ক্ষমতা

বিনাদন্ডে চারবার গ্রেফতার, সাজা পেয়ে প্রথমবার

দেশের রাজনীতিতে সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার দুর্নীতি মামলায় গ্রেপ্তার। দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার প্রধানের দুর্নীতি মামলায় সাজার ঘটনা ঘটলো দ্বিতীয়বারের মতো। এর আগে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দুর্নীতির দায়ে কারাগারে গিয়েছিলেন।

খালেদা খানম পুতুল, ১৯৪৫ সালে জন্ম নেওয়া ৭৩ বছর বয়স্ক এ নারী রাজনীতিবিদের জীবন ঘটনাবহুল। ১৯৬০ সালে বিয়ে হয় তৎকালীন সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সাথে। পুতুল হয়ে যান বেগম খালেদা জিয়া।

১৯৮১ সালে সংগঠিত ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে নিহত হন সেসময়ের বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। স্বামীর মৃত্যুর পর রাজনীতিতে পা রাখেন খালেদা জিয়া। ফার্স্ট লেডি থাকার কারণে রাজনৈতিক পরিমন্ডল খালেদা জিয়ার জানা যেমন ছিলো, তেমনি তিনি স্বামীর পাশে থেকেই রাজনীতিকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। প্রথমে বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দিলেও অল্পদিনেই দলের হাল ধরতে পেরেছিলেন।

এরপরই ফার্স্ট লেডির ঝকমকে বর্ণাঢ্য জীবন ছেড়ে তাকে হতে হয় আন্দোলন, সংগ্রামের এক নারী নেত্রী।

সামরিক শাসক এরশাদের শাসনামলে তিনবার গ্রেপ্তার হন বেগম খালেদা জিয়া। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত থাকায়, ১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর, ১৯৮৪ সালের ৩ মে, ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর তাকে সামরিক সরকারের গ্রেপ্তারের কবলে পড়তে হয়। এই গ্রেপ্তারের পর খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানো হয়নি। প্রতিবারই সেনানিবাসের নিজ বাড়িতে গৃহবন্দি করে রাখা হতো কিছুদিন।

২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর, জরুরী অবস্থা চলাকালীন দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় খালেদা জিয়াকে। একই সময়ে গ্রেপ্তার হন তার দুই সন্তান তারেক ও আরাফাত রহমান। এই গ্রেপ্তারেও কারাগারে বাস করতে হয়নি খালেদা জিয়ার। এসময় এক বছর ৭ দিন সংসদ ভবনের এক বাড়িতে সাব জেল হিসেবে সেখানে গৃহবন্দি রাখা হয়েছিলো তাকে।

২০০৭ সালে, সেসময় আওয়ামী সভানেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। খালেদা জিয়ার বাড়ির পাশের বাড়িতেই রাখা হয়েছিলো বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনেও এ দুই নেত্রী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংগ্রাম করেছিলেন।

এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় পাশাপাশি দুই নেত্রী

এবারই প্রথম এক জনের শাসনামলে আরেকজন গ্রেপ্তার হলেন। খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রেও গ্রেপ্তারের এই ঘটনা একেবারে অন্যরকম। কারণ, এবারই প্রথম আদালতের দন্ডপ্রাপ্ত হয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন তিনি। এবং প্রথমবারের মতো তাকে কারাগারে যেতে হলো।

যে মামলায় আদালত সাজা দিলেন বিএনপি চেয়ারপার্সনকেঃ 

খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন, এতিমদের সহায়তায় ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৯৩ সালে গঠন করা হয় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট। একই বছরের ১৩ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে নেয়া হয় ২ কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫শত টাকা। সমপরিমাণ টাকা জিয়া মেমোরিয়াল ট্রাস্টের নামেও নেয়া হয়।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে নেয়া টাকা নিয়ে দুদকের অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় এতিম তহবিল থেকে বেআইনী ভাবে ট্রাস্টে টাকা নেয়া হয়েছে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট গঠনে সমাজ কল্যাণ মন্ত্রনালয়ের কোন নিয়ম মানা হয়নি। ব্যক্তিগত ঠিকানা এতিমখানার ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

ট্রাস্টের ২ কোটি ১০ লাখ ২৭৬ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই খালেদা জিয়াকে আসামি করে মামলা দায়ের করে দুদক। অপরাধজনিত বিশ্বাস ভঙ্গ, দন্ডবিধি ৪০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ৫ (২) ধারায় এ মামলা করা হয়।

খালেদা জিয়া ছাড়াও এ মামলার অন্য আসামীরা হলেন তারেক রহমান, সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান।

আদালতে হাজিরা দিতে হয়েছে বহুবার

২০০৮ সালে দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার বিচার কাজ শেষ হতে সময় লেগেছে ১০ বছর। ২৩৬ কার্য দিবসের মধ্যে ২৮ দিন আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনে বক্তব্য দিয়েছেন খালেদা জিয়া। এ মামলার যুক্তি-তর্ক শেষ হয় ১৬ কার্যদিবসে। অবশ্য, মামলার প্রথম থেকেই একে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মামলা বলছে বিএনপি।

এ মামলায় ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, বৃহস্পতিবার, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। মামলার অন্য আসামি পলাতক তারেক রহমানসহ পাঁচ জনকে দশ বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।

রায় ঘোষণার পরই আদালত কক্ষেই খালেদা জিয়াকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। রাজধানীর নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো কারাগারে প্রশাসনিক ভবনের মহিলা ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে তাকে।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বেরও প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।

Most Popular

To Top