বিশেষ

ছি..ছি..ছি.. তুমি এত খারাপ???

নব্বইয়ের দশক বাংলাদেশ টেলিভিশনের তখন স্বর্ণ যুগ চলছে। সন্ধ্যার আগেই সবাই যে যার কাজ শেষ করে ফেলতো শুধুমাত্র টেলিভিশন অনুষ্ঠান দেখার জন্য। এমনি অবস্থাতে শুরু হয় ইমদাদুল হক মিলনের “রুপনগর” নামক একটি ধারাবাহিক নাটক।

নাটকটিতে নায়ক তৌকির আহমেদ, নায়িকা বিপাশা হায়াত আর ভিলেন ছিলেন এই মানুষটি। চরিত্রের নাম ছিলো হেলাল। নাটকটির ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ছিলো অসাধারণ। হৃদয়ে কম্পন উঠানো, ভয়কর অবস্থা সৃষ্টিকারী ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক যখন বেজে উঠতো তখন সবাই নড়েচড়ে বসতো, আর ভাবতো এই বুঝি ভিলেন হেলাল আসবে এবং নায়কের জীবন নাশ করবে। সবার ধারণাকে সত্যি করে ভয়ংকর সেই মিউজিককে ভেদ করে যখন ভিলেন প্রবেশ করতো এবং কালজয়ী সংলাপ, “ছি..ছি..ছি.. তুমি এত খারাপ???” ডেলিভারি দিতো, সত্যিই দর্শকেরা ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসতো। মানুষটির কি অদ্ভুত সুন্দর প্রতিটি পদক্ষেপ, চাহনি আর সংলাপ ডেলিভারির ধরণ, মনে হতো শিকার যেখানেই থাকুক না কেনো সে ঠিকই গন্ধ পায় এবং সেখানে উপস্থিত হয়।

ব্যক্তিগত ভাবে রুপনগর নাটকটি দেখার সময় সত্যি করে বলছি তৌকির কিংবা বিপাশা হায়াতের প্রতি আমার যতোটা ভালোবাসা জন্মেছিল, তার চেয়ে বহুগুণ ঘৃণা ও ক্ষোভ জন্মেছিল হেলাল নামের এই ভিলেনের প্রতি মানুষটির অসাধারণ অভিনয়গুণের কারণে। শুধু আমি নই, তখনকার সময়ের বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি মানুষের কাছে ঘৃণা ও ভয়ের পাত্র ছিলেন হেলাল নামের এই খালেদ খান। অভিনেতা হিসেবে মানুষটি এখানেই স্বার্থক।

মানুষটির ঝুড়িতে রয়েছে এইসব দিনরাত্রি, রুপনগর, গাঙচিলের পালক, অবচেতনের চাঁদ, তুমি কোন কাননের ফুল, ওথেলো এবং ওথেলো, চোর কাঁটা সহ বেশ কিছু ক্লাসিক টেলিভিশন নাটক। আরোও রয়েছে “পোকা মাকড়ের ঘর বসতি” ও “আহা” নামের দু’টি সিনেমা। তবে মানুষটির দু’টি কাজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একটি হলো “লোহার চুড়ি” আর অন্যটি হলো “দমন”। দুটি কাজই ক্রাইম, সাসপেন্স, থ্রিলার জনরার। তবে মজার বিষয় হলো এই টেলিফিল্ম দুটিতে তিনি সম্পূর্ণ দু’টি ভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন। লোহার চুড়ি তে তিনি এন্টি হিরো হিসেবে যতোটা অসাধারণ ছিলেন, আবার দমনে গোয়েন্দা পুলিশ হিসেবে ছিলেন ঠিক ততোটাই মনোমুগ্ধকর।

লোহার চুড়িঃ নব্বইয়ের দশকে একটি নান্দনিক ক্রাইম থ্রিলার মিনি সিরিজ

রাজধানী ঢাকার ওয়ারীতে হঠাৎ খুন হন নূরে আলম বখতিয়ার নামের এক ইঞ্জিনিয়ার। যিনি পড়ালেখা করেছে অস্ত্র নির্মাণ এবং ডিজাইনের উপর। আমেরিকা থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছেন। কাজেই তিনি একজন অস্ত্র এবং গোলাবারুদ বিশেষজ্ঞ। কিন্তু, একটি অস্ত্র সংক্রান্ত অপকর্ম করে ধরা খাবার পর আমেরিকা থেকে বহিষ্কার হন তিনি। ফলে, নূরে আলম ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশে চলে আসেন। দেশে বসেই ডিজাইন করতে থাকেন AK-49 নামক অত্যাধুনিক এক অস্ত্রের। চুক্তি ছিলো কাজটা হয়ে গেলে সেই অস্ত্র বিক্রি হবে কয়েক বিলিয়ন মূল্যে ইন্টারন্যাশনাল এক মাফিয়া চক্রের কাছে। যেটার কন্টাক্টে আবার ছিলো বাংলাদেশেরই আদনান জায়েদী (আজিম) নামের এক শিল্পপতির হাতে। এই আদনান জায়েদী সমাজের সকলের কাছে স্বনামধন্য শিল্পপতি হলেও আসলে তিনি আন্ডারওয়ার্ল্ডের একজন গডফাদার।

আন্ডারওয়ার্ল্ডের মানুষ সবাই তাকে মিয়া ভাই বলে সম্বোধন করে। তো এই মিয়াভাইয়ের ডানহাত হলেন দুইজন। একজন শেখর সিরাজ (খালেদ খান) আর অন্যজন বড়ুয়া (ঝুনা চৌধুরী)।

এদিকে মিয়া ভাইয়ের লোক ইঞ্জিনিয়ারকে মেরে যখন ডিজাইন নিয়ে আসে তখন দেখা গেলো ডিজাইনটি অসমাপ্ত। ইঞ্জিনিয়ার বুদ্ধি করে ডিজাইনের ১২ পাতার ৬ পাতা অন্যত্র লুকিয়ে রেখেছিলেন। কারণ, অস্ত্রের ডিজাইন যখন শেষ হয় তখন ইঞ্জিনিয়ার আলম বখতিয়ার বুঝতে পারে ডিজাইন হাতে পেলে তাকে মেরে ফেলা হতে পারে অর্থাৎ গোটা টাকার পুরোটাই হজম করবে মিয়া ভাইয়ের গ্যাং।

তো কাহিনী মোটামুটি এই ডিজাইনকে ঘিরেই।

এদিকে নূরে আলম হত্যার তদন্তের দায়িত্ব পড়ে দু’জন গোয়েন্দা পুলিশের উপর। সাজিদ আকরাম (টনি ডায়েস) এবং বিপুল মজুমদার (সমু চৌধুরী)। গোয়েন্দা অফিসার বিপুল ও সাজিদকে সহযোগিতা করে সাংবাদিক অর্পা আহমেদ (তাজিন আহমেদ)।

এরই মধ্যে গোয়েন্দা বিভাগ যখন হন্যে হয়ে গোটা ব্যাপারটা নিয়ে তদন্ত করছে, তখন ঠান্ডা মাথায় চাল দিতে থাকে মিয়া ভাইয়ের অন্যতম ডানহাত “শেখর সিরাজ” (খালেদ খান)। গোয়েন্দা বিভাগ কি পারবে এই চক্রটিকে ধরতে নাকি দেশের বাইরে পালিয়ে যায় টপ টেরর শেখর? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আপনাকে দেখতে হবে আট পর্বের টানটান উত্তেজনাময় অসাধারণ এই মিনি সিরিজটি।

এন্টি হিরোর চরিত্রটিতে খালেদ খান ছিলেন দুর্দান্ত। ড্যাশিং এপ্রোচ, বাচনভঙ্গি আর উচ্চাভিলাষী দৃষ্টি… সব মিলিয়ে অভিনয়গুণে শেখর চরিত্রটাকে তিনি একটা অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন।

ইউটিউব কিংবা ইন্টারনেটের বিভিন্ন সাইটগুলোতে খালেদ খানের মত জাত শিল্পীদের ক্লাসিক কাজগুলো যখন দেখি তখন যেমন আনন্দ পাই, ঠিক তেমনি আফসোসও হয়। আফসোস হয় এই ভেবে যে আমাদের নির্মাতারা এইসব গুণী শিল্পীদেরকে ঠিক মত ব্যবহার করতে পারেন না। অবশ্য দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা না করা আমাদের পুরনো অভ্যাস। তাই তো মৃত্যুর ৬ বছর পর হুমায়ুন ফরিদীকে একুশে পদক নিয়ে সম্মান জানাই।

যাই হোক, যেখানেই থাকেন ভালো থাকবেন; এবং জন্মদিনের অনেক অনেক ভালোবাসা অভিনয়ের যুবরাজ প্রিয় খালেদ খান।

Most Popular

To Top