। এরপর আরও পড়লাম কয়েক পাতা। প্রায় প্রতিদিন ডায়রি লিখেছেন তিনি। তবে তেমন কিছুই নেই সেখানে লেখা।

৫ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ রাত ১০ টায় লিখেছেনঃ
আজ ঘুরতে বের হয়েছিলাম আমি আর লিমা। পথে আরেক দম্পতি, সাথে তাদের বেবি। অমনি লিমা বায়না ধরলো, কবে আমাদের এরকম একটা বেবি হবে! কি বলি ওকে? এই সুখের সংসারে বাচ্চার ঝামেলা না নিলেই কি নয়? কিন্তু যাই হোক, লিমার সাথে আমার দ্বিমত হয় না কখনও। এবারো হবে না আশা করছি। তবে, আমাদের জার্নি বেশ সুন্দর ছিলো। ঘুরে অনেক মজা পেয়েছি। মাঝে মাঝে বেড়াতে হবে।

আরও কয়েক পাতা পড়লাম। একই রকম কথাবার্তা। আজকের তারিখ পর্যন্ত পড়াটা দরকার। তাহলে একটা কূল কিনারা করা যাবে হয়তো।
ডায়রির শেষের দিকটা দেখলাম।

২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০১৩ রাত ৩ টা বেজে ৪০
লিমা আজ ঘুমাতে এত দেরি করলো! ওর জন্য আমারও দেরি হয়ে গেলো। যাই হোক, একটু লিখেই ঘুমাই। নাহ, লিখবো না। ভালো লাগছে না। অনেক গুরুত্বপূর্ন আজকের দিনের ঘটনা। কাল লিখবো।

২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০১৩ দুপুর ২ টা ২৫
কালকের ঘটনাটা বলি। ইমরান আর আরিফ কোথা থেকে এসে হাজির হলো আমার এখানে ঈশ্বর জানে! তাদের বক্তব্য, আমি নাকি এখানে পালিয়ে আছি! আরে আজব! আমি ওদের লিমার কথা বলিনি যদিও। বললে যদি আবার লিমাকে এখান থেকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে? কিন্তু, ওদের কথা খুব অদ্ভুত। যা বললো, তা লেখার ধৈর্য্য নেই আমার। কিন্তু মনে হলো এই দুটো নির্ঘাত পাগল হয়ে গেছে!

এই পর্যন্ত পড়ে নিতান্তই বিরক্ত হলাম আমি। ইমরান আর আরিফ এরা কারা? বন্ধু? তারা কি বললো সেটা লেখেনি কেন?? আবার পড়তে লাগলাম।

৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০১৩ রাত ১১ টা বেজে ৫ মিনিট
লিমা আর আমি চিরকাল বাঁচতে পারবো না। এটাতো সত্যি। এই সত্যিকে অস্বীকার করি কি করে? কিন্তু… আমি বুঝতে পারছি না। কেন আজ আমার লিমার উপরে এত রাগ হচ্ছে? আর এই ইমরান আর আরিফ আবার এসেছিল। তাদের সেই কথাগুলো আবার বলতে এসেছে! লিমার সাথে এতদিন আমি এখানে আছি, আর তারা বলছে…? আবারও আমাকে লিমার থেকে দূরে সরানোর চেষ্টা! আমি ঠিক কাজ করেছি। মোটেই অন্যায় কিছু করিনি। কিন্তু, খুব দূর্গন্ধ এ ঘরে। ব্যাটারা কি মরেও আমাকে শান্তি দেবে না? লিমার দূর্গন্ধ একদম সহ্য হয় না।

এরপরের পাতা। এটাই শেষ পাতা ডায়রির। কোন তারিখ বা সময় লেখা নেই। কে জানে, এটা হয়তো কাল রাতেই লেখা! গভীর মনযোগ দিয়ে পড়তে শুরু করলাম।

ইমরান, আরিফ…ক্ষমা করে দিস আমাকে। মাথা ঠিক ছিল না আমার। তবে চিন্তা করিস না। তোদের সাথে দেখা হবে আমার। আজই। আমি আর লিমা তোদের পথেই যাচ্ছি। একটু পরেই।

এবারে সব বুঝতে পারলাম আমি। কোন কিছুই নয়, স্রেফ বদ্ধ পাগল এই লোক। ইমরান আর আরিফকে খুন করেছে নিজেই। তারপর নিজেই গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করেছে। খুন করেছে লিমাকেও। তবে, সেটা কল্পনায়। কারণ, লিমা মারা গেছে ৫ই জানুয়ারি, ২০১৩। যেদিন থেকে তার এই ডায়রি লেখা শুরু।

লিখেছেনঃ অমিত বাগচী। https://www.facebook.com/amitything

Most Popular

To Top