শিল্প ও সংস্কৃতি

বসন্ত এসে গেছে

“বাতাসে বহিছে প্রেম, নয়নে লাগিলো নেশা
কারা যে ডাকিলো পিছে, বসন্ত এসে গেছে
মধুর অমৃত বাণী, বেলা গেলো সহজেই
মরমে উঠিলো বাজি, বসন্ত এসে গেছে
কুহু কুহু শোনা যায়, কোকিলের কুহুতান
বসন্ত এসে গেছে, বসন্ত এসে গেছে”

গানের কথাগুলো যেনো হৃদয়ে বসন্তের দখিনা পবনের দোল দিয়ে যায়। হা, পাঠক দেখতে দেখতে শীত শেষ, বসন্ত এসে গেছে।

হলদে সাজে, বাঙ্গালীর বসন্ত বরণ উৎসব পালনের ইতিহাস খুব বেশি পুরনো নয়। প্রাচীন বাংলায় সব ধর্মের মানুষের মধ্যে বসন্তকে বরণ করে নিতে কোন আয়োজন ছিলো বলে জানা যায় না। তবে, সনাতন ধর্মাবলম্বীরা প্রাচীন কাল থেকেই বসন্ত বরণ করছে উৎসব আমেজে। বৈষ্ণব মত অনুসারীরা এ উৎসব পালন করতো বেশ ঘটা করে। পাঠক, আপনারা তো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দোল উৎসব বা হোলি খেলা সম্পর্কে জানেন। এই দোল বা হোলি উৎসবই হিন্দুদের বসন্ত উৎসব। যা পালিত হয়ে আসছে শ্রীকৃষ্ণের সময় থেকে। হিন্দু ধর্ম অনুসারীরা বিশ্বাস করে , ফাগুনের পূর্ণিমা তিথিতে, শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবনে রাঁধাকে আবির বা রঙ মাখিয়ে দিয়েছিলেন। সে সময়, শ্রীকৃষ্ণ, রাধিকা ও অন্য গোপীদের সাথে রঙের খেলায় মেতে উঠেন সবাই। সেই থেকেই বৈষ্ণবীরা ফাল্গুনী পূর্ণিমায় দোলযাত্রা পালন করে আসছেন। ক্রমে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উৎসবে পরিণত হয় দোল বা হোলি।

শিল্পীর কল্পনার তুলিতে হোলি খেলা

বাঙ্গালীর হলুদ বরণে বসন্ত পালন শুরু হয় কবিগুরু রবি ঠাকুরের সময় থেকে। রাবীন্দ্রিক সাজে, নাচে- গানে বসন্তকে বরণ করে নেয়া হতো শান্তিনিকেতনে। সেই থেকে শুরু বাঙ্গালির হলদে- সোনালি বসন্ত বরণ। এতো গেলো ওপার বাংলায়।
এপারে মানে বাংলাদেশে বসন্ত বরণ উৎসব চালু হয় ১৪০১ বঙ্গাব্দ থেকে। বসন্ত উদযাপন পরিষদ প্রতি বছর পহেলা ফাল্গুনে আয়োজন করে আসছে বসন্ত বরণ উৎসব।

বর্তমান সময়ে ফাল্গুনের প্রথম দিনে বাঙ্গালীরা রাজপথে নেমে আসে হলদে সাজে। বিশেষ করে তরুণ- তরুণীদের মধ্যে বসন্ত উৎসবের আমেজ ও আবেদন জাঁকজমকপূর্ণ। প্রথমদিকে মানে দুই দশক আগেও বসন্ত উৎসব এমনি কোলাহলে পালন করা হতো না। শুধু ছায়ানটে এবং চারুকলার বকুল তলায় করা হতো সাংস্কৃতিক আয়োজন।

বসন্ত বরণ উৎসব

উৎসব পালনে নতুনত্বের পাশাপাশি এখন সাজেও এসেছে ভিন্নতা। বাসন্তী রঙয়ের পোশাকের পাশাপাশি গেরুয়া হলুদ, সরষে হলুদ এমনকি লাল রঙয়ের পোশাক পড়ছে তরুণ- তরুণীরা।

বাঙ্গালীর যেকোন উৎসবের সাথে সংগীত যেন একাকার হয়ে মিশে আছে। যেমন- ঈদুল ফিতর মানেই রমজানের ঐ রোজার শেষে, বৈশাখ মানেই এসো হে বৈশাখ। এ গানগুলো ছাড়া যেন উৎসব অপূর্ণ লাগে। তেমনি বসন্ত উৎসবের গান কোনটি? হা পাঠক, ঠিক ধরেছেন! আহা আজি এ বসন্তে, কত ফুল ফোটে, কত বাঁশি বাজে, কত পাখি গায়, আহা আজি এ বসন্তে।
এতো কিছু হলো, ফুল থাকবে না তা কি হয়! বসন্ত মানেই গাঁদা ফুল। এখন অবশ্য গাঁদার পাশাপাশি গাজরা, কাঠবেলি আর নানা ফুলে বানানো মাথার রিং ব্যবহার হয় বেশ। চমৎকার সাজে এদিন একুশে বইমেলাতেও ফাগুনের রঙ লাগে।

ক্যালেন্ডারের পাতায় প্রতিবছর এই দিনটি আসে ইংরেজি ১৩ ফেব্রুয়ারিতে। ঠিক তার পরদিন ১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইন ডে। বাঙ্গালি এখনও পাশ্চাত্য ঢঙ্গে এই ভালোবাসা দিবস পালনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি। এখানে ভ্যালেন্টাইনের চেয়ে প্রেম ভালোবাসার আবেগ বেশি প্রকাশিত হয়। ফাগুন মানেই পলাশ, শিমুল, ফাগুন মানেই দখিনা হাওয়া, ফাগুন মানেই হৃদয় রঙ্গিন, ফাগুন মানেই কোকিলের কুহুতান। কবি সাহিত্যিকরা তাদের রচনায় সবচেয়ে বেশি ঠাঁই দিয়েছেন বর্ষাকে, তারপরই আছে ঋতুরাজ বসন্ত। রবি ঠাকুরের অনেক গান কবিতায় লেগেছে বসন্তের রঙ। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ফুল ফুটুক বা না ফুটুক আজ বসন্ত– এ যেনো বাণী চিরন্তনী।

এবছর, রাজধানীর চার স্থানে একসাথে হবে বসন্ত উদযাপন অনুষ্ঠান। প্রতিবারের মতো এবারও সকাল বেলাটা শুরু হবে চারুকলার বকুল তলায়। বেলা ১০টা পর্যন্ত চলবে এ আয়োজন। একই স্থানে বিকাল তিনটা থেকে শুরু হবে বসন্ত বরণের সাংস্কৃতিক উৎসব। বসন্ত উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মানযার চৌধুরী সুইট নিয়ন আলোয়কে জানান, বসন্ত বরণকে পুরো ঢাকায় ছড়িয়ে দিতে চারুকলার পাশাপাশি এবার উত্তরার রবীন্দ্র স্বরণী উন্মুক্ত মঞ্চ, পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক, ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরেও থাকছে বৈকালিক সাংস্কৃতিক আয়োজন।

আপনাদেরও নিশ্চয়ই ঋতুরাজকে বরণ করার নানা পরিকল্পনা আছে। হয়তো মনে মনে গুনগুনিয়ে উঠছে শাহ আবদুল করিমের বাউলিয়া সুর,  বসন্ত বাতাসে সইগো, বসন্ত বাতাসে! 

Most Popular

To Top