গল্প-সল্প

সুরুজ মিয়ার আজব টোটকা

সুরুজ মিয়া neon aloy নিয়ন আলোয়

এক বছর আগের ঘটনা। আমাদের এলাকায় “মা মঞ্জিল” নামের বাসাটায় নতুন দারোয়ান রাখা হয়েছে। দারোয়ানের নাম সুরুজ মিয়া। আলাভোলা মানুষ, সবার সাথেই হাসিখুশি ব্যবহার। লোকের সমস্যা একটাই। তার যে চাকরি, সেটাতে তার বিশাল গাফিলতি। রাতে ১০টার পরে সে চোখই খুলে রাখতে পারে না!

দারোয়ান রাখার মাসখানেক পরেই সেই বিল্ডিং এর ফ্ল্যাটে-ফ্ল্যাটে শুরু হলো চুরি। আজকে দোতলার রুমিদের বাসায় চুরি, তো কালকে চারতলার সুমিতদের বাসায়। এক মাসের মধ্যে দেখা গেলো পাঁচতলা বিল্ডিং-এ এমন কোন ফ্ল্যাট নাই, যেটায় চুরি-ডাকাতি হয়নি। বাড়িওয়ালী থাকেন ধানমন্ডিতে, নিজের ডুপ্লেক্স বাসায়। চুরি-ডাকাতির অত্যাচারে বিল্ডিং এর সবাই যখন একে একে বাসা পাল্টানো শুরু করলো, তখন বাড়িওয়ালী ডেকে নিলেন নতুন দারোয়ানকে।
– কি সুরুজ মিয়া, বাসাবাড়িতে একটানা চুরিডাকাতি হচ্ছে। তুমি করো কি সারাদিন?
– আফা, আমি তো ঘুমে থাকি। আমার হিসাব থাকে না। ঘুম কেমনে তাড়ানো যায় ওই চিন্তায় মাথার চুল ছিঁড়তে ছিঁড়তে আর একটা চুলও বাকি নাই। এখন এলাকায় লোকজন সুরুজ টাক্লা ডাইকা মজা নেয়।

তারপরেও বাড়িওয়ালী ভদ্রমহিলা সুরুজ মিয়ার চাকরি খেলেন না। এমনিতেই বয়স্ক মানুষ, এই বয়সে চাকরি হারালে খাবে কি? আর তাছাড়া যেই লোক নিজ মুখে নিজের অপরাধ স্বীকার করতে পারে, তার মত সৎ লোককে হাতছাড়া করা কি বুদ্ধিমানের কাজ হবে?

তো যেটা হল, বদনামের কারণে ওই বিল্ডিং-এ আর কেউ বাসা ভাড়া নিতে চায় না। কিন্তু ঢাকা শহরের মত জায়গায় কি আর বাসা খালি পড়ে থাকে? কয়দিন পর নতুন ভাড়াটিয়া উঠা শুরু করলো বাসায়। কিন্তু নতুন লোকগুলো কেমন জানি! খুব একটা সুবিধার মনে হয় না দেখে। কিন্তু একই এলাকায় থাকার কারণে প্রতিদিন রাস্তায় বের হলেই দেখা-সাক্ষাৎ হয়ে যায় প্রায়ই, তখন তো আর এড়িয়ে যাওয়ার অভদ্রতা করা যায় না! কিন্তু লোকগুলোর কথাবার্তাই কেমন যেন, কথায় কথায় জিজ্ঞেস করে- “ভাইজানের হাতঘড়িটা তো বেশ দামী মনে হচ্ছে, বিয়ের গিফট নাকি? বিয়েই করেন নাই? টাকা পয়সা জমাচ্ছেন নাকি? তো ঘড়িটার দাম কেমন? শাওমি মোবাইল ইউজ করেন কেন? আইফোন কিনেন, রিসেল ভ্যালু ভাল!” আরে ভাই, আমি কি ঘড়ি ইউজ করি, কোন ফোনে কথা বলি- এগুলা জেনে তোমার কি কাজ?

আমাদের ব্যবহার্য জিনিসপাতি নিয়ে এলাকার নতুন ভাড়াটিয়াদের এত আগ্রহ কেন বুঝা গেলো কয়েকদিন পরে। আগে যেখানে শুধু একটা বিল্ডিং-এ চুরি-ডাকাতি হতো, এখন সেখানে পুরো এলাকায়ই চুরি শুরু হলো! আশ্চর্যের বিষয়, আগে চোররা শুধু রাতেই চুরি করতো, এখন দিনের ২৪ ঘণ্টাই কোন না কোন বাসায় এটা-ওটা হারাচ্ছে। আর চোররা কিভাবে কিভাবে যেন জেনে যায় কোন সময় কোন বাসা খালি থাকে। ঠিক ওই সময়ই হানা দেয় চোরের দল।

এর মাঝে আমার বাসায়ও চুরি হলো, সাধের শাওমি ফোনটা হারালাম। সকালে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাথরুমে গেলাম, ফিরে এসে দেখি বালিশের পাশে রাখা ফোন গায়েব! চিল্লাচিল্লি শুনে লোকজন জড়ো হলো, এর মাঝে সুরুজ মিয়াকেও দেখা গেলো। সবাই এটা-ওটা ধারণা করছে। কারো ধারণা চোর জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে নিয়ে গেছে ফোনটা। কিন্তু খাট তো জানালা থেকে অনেক দুরে, আর জানালা ভিতর থেকে বন্ধ করা। তার মানে চোর সদর দরজা দিয়ে ঢুকেই কাজ সেরেছে। হঠাৎ মনে পড়লো, সুরুজ মিয়াদের বাড়ির নতুন ভাড়াটিয়াই তো সপ্তাহখানেক আগে আমার ফোনের কথা জিজ্ঞেস করছিলো। পরে এর মাঝে একদিন চায়ের দোকানে দেখা হওয়ার পর কথায়-কথায় জেনে নিয়েছিলেন সকালে কখন ঘুম থেকে উঠি, কখন অফিসে যাই এসব। তাহলে কি ওই লোকই আকামটা সারলো? মনে সন্দেহ উঁকি দিলেও সরিয়ে দিলাম চুরি হওয়ার পর মানুষ সবাইকেই অযথা সন্দেহ করা শুরু করে এই ভেবে। কথায় আছে “মাল যায় যার, ঈমান যায় তার”। আর এইটা তো জানা কথা যে চোর কখনো নিজের এলাকায় চুরি করে না। এত বোকা কোন চোর হয় না।

তবে ফোন হারিয়ে মেজাজ সামলাতে পারলেও সুরুজ মিয়ার কারণে নিজেকে কন্ট্রোল করা কষ্ট হয়ে গেলো। সবাই যখন চলে যাচ্ছে, তখন হঠাৎ সে কি বুঝে বলে উঠলো “আপনে হাগতে গিয়াই তো ব্যাড়াটা লাগাইসেন মিয়া। সকালে না হাগলে হয় না?” তারপর আব্বার দিকে তাকায় বলে- “ভাইজান, সকালে আপনার পানির মিশিনটা বন্ধ রাইখেন। পানি না থাকলে ভাইস্তা হাগতেও যাইবো না, চুরিও হইবো না আর!” আর কি আশ্চর্য, আব্বাও রাজি হয়ে গেলেন এই অদ্ভুত প্রস্তাবে! মানে মাল গেলো আমার, আর বোধ-বুদ্ধি লোপ পেলো আব্বার! অবশ্য আব্বার কাছ থেকে টাকা ধার করেই কিনেছিলাম ফোনটা, যদিও উনি কমদামী ফোন কিনতে বলেছিলেন। ওইটারই শোধ তুলছেন মনেহয় সকালে পানি বন্ধ করে।

পরের কয়েক সপ্তাহে সুরুজ মিয়াদের বিল্ডিং-এ আরও দুইটা ফ্ল্যাটে লোক উঠলো। পরিচয় দিল মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি’র সেলস এক্সিকিউটিভ, ইন্টারনেট কোম্পানি’র টেকনিশিয়ান- এসব। কিন্তু লোকগুলোকে দেখে সেরকম মনে হয় না। তাদের যদি চাকরি-ই থাকে, তাহলে সপ্তাহে সাতটা দিনই ২৪ ঘণ্টা কামাল মামার চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দেয় কিভাবে? তবে এর মধ্যে এলাকার আরও কয়েক বাসায় চুরি হলো।

একদিন পাশের বাড়ির টোকন আমাকে আস্তে করে পাশে ডেকে নিয়ে বলল, “ভাই, ওই পাঁচতলা বাড়ির লোকগুলার মতিগতি তো ভাল ঠেকতেছে না। ওই বাসার দুইতলার ভাড়াটিয়া ওইদিন জিজ্ঞেস করলো কি কম্পিউটার ইউজ করি। তার দুইদিনের মধ্যে আমার ল্যাপটপটা চুরি গেলো। বিষয়টা কি একটু বেশি কাকতালীয় হয়ে যায় না?” বিষয়টা যে আমারও মাথায় আসছে, সেটা আর টোকনকে বললাম না। কারণ ইদানীং সকালে ঠিকমত পেটের চাপ ক্লিয়ার হয় না দেখে সারাদিন মেজাজ খিচড়ে থাকে। অকারণে একে-ওকে বকাবকি করি। এরকম মেজাজ গরম অবস্থায় কারো নামে অভিযোগ আনা ঠিক না।

তবে এতকিছুর মধ্যেও সুরুজ মিয়ার টোটকা বিলানো বন্ধ হলো না। সে এই বাড়ি-ওই বাড়ি করে পাড়ার অর্ধেক বিল্ডিং-এই পানির মোটর কোন না কোন সময় বন্ধ রাখার ব্যবস্থা করে নিয়েছে। আর এলাকার মানুষগুলো-ও বেকুব কিনা বুঝি না। বাথরুমে না গেলেই চোর চুরি করার সুযোগ পাবে না- এই যুক্তিতে কোন কোন বাসায় এখন টয়লেটই তালা মেরে রাখা হয়! সারাদিনে ২ ঘন্টার জন্য ওই বাসাগুলোতে টয়লেট খোলা হয়, এই সময়ের মধ্যেই সবাই পড়িমরি করে কাজ সারে। অবস্থা এতই খারাপ, যে এলাকার সবচেয়ে ভাল ছেলে হিসেবে পরিচিত লাবিবকে দেখলাম রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে পেশাব করছে! দেখেও না দেখার ভান করে হেঁটে চলে গেলাম, কিন্তু একটু পর লাবিব পিছন থেকে দৌড়ে এসে ফিসফিস করে বলল- “আব্বা সারাদিন বাথরুম তালা মেরে রাখে ভাই। কি যে বিপদে আছি! আজকে তো আরেকটু হলে প্যান্টেই ইয়ে করে দিয়েছিলাম!”

আপনারা হয়তো ভাবছেন এই গল্পের শেষ কোথায়? এই গল্পের কোন শেষ নেই, এলাকায় এখনও চুরি হয়। এবং আমরা মোটামুটি সবাই জানি যে চুরি করে মা মঞ্জিলের ভাড়াটিয়ারাই। দারোয়ান সুরুজ মিয়ার গাফিলতিতেই তারা ওই বিল্ডিং-এ চুরি করার সাহস পেয়েছে, এবং পরে যখন দেখেছে এই এলাকার লোকজন সাধাসিধা, তারা সাহস করে ওই বিল্ডিং-এই বাসা ভাড়া নিয়েছে! আমরাও কেউ চক্ষুলজ্জা ভেঙে তাদের সরাসরি পাকড়াও করার চেষ্টা করিনাই। শুধু পাশের বাড়ির টোকন একদিন সুরুজ মিয়াকে ধরেছিলো উনি ওনার বিল্ডিং-এ চোর রেখেছে কেন জানতে চেয়ে। সুরুজ মিয়া উল্টো “আমারে কি চুরের বাড়ির চৌকিদার কইতেছেন আফনে? ভালা মাইনষের নামে আজাইরা গুজব ছড়াইয়েন না মিয়া” বলে তাড়িয়ে দিয়েছে। মাঝখান দিয়ে যেটা হয়েছে, আমাদের পাড়ার সব বাসাতেই এখন দিনে দেড়-দুই ঘণ্টার বেশি টয়লেটগুলো খোলা না রাখার মোটামুটি অলিখিত একটা নিয়ম হয়ে গিয়েছে। যারা অফিস-আদালতে-স্কুলে যাই, তারা মোটামুটি সেখানেই সকালের জরুরী কাজটা সারি। তবে প্রচণ্ড যন্ত্রণায় থাকেন এলাকার মা-খালারা, যাদের সারাদিন বাসায়ই থাকতে হয়। প্রতি সপ্তাহেই খবর শুনি এলাকার কেউ না কেউ ইউরিনাল ইনফেকশনের রোগী হয়েছেন।

আর হ্যাঁ, এলাকায় চুরি এখনও বন্ধ হয়নি!

Most Popular

To Top